বাকৃবি কেআর মার্কেটে কৃষি পণ্যের অতিরিক্ত দাম নেওয়ার অভিযোগ
বাকৃবি প্রতিনিধিঃ
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থিত কেআর মার্কেটে বিভিন্ন পণ্যের অতিরিক্ত দাম নেয়ার অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে সবজি ও মাছ চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে। সবজিতে কেজি প্রতি ১৫-২৫ টাকা এবং মাছে কেজিতে ৫০-১০০ টাকা পর্যন্ত বেশী নেয়ার অভিযোগ উঠেছে। এমনকি একই সবজি দোকান ও ক্রেতাভেদে দামে কমবেশী করারও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এছাড়া শিক্ষার্থীরা অল্প পরিমানে পণ্য ক্রয় করায় তাদের কাছ থেকে কেজিতে দ্বিগুনেরও বেশী দাম নেওয়া হচ্ছে। কোন প্রকার দাম নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই চলছে এ বাজার। দীর্ঘদিন এভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের কাজ গেছে বাড়তি টাকা হাতিয়ে নিলেও অভিযোগ করে কোন প্রতিকার মিলছে না।
২৮/০৬/২০২০ তারিখে কেআর মার্কেট ও শেষ মোড় এলাকার খুচরা বাজার দরের তুলনামুলক চিত্র
| শাক সবজি (কেজি প্রতি) | কে আর মার্কেট | শেষ মোড় |
| আলু (দেশী) | ৪০/- | ৩৫/- |
| (গ্রানুলা, সাদা বড়) | ৩৫/- | ২৫/- |
| টমেটো | ১২০/- | ৯৫/- |
| পটল, | ৫০/- | ৩০/- |
| বেগুন (গোল) | ৪০/- | ৩০/- |
| (লম্বা) | ৫০/- | ৩৫/- |
| ঢেঁড়স, | ৪০/- | ২৫/- |
| চিচিংগা | ৫০/- | ৩০/- |
| পেঁপে | ৫০/- | ৪০/- |
| কাঁচ কলা | ৩০/- | ২০/- |
| চাল কুমড়া (মাঝারি) | ৩০/- | ১৫/- |
| লাল শাক | ৫০/- | ৪০/- |
| পাট শাক | ৩০/- | ১৫/- |
| পুই শাক | ৩০/- | ২৫/- |
| লেবু (হালি) | ২০/- | ১০/- |
| শসা (হাইব্রিড) | ৪০/- | ৩০/- |
| (দেশী) | ৫০/- | ৪০/- |
| করলা | ৬০/- | ৫০/- |
| কচুর লতি | ৫০/- | ৪০/- |
| কাঁকরল | ৫০/- | ৩৫/- |
মসলা জাতীয়
| মরিচ (কাঁচা) | ১৪০/- | ১২০/- |
| পেয়াজ (দেশী) | ৪৫/- | ৪০/- |
| (আমদানী) | ৩৫/- | ৩০/- |
| রসুন (আমদানী) | ১৬০/ | ১২০/- |
| আদা | ২০০/- | ২০০/- |
মাছ
| কাতলা (৮/৫ কেজি ওজন) | ৪০০-৫০০/- | ৩৫০-৪০০/- |
| নলা বা ছোট-মাঝারি রুই | ১৫০-২০০/- | ১২০/- |
| তেলাপিয়া (ছোট-বড়) | ১৬০-১৮০/- | ১৩০/- |
| পাঙাশ (বড়) | ১৫০/- | ১২০/- |
| পাবদা (বড়) | ৫০০/- | ২৫০/- |
| গুলসা | ৪৫০-৫০০/- | ৩৫০-৪০০/- |
| ইলিশ বড়/ | ১২০০/- | – |
| মাঝারি/ছোট | ৫০০-৬০০/ | ৭০০/- |
শেষমোড়ের বাজারে দামাদামী করে আরও ৫-১০ টাকা কেজিতে কম পাওয়া যায় বলে জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক ক্রেতা।
জানা যায়, কেআর মার্কেটে একটি কথিত সিন্ডিকেট রয়েছে যারা বাহিরের কৃষক ও খামারীদের প্রবেশ করতে দেয় না। চর থেকে যেসব কৃষক সবজি নিয়ে আসে তাদেরকে মার্কেটে ডুকতে দেওয়া হয় না । নদীর পারেই বসে পাইকারী দরে তাদেরকে বিক্রি করতে হয় এই সিন্ডিকেটের কাছে। এক হাত বদলে দাম বেড়ে যায় কয়েকগুন ।
শোনা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ে অভ্যান্তরে অনেক ক্রেতা দামাদামী না করেই মূল্য পরিশোধ করে দেন। আবার অনেকে কর্মচারী দিয়ে বাজার করালেও কর্মচারী যা বলেন তাই মেনে নেন।
প্রফেসর ড. মো: সহিদুজ্জামান বলেন, শুধু বেশী দাম নয় রীতিমত প্রতারণা করাও হচ্ছে। সোনালী মুরগির ডিম দেশী ডিম বলে বিক্রি করে টাকা হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে। টাটকা সবজির কথা বলে পুরাতন সবজিতে পানি ছিটিয়ে বিক্রি করা হচ্ছে। ভাল মালের কথা বলে চড়া দাম আদায় করা হচ্ছে ক্রেতাদের কাছ থেকে।
সবজি ও মাছ ব্যবসায়ীদের কাছে অতিরিক্ত মূল্য নেয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তারা বলেন- আমরা বাছাই করে মানসম্পন্ন ভাল মালামাল এখানে বিক্রি করি তাতে একটিু বেশী দাম পড়ে যায়। অথচ এই সবজিগুলো প্রতিদিন সকালে ব্রক্ষ্মপুত্র নদের পাড়ে কৃষকদের কাজ থেকে পাইকারী দরে কিনেন কেআর মার্কেটের ব্যবসায়ী ও শেষ মোড়ের ব্যবসায়ীরা।
