উত্তরাঞ্চলে নেই ফল সংরক্ষণ বা প্রক্রিয়াজাতকরণের ব্যবস্থা!

দিনাজপুর প্রতিনিধি:
উত্তরাঞ্চলে কোনো ব্যবস্থা নেই ফল সংরক্ষণ বা প্রক্রিয়াজাতকরণের। এ কারণে প্রতি বছর কমপক্ষে হাজার কোটি টাকা আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বাগান মালিক ও ব্যবসায়ীরা। একদিকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সময় নির্ধারণ করে দেয়া, অন্যদিকে একসঙ্গে ফল পেকে যাওয়ার পর বাজারজাত করতে হচ্ছে। ফলে বাধ্য হয়ে পচে যাবার আশঙ্কায় ফল বিক্রি করতে হচ্ছে কম দামে। এতে করে সঠিক দাম না পাওয়ায় আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন চাষি ও ফল ব্যবসায়ীরা। চাষিদের পক্ষ থেকে দাবি উঠেছে এ অঞ্চলে ফল সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হোক। রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নাটোরে বেসরকারিভাবে সংরক্ষণের ব্যবস্থা হয়েছে।

সেখানে কোম্পানিগুলো তাদের চাহিদা মতো আম ও লিচু রাখে। সংশ্লিষ্ট বিভাগ বলছেন, সরকারের পক্ষ থেকে এখনও এ ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে ফল রাখতে পারলে অফ সিজিনে বাগান মালিক বা ব্যবসায়ীরা অধিক মুনাফা অর্জন করতে পারবেন। সেইসঙ্গে আম, লিচুসহ অন্যান্য ফল এ অঞ্চলের জন্য অর্থনৈতিক ফসলে রূপান্তর হবে বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত।

রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁ জেলাকে আমের রাজ্য এবং দিনাজপুর জেলাকে মূলত বলা হয় লিচুর সাম্রাজ্য। অন্যান্য জেলাতে আম ও লিচুর চাষ হলেও তুলনামূলক কম। তবে গেলো কয়েক বছর থেকে প্রতিটি জেলাতেই নতুন নতুন আম ও লিচুর বাগান তৈরি হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে প্রায় আড়ইশ জাতের আম রয়েছে। এর মধ্যে ৩৫ থেকে ৪০ জাতের আম বাগান রয়েছে উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ল্যাংড়া, গোপালভোগ, খিরসাপাত, বোম্বাই, হিমসাগর, ফজলি, আশ্বিনা, ক্ষুদি, বৃন্দাবনী, লক্ষণভোগ, কালীভোগ, তোতাপরী, দুধসর, আম্রপলি, হাড়িভাঙ্গা, লকনা ও মোহনভোগ জাতের আম। অন্যদিকে লিচু বাগানও রয়েছে বিভিন্ন জাতের। এর মধ্যে বোম্বাই, বেদনা, চায়না-৩ উল্লেখযোগ্য। অন্যান্য ফসলের মতো আম ও লিচু ক্রমশই এ অঞ্চলের মানুষের আর্থিক সমৃদ্ধির ক্ষেত্রে সহায়ক হয়ে উঠছে। কারণ কোনো ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে প্রতি বছর প্রতি হেক্টরে আমের গড় ফলন হয় ১৩ মেট্রিক টন। যার পুরোটাই বিক্রি করতে হয়। এ অঞ্চলের বাজারগুলোতে মে মাসের শেষদিক থেকে আম উঠতে শুরু করে। পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন জাতের আম বাজারে আসতে থাকে। প্রায় সাড়ে তিন মাস বাজারে আমের ব্যবসা হয়।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, দিনাজপুর জেলায় ১৩ উপজেলা জুড়ে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের লিচুর বাগান। কেবল ১ হাজার ৫৫৩ হেক্টর জমিতে বাগান রয়েছে ২ হাজার ৬২৮টি। এখানে মাদ্রাজি, বোম্বাই, বেদানা, কাঠালি, চায়না-৩ লিচুর বাগান বেশি। অন্যদিকে পাবনা জেলায় ৩ হাজার হেক্টর জমিতে লিচুর বাগান রয়েছে। সবচেয়ে বেশি রয়েছে ঈশ্বরদীতে। পাবনায় মূলত দেশি ও বোম্বাই জাতের লিচুর বাগান বেশি রয়েছে। এছাড়াও রাজশাহী, নওঁগা, নাটোর, ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে লিচুর বাগান রয়েছে ২ হাজার ৭৭০ হেক্টর জমিতে। বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে রাজশাহী, দিনাজপুর, রংপুর, কুষ্টিয়া, যশোর, ঢাকার সোনারগাঁয়ে লিচুর বাগান দেখা যেত। এখন দেশের সর্বত্র লিচুর বাগান গড়ে উঠছে। অন্যদিকে এ অঞ্চলে ৭০ হাজার হেক্টর অধিক জমিতে আম বাগান রয়েছে। সবচেয়ে বেশি রয়েছে রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৪১ হাজার হেক্টর জমিতে।

