রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির আট বছর ও শ্রমিক জীবন

এস এম আবু সামা আল ফারুকী:
আজ শনিবার (২৪ এপ্রিল) রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির আট বছর পূর্ণ হবে। দেশের পোশাক শিল্পে ঘটে যাওয়া সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি। রানা প্লাজা ধ্বংসের আট বছর পরেও বাংলাদেশের গার্মেন্টস শ্রমিকরা মানবেতর জীবনযাপন করছে। ২০১৩ সালে ঘটে যাওয়া পোশাক শিল্পের সবচেয়ে মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারায় ১১০০ শ্রমিক এবং আহত হয় আরো ২৬০০ জন। এই দুর্ঘটনায় বিশ্বের পোশাক শ্রমিকরা কতটা অবহেলিত এবং অবমূল্যায়িত তা ফুটে উঠে। ঘটনার আগেরদিন ওই ভবনে বিপজ্জনক ফাটল দেখা দেওয়ায় সকল দোকানপাট, ব্যাংক বন্ধ করে দেয়া হয়। কিন্তু সেখানে অবস্থিত পাঁচটি গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি অন্যান্য দিনের মতই সচল রাখা হয়। এক পর্যায়ে বিদ্যুৎ চলে গেলে জেনারেটর চালু করা হয় এবং তখনই ভবনটি ধ্বসে পড়ে।

আনুষ্ঠানিকভাবে মৃতের সংখ্যা ১১৩২ বলা হলেও বাস্তবে তা অনেক বেশি। নওশাদ হাসান হিমু, যে উদ্ধারকর্মী হিসেবে অংশ নিয়েছিল, প্রায় ১৭ দিনে সে ১০০০ জনকে উদ্ধার করেছে যাদের অনেকের হাত-পা বা অন্যান্য অংশ কেটে বের করতে হয়েছে। এদের সংখ্যা আনুষ্ঠানিক কোনো হিসাবে যুক্ত করা হয়নি। এপ্রিল ২৪, ২০১৯, এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার ষষ্ঠ বছরে হিমু আত্মহত্যা করে। সেই ঘটনার মর্মান্তিকতা সে ভুলতে পারেনি।

রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির পর বিশ্বের এই ২.৪ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের ব্যবসার পেছনে যাদের অবদান তাদের দুর্দশা ফুটে উঠে। এই শিল্পে কর্মরত ৪ কোটি শ্রমিকের মধ্যে ৪০ লক্ষ শ্রমিকই বাংলাদেশে কাজ করে যা চায়নার পর দ্বিতীয় বৃহত্তম তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশ। এই ঘটনার পর অনেক সংগঠন পোশাক শ্রমিকদের দাবি নিয়ে সোচ্চার হয়। তাদের যথাযথ ক্ষতিপূরণের দাবি জানায় তারা। রানা প্লাজার ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় কারণ প্রায়ই পোশাক শিল্পকারখানায় আগুন বা অন্যান্য দুর্ঘটনার কারণে পোশাক শ্রমিকরা ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। তাদের জীবনের যথাযথ নিরাপত্তা দেয়া হচ্ছে না।

শুধুমাত্র শিল্প কারখানা এবং মালিকরাই শ্রমিকদের এই অবস্থার জন্য দায়ী না। তাদের তৈরিকৃত পোশাক যারা কম দামে কিনতে চায় তারাও তাদের এই দুর্দশার জন্য দায়ী। ঘটনার পর শ্রমিকদের নিরাপদ কার্যক্ষেত্র তৈরির জন্য ২২২ টি গার্মেন্টস ইন্ড্রাস্ট্রি একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে যেখানে ভবনে আগুন লাগা এবং ভবনের সুরক্ষার বিষয়টি উঠে আসে। তবে তাদের জন্য এসব উদ্যোগ তেমন কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারেনি। আট বছর পরেও গ্লোবাল সাপ্লাই চেইনের প্রধান সমস্যাগুলো, লাভ বন্টন, দায়িত্বশীলতায় সমস্যা রয়ে গেছে। রানা প্লাজার ঘটনার পর যে নীতিগুলো নির্ধারণ করা হয়েছিল সেগুলো শুধু কাগজে কলমেই থেকে গেছে। যখন নিরীক্ষণ কমিটি আসে শুধুমাত্র তখন এগুলো দেখানো হয়, যেমন একজন স্বাস্থ্য পরীক্ষক এবং শিশুদের দেখভাল করার জন্য একজনকে রাখা হয়।

একটি জরিপে দেখা গেছে, একটি টি শার্ট তৈরির জন্য এর লাভের মাত্র ০.৬ শতাংশ এর শ্রমিক পায়। বাকি সমস্ত লাভ ফ্যাক্টরি, ব্র্যান্ড, খুচরা বিক্রেতারা পায়। সম্প্রতি কোভিড মহামারি এ অবস্থাকে আরো করুণ করেছে। সকল পোশাক শ্রমিক এখন বেকার অথবা তাদের ন্যায্য ভাতা থেকে অনেক কম বেতনে কাজ করছে। এর মূল কারণ হল মহামারীতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে শিথিলতা। কোটি কোটি টাকার অর্ডার বাতিল করা হচ্ছে। যার মূল ভুক্তভোগী হচ্ছে পোশাক শ্রমিকরা।

জরিপে উঠে এসেছে, রানা প্লাজা ধসে আহত শ্রমিকদের মধ্যে ৯২ শতাংশই করোনাকালে সরকারের কোনো সহায়তা পাননি। মাত্র ৮ শতাংশ শ্রমিক অল্প কিছু সহায়তা পেয়েছেন। যদিও প্রাণে বেঁচে যাওয়া এসব শ্রমিক দুঃসহ জীবন যাপন করছেন। ১৪ শতাংশ শ্রমিকের স্বাস্থ্যের অবনতি হয়েছে। তাঁরা মাথাব্যথা, হাত ও পায়ে ব্যথা এবং কোমরব্যথার সমস্যায় ভুগছেন। আবার সাড়ে ১২ শতাংশ শ্রমিক মানসিক ট্রমার মধ্যে আছেন। সংখ্যাটি ২০১৯ সালেও ছিল সাড়ে ১০ শতাংশ। এর মানে ২ শতাংশ শ্রমিকের মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি হয়েছে।

রানা প্লাজার ঘটনার পর মানুষ ভেবেছিল আইন আদালতের জটিলতা যতই থাক এ নির্মম হত্যাযজ্ঞের আসল দায় যাদের তাদের বিচার হবেই হবে। ঘটনার পরের কয়েকদিন গোটা দেশের মানুষের অনুভূতিতে একযোগে এমন আশাই আলোড়ন তুলেছিল। মনে হয়েছিল অন্তত এবার মালিক শ্রমিকের শ্রেণীদূরত্ব ঘুচে মানবিকতার অবিচ্ছিন্ন বৃত্ত তৈরি হবে। কিন্তু না, ‘সবার ওপর মানুষ সত্য’র কাব্যিক ভাবালুতা তুড়ি মেড়ে উড়িয়ে দিয়ে মালিক রয়েছেন মালিকের জায়গায়, শ্রমিক শ্রমিকের জায়গায়। শ্রেণী বিভক্ত সমাজের এই হচ্ছে আসল সত্য। রানা প্লাজার মালিক রানা সাহেবের জেলখানায় নিরাপদ জীবনযাপন এই উপলব্ধিকে দৃঢ় করে।

____________________________
এস এম আবু সামা আল ফারুকী
শিক্ষার্থী, ভেটেরিনারি সাইন্স অনুষদ
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ-২২০২

  •  
  •  
  •  
  •  
ad0.3