এমতবস্থায় মার্কেট মনিটরিং ও মূল্য নির্ধারণ করা জরুরী হয়ে পড়েছে। সবজি চাষিরা অভয়ে যাতে কেআর মার্কেটে এসে সরাসরি সবজি ও মাছ বিক্রি করতে পারে সেটির ব্যবস্থা করার অনুরোধ করেন ক্রেতারা।
মার্কেটি কমিটির সভাপতি প্রফেসর আবু হাদী নূর আলী খান বলেন, আমরা বিষয়টি দেখছি, চেষ্টা করছি, তবে করোনা পরিস্থিতির কারণে অনেককিছু করা সম্ভব হচ্ছে না।
কৃষিশিক্ষা ও গবেষণার এই বৃহৎ সূতিকাগারে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের খামার ও মাঠ গবেষণার এবং সম্প্রসারণের জন্য রয়েছে বাউএক নামে একটি প্রতিষ্ঠান। ডেইরি, পোল্ট্রি, ছাগল, ভেড়ার খামারও রয়েছে। রয়েছে কৃত্রিম প্রজনন গবেষণাগারও। এসব খামার ও প্রতিষ্ঠানকে উৎপাদনমুখী করে গবেষণা ও সম্প্রসারণের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারীদের জন্য নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিত করা যায় কি না তা নিয়ে কথা বলা হয় দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের সাথে।
পোল্ট্রি খামারের অফিসার ইন চার্জ প্রফেসর ড. মোঃ শহিদুর রহমান বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক সহযোগিতা পেলে এই খামার থেকে স্বল্প মূল্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের সবার জন্য পর্যাপ্ত নিরাপদ ডিম ও পোল্টি সরবরাহ করা সম্ভব। তিনি আরও বলেন পশুপালন অনুষদ সংলগ্ন একটি সেন্টার খোলা হয়েছে সেখানে অতিশীঘ্রই বিশ্ববিদ্যালয়ের উৎপাদিত পোল্ট্রি ও ডিম পাওয়া যাবে।
ডেইরি খামারের অফিসার ইন-চার্জ ড. মোঃ আশিকুল ইসলাম বলেন, প্রয়োজনীয় ইনপুট নিশ্চিত করলে ডেইরি খামার থেকে দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্য সরবরাহ করা অসম্ভব কিছু নয়।
বিশ্ববিদ্যালয় মৎস্য খামারের অফিসার-ই-চার্জ ড. কাইজার আহমেদ সুমন বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের যেসব জলাশয় আছে তাতে কমার্শিয়াল মাছ চাষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের চাহিদা পর্যাপ্ত পরিমানে পূরণ করা সম্ভব। এজন্য প্রয়োজনীয় জনবল, নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও আর্থিক সাপোর্ট দিতে হবে। এছাড়া বিএফআরআই এর কাছ থেকেও নিরাপদ মাছ পাওয়া যেতে পারে।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় সম্প্রসারণ কেন্দ্র বাউএক সুত্রে জানা গেছে শীতকালে প্রায় ৭২ জন এবং গ্রীষ্মকালে প্রায় ২৪ জন কন্ট্রাক্ট গ্রোয়ারের মাধ্যমে জৈব ও নিরাপদ সবজি প্রদর্শনী/ ডেমো হিসেবে উৎপাদন করা হয়। এসব সবজির উৎপাদন বাড়িয়ে বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের জন্য সরবরাহ করা সম্ভব বলে জানান বাউএক এর সাবেক পরিচালক প্রফেসর ড. মোঃ গোলাম ফারুক এবং বর্তমান পরিচালক প্রফেসর ড. মোঃ আসাদুজ্জামান সরকার।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. লুৎফুল হাসান বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে বাজারে বাড়তি দাম নেওয়ার বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বাউএক, পোল্ট্রি ও মৎস্য খামার থেকে সবজি, ডিম, মুরগি ও মাছ এসব পাওয়া গেলে অনেক ভাল হবে এবং নিরাপদ হবে। এ বিষয়ে আলোচনার আহ্বানও জানান তিনি।
কৃষি শিক্ষার এই বৃহৎ বিদ্যাপীঠে মানসম্মত ও নিরাপদ কৃষি পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবী অনেক শিক্ষকের। বিশ্ববিদ্যালের শিক্ষা, গবেষণা, সম্প্রসারণ ও উৎপাদনের স্বার্থে সংশ্লিষ্ট খামার ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে গতিশীল করার আহ্বান করেন অনেকে।
সেনাবাহিনী যদি তাদের কমিনিটির জন্য নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য উৎপাদন করতে পারে সেখানে বাকৃবির মত কৃষি শিক্ষার একটি প্রাচীন ও বৃহৎ প্রতিষ্ঠান সবকিছুই থাকার পরও কেন পারবে না এ প্রশ্ন থেকেই যায়।