চাষিরা বলছেন, গাছগুলোতে মুকুল আসার সঙ্গে সঙ্গেই ব্যবসায়ীরা বাগান কিনতে শুরু করেন। দুই তিনবার হাত বদল হতে হতে বাগানের ধরন অনুযায়ী ৫০ হাজার থেকে শুরু করে দেড় লক্ষাধিক টাকা পর্যন্ত হয়। কিন্ত আম ও লিচু পাকা শুরু হওয়ার সঙ্গে গাছ থেকে তা পাড়া শুরু হয়। কেবল অন্যান্য ফসলের মতো তা সংরক্ষণের কোনো ব্যবস্থা না থাকায় কোনো কোনো বছর ব্যবসায়ীদের লোকসানের সম্মুখীন হতে হয়। কারণ আম-লিচুসহ অন্যান্য ফল পচনশীল হবার কারণে ব্যবসায়ীরা তা ধরে রাখতে পারেন না। এই সুযোগটি কাজে লাগিয়ে জুস কোম্পানীগুলো বাজারে আম ও লিচু আসার আগেই বাগান মালিক বা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের চাহিদা মতো কিনে নেই। ফলে অনেকে ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের ছত্রাজিতপুরের আম চাষি হাসান আল সাদি পলাশ জানান, প্রতি বছর কমপেক্ষ ১ থেকে দেড় লক্ষ টাকা দিয়ে বাগান কিনতে হয়। কোনো বছর লাভ হয় আবার কোনো বছর হয় না। এর কারণ গেলো দ’ুবছর থেকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সময় নির্ধারণ করে দেওয়া হচ্ছে। এতে করে অনেক সময় এক সপ্তাহ আগে থেকে পাকা শুরু হয়। আর যখন পাড়া আরম্ভ হচ্ছে তখন রেখে বিক্রি করার মতো অবস্থা থাকে না। ফলে লোকসান হলেও ফল বিক্রি করে দিতে হয়। অথচ সংরক্ষণের ব্যবস্থা থাকলে এ সমস্যা হতো না। বরং আস্তে আস্তে দীর্ঘদিন ধরে বিক্রি করা যেত। এতে করে আর্থিকভাবে লাভবান হবার সম্ভাবনা থাকে।

দিনাজপুরের মাসিমপুরের লিচু চাষী আব্দুল মালেক জানান, অন্যান্য ফসলের মতো লিচু সংরক্ষণের ব্যবস্থা হলে অর্থনৈতিকভাবে চাষিরা লাভবান হবার সুযোগ পাবেন। নইলে দেখা যায় গাছে লিচু পাকা শুরু হলেই বিভিন্ন কোম্পানির মালিকরা তাদের একটা মনগড়া বাজারদর সৃষ্টি করে লিচু কেনার চেষ্টা করেন। অনেকটা বাধ্য হয়েই দিয়ে দিতে হয় তাদের। এতে করে অনেক সময় বাইরে থেকে ব্যবাসয়ীরা তেমন আসার সুযোগ পান না। অথচ সংরক্ষণের ব্যবস্থা হলে বাইরের ব্যবসায়ীদের কাছেও লিচু বিক্রি করা সম্ভব হবে। প্রতি বছর কমবেশি দেড় থেকে দুই লাখ টাকার লিচু বিক্রি করা যায়।

দিনাজপুর চেম্বারের সভাপতি মোসাদ্দেক হুসাইন বলেন, এ অঞ্চলে লিচু.আম, জাম, কাঁঠাল প্রকৃতিক নিয়মেই পাকা শুরু হয়। সেখানে সময় নির্ধারণ করে দিয়ে কিছুটা হলেও বাগান মালিক বা চাষিরা আর্থিকভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। যদি সংরক্ষণের ব্যবস্থা থাকতো তাহলে সর্বস্তরের ফল চাষি বা ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতেন না। তাছাড়াও এ অঞ্চলের লিচু ও আমের চাহিদা দেশের বাইরেও রযেছে। যদি প্রক্রিয়াজাতকরণের ব্যবস্থা হয় তবে বিদেশেও রপ্তানি করে সরকারের পাশাপাশি চাষিরাও লাভবান হবেন।

রাজশাহী ফল গবেষণা কেন্দ্রের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আলীম উদ্দিন জানান, ফ্রেস আম ও লিচুসহ অন্যান্য ফল সংরক্ষণ করা যায় না। কারণ প্রতিটি ফল পচনশীল। তবে আমের খোসা তুলে তা ৭ থেকে ৮ মাস রাখা যায়।

সরকারিভাবে এখনও ফল চাষিদের জন্য এমন কোনো ব্যবস্থা করা হয়নি বা এ ধরনের কোনো প্রকল্পও সরকারের পক্ষ থেকে গ্রহণ করা হয়নি। তবে নাটোর, চাঁপাইনবাবগঞ্জের রহনপুর ও ভোলাহাটে বেসরকারি উদ্যোগে জুস করার জন্য ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে প্রাণ, আকিজ গ্রুপ এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। কোম্পানিগুলো নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় তা সংরক্ষণ করে রাখার জন্য অধিক মুনাফা অর্জন করতে পারছে। সরকারিভাবে উদ্যোগ নিলে বাগান মালিক বা ব্যবসায়ীরা লাভবান হবেন।

  •  
  •  
  •  
  •  

Tags: