থাই পেয়ারা চাষে যশোরের ভোলা মিয়া আজ কোটিপতি

যশোর প্রতিনিধি:
বাণিজ্যিক ভিত্তিতে থাই পেয়ারা চাষ করে চার বছরে কোটি টাকার পেয়ারা বিক্রি করেছেন যশোরের চৌগাছার ভোলা মিয়া। তার মত অনেক চাষীই থাই পেয়ারা চাষ করে কোটিপতি হয়েছেন বলে জানা গেছে।

যশোর থেকে ২৪ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে চৌগাছা শহর। চৌগাছা থেকে কপোতাক্ষ নদ পেরিয়ে দু’কিলোমিটার গেলে জিওলগাড়ী বেলেমাঠ-স্বরুপদহা লগোয়া গ্রাম। দু’গ্রামের একই মাঠ। মাঠ জুড়ে যেদিকে চোখ যায় নয়নাভিরাম থাই পেয়ারা বাগান। বাগানে ঝুলে আছে থাই পেয়ারা। গ্রাম দু’টির সিংহভাগ চাষীরই এখান অন্য আবাদ না থাকলেও পেয়ারা বাগান আছে।

জিওলগাড়ী বেলেমাঠ গ্রামের গোলাম হোসেনের পুত্র আমির হোসেন ওরফে ভোলা মিয়া। থাই পেয়ারা চাষ করে তিনি আজ কোটিপতি। কিনেছেন ৫ একর অর্থাৎ ১৫ বিঘা জমি। করেছেন বাড়ি। ভোলা মিয়ার কোটিপতি হওয়ার গল্প শুনতে বৃহস্পতিবার পেয়ারা বাগানে গেলে তিনি জানান পিতার কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া ৭/৮ বিঘা জমিতে ঝাল, পটল, উচ্ছে, বেগুন সহ বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষ করতাম। সবজি চাষে কোন বছর ১০ হাজার টাকা লাভ হলে পরের বছর ১০ হাজার টাকা লস হতো। এক পর্যায়ে প্রায় দেউলিয়া হয়ে পড়ি। দায়-দেনাগ্রস্থ অবস্থায় ২০০৫-০৬ সালে প্রথমে বাউকুলের চাষ করেন তিনি।

প্রথম দু’ এক বছর কুলের বাজার ভাল থাকায় বেশি করে কুল চাষ করি। এ সময় কুলের বাজার পড়ে যায়। তাছাড়া কুল সারা বছরে মাত্র একবার ধরে। ফলে কুলের আবাদ করে দেনা শোধ করা তো দুরের কথা উল্টো এলাকা ছেড়ে দেয়ার অবস্থা তৈরী হয়। এমন মুহুর্তে ২০১০ সালে ঢাকার এক ব্যাপারির পরামর্শে ৭ বিঘা জমি লিজ নিয়ে রাজশাহী থেকে থাই পেয়ারার চারা কিনে এনে চাষ করি। এর পরই ওপর ওয়ালা আমার দিকে মুখ তুলে চান। ভোলা মিয়া জানান চার বছরে তিনি এক কোটি টাকার পেয়ারা বিক্রি করেছেন। তিনি জানান এই চার বছরে জমির লিজমূল্যসহ তার বিঘা প্রতি বছরে এক লক্ষ টাকা করে ২৮ লক্ষ টাকা খরচ হয়েছে। নীট মুনাফা হয়েছে ৭২ লক্ষ টাকা। চার বছর চাষ করে পেয়ারা গাছ কেটে আবারো নতুন করে গাছ লাগিয়েছেন তিনি। পেয়ারা চাষ করে এ পর্যন্ত ৫ একর অর্থাৎ ১৫ বিঘা জমি কিনেছেন তিনি। বাড়ী করেছেন পেয়ারা বাগানের পাশে। এখন লিজ নেয়া জমির পাশাপাশি নিজের জমিতেও পেয়ারা এবং কুল চাষ করছেন তিনি। এখন তার কুল আছে সাত বিঘা আর পেয়ারা বাগান ১৫ বিঘা। এছাড়ার ৭ বিঘা জমিতে অন্যান্য আবাদ করেছেন তিনি। তবে কোটিপতি হয়ে শান্তিতে থাকতে পারেন নি। স্থানীয় কিছু লোক তাকে নানা প্রকার ঝামেলা করেছে।

তিনি জানান নিজের বাড়ী এবং বাগান করার জন্য ১০/১৫ বিঘার একটি প্লট খুজছেন তিনি। যেখানে বাড়িও করবেন আর বাড়ির চারপাশে পেয়ারা বাগান থাকবে।

ভোলা মিয়া জানালেন বর্তমানে তার ১৫ বিঘা জমিতে যে পেয়ারা এসেছে তাতে সামনের সিজনে কমপক্ষে সাতশত কার্টন হবে। যার ওজন হবে বারশত মন। সিজনে পেয়ারার দাম একটু কম থাকে। সে হিসেবে প্রতি মন ২ হাজার টাকা করে চব্বিশ লক্ষ টাকার পেয়ারা বেঁঁচতে পারবেন তিনি। সিজন বলতে বোঝালেন বর্ষা মৌসুমকে। অর্থাৎ এখন গাছে যে পেয়ারা এসেছে একমাস পরই তা বিক্রি করার মত হবে। তিনি জানান সপ্তাহ খানেক আগে ডাল-সিজনের পেয়ারা বিক্রি শেষে করেছেন। ভোলা মিয়া আরো জানালেন কুল চাষে লিজসহ বছরে খরচ হয় চল্লিশ হাজার টাকা। এক সিজনে এক লক্ষ টাকার কুল বিক্রি করা যায়। এবছর তারও ৭ বিঘা কুল রয়েছে।

স্থানীয় আরেক পেয়ারা চাষী বললেন, ভোলা ভাইয়ের দেখাদেখিই পেয়ারা চাষ করেছি। তিনি জানান ভোলা ভাই এলাকায় প্রথম বাউ কুলের চাষ করেন। আবার তিনিই প্রথম এলাকায় থাই পেয়ারার চাষ করে আমাদের উৎসাহিত করেছেন। বলা যায় তিনি নতুন এবং রিস্কি চাষ করতে পছন্দ করেন। তিনি বলছিলেন যে ভোলা ভাই ১০ বছর আগে প্রায় দেউলিয়া হয়ে পড়েছিলেন। আজ তিনি কোটিপতি। তিনি আমাদের মত সৌখিন চাষীদেরও পথ প্রদর্শক। এই মাঠে পেয়ারার বাগান আছে স্বরুপদাহের ফসিউজ্জামান লোটন, আব্দুল্লাহ আল মামুন, ইউপি সদস্য জহুরুল ইসলাম বাবু, শিক্ষক মাও গিয়াস উদ্দিন, রাজনীতিবিদ সানোয়ার হোসেন বকুলসহ অনেকেরই।

এ গ্রামেরই মরহুম ইমাম উদ্দিন মাস্টারের মেঝ ছেলে শফিউদ্দিন। তিনি ঢাকায় একটি কেম্পানীতে চাকুরী করতেন। চাকুরী ছেড়ে বাড়ি এসে প্রথম বছর দু’ বিঘা পেয়ারা চাষ করেন জমি লিজ নিয়ে। তিনি জানান, জমি কেনা ছাড়াও লিজ নিয়ে আবাদ করি। বলছিলেন ৫/৬ বছরে তার পেয়ারা বাগান এখন ১২ বিঘা। তিনি বললেন আমি অন্যদের মত শুধু পেয়ারা বাগানেই সীমাবদ্ধ থাকি না। বাগানের পেয়ারা গাছ ছোট থাকতে এর মধ্যে উচ্ছে-পটলসহ সবজি চাষ করি। বাগানের চারপাশে (আইলে) পুইশাক-ঝিঙে-চিচিংগা জাতীয় সবজি চাষ করি। এ সবজি মৌসুমে তিনি দু’ আড়াই লক্ষ টাকার সবজি বিক্রি করতে পারবেন বলে জানান।

বলছিলেন মার্চের শেষ দিকে একদিনেই ১২ মন পটল তিনি বিক্রি করেছেন। এদের দেখাদেখি পেয়ারা চাষ করেছেন বেলেমাঠের আজগর আলী, বাগারদাড়ির কবীর হোসেনসহ অনেকেই। কবীর হোসেন বাদাম বিক্রিসহ ছোটখাট ফুটপথের সামগ্রী ফেরি করে বেচতেন। ২০১০ সালের দিকে জমি লিজ নিয়ে ১ বিঘা পেয়ারা চাষ করেন। সেখান থেকে এখন তিনি ৭ বিঘা পেয়ারা বাগানের মালিক হয়েছেন।

তিনি জানালেন মাঝে আমি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে অনেক টাকা ব্যয় হয়ে যাওয়ায় একটু ডাউনে পড়ে গেছি। না হলে এখন আমার কমপক্ষে ১৫ বিঘা পেয়ারা বাগান থাকত। পেয়ারা বাগান করে কতটুকু উন্নতি করেছেন জানতে চাইলে বলেন সংসার চালাই, ছেলে মেয়েদের লেখাপাড়া করাচ্ছি। থাকার মত একটি বাড়ি করেছি। আল্লাহ অনেক দিয়েছেন।

এরা ছাড়াও পেয়ারা চাষ করে মাধবপুর গ্রামের মোঃ রায়হান, সাতক্ষীরা থেকে চৌগাছা চলে আসা বাকী বিল্লাহ, তিলকপুরের ইসমাইল হোসেন এনামুল, হিজলীর সহিদুলসহ অনেকেই আজ স্বাবলম্বী থেকে কোটিপতি হয়েছেন। বলতে গেলে গোটা স্বরুপদাহ ইউনিয়ন এখন পেয়ারা বাগানে পরিণত হয়েছে। ইউনিয়নের ভারত সীমান্ত লাগোয়া দিঘড়ী, হিজলী, তিলকপুর মাধবপুর গ্রামের মাঠগুলোতে শুধুই পেয়ারা বাগান।

এ বিষয়ে চৌগাছা উপজেলা কৃষি অফিসার একেএম শাহাবুদ্দিন আহমেদ জানান চৌগাছার বেশ কিছু কৃষক থাই পেয়ারা চাষ করে সাফল্য পেয়েছে। আমার সহকর্মী উপ-সহকারী কৃষি অফিসাররা নিয়মিত তাদের খোজ খবর রাখেন। নিয়মিত পরামর্শ দিয়ে থাকেন।

  •  
  •  
  •  
  •  

Tags: