করোনাকালীন ও করোনা-পরবর্তী শিক্ষাব্যবস্থা
নিজস্ব প্রতিবেদকঃ
করোনা মহামারিতে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ। ফলে শিক্ষার্থীদের গতিশীল জীবন স্থবির হয়ে পড়েছে। সরকার শিক্ষাক্ষেত্রের এই সংকট সমাধানে বিভিন্ন উদ্যোগ নিলেও বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা পড়াশোনায় কতটুকু ব্যস্ত তা নিয়ে সংশয় রয়ে গেছে। এর মাঝে উঠে এসেছে শিক্ষার্থীদের নানা অভিযোগ। তাই করোনা ও করোনা পরবর্তী শিক্ষাব্যবস্থা কেমন হতে পারে এই বিষয়ে গত ২৫ জুলাই, ২০২০ তারিখে সবুজ বাংলাদেশ অনলাইন নিউজ পোর্টাল শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের নিয়ে অনলাইন আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
শিক্ষার্থীদের অনলাইন ক্লাস সম্পর্কে প্রফেসর ড. মোঃ সহিদুজ্জামান বলেন, ইতিমধ্যেই কিছু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় আন্ডার গ্রাজুয়েট এবং মার্ষ্টাস লেভেলের অনলাইন ক্লাস শুরু করে দিয়েছে । তিনি বলেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ও সিদ্ধান্ত হয়েছে যে আগষ্টের ৯ তারিখ থেকে মার্ষ্টাসের অনলাইন ক্লাস শুরু হবে । পর্যায়ক্রমে আন্ডার গ্রাজুয়েটেরও ক্লাস শুরু হবে । তিনি শিক্ষার্থীদের কিছু সমস্যা এবং সমাধানের বিষয়গুলোও তুলে ধরে বলেন, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষার্থী গ্রামে বসবাস করে। গ্রামে ইন্টারনেট খুব একটা ভালো স্পীড দেয়না । খুব বেশী হলে ২ জি , কিংবা ৩ জি পাওয়া সম্ভব , ৪ জি তো একেবারেই অসম্ভব। অনেকের স্মার্ট ফোন, ল্যাপটপ কিংবা অনলাইন কোন ডিভাইস নেই যা দিয়ে তারা শিক্ষকদের সঙ্গে অনলাইন ক্লাসে অংশগ্রহণ করবে ।
ড. সহিদুজ্জামান বলেন, আর্থিক সমস্যা একটি বড় সমস্যা। এই মহামারি করোনায় অনেক গরিব শিক্ষার্থীরা যেখানে তাদের পরিবার পরিজন নিয়ে কষ্টে দিনযাপন করছেন সেখানে শিক্ষাক্ষেত্রে এই ব্যয় তাদের জন্য আর্থিক ও মানসিক চাপ সৃষ্টি করবে। তিনি আরও বলেন, সরকার মোবাইল অপারেটরগুলোর সঙ্গে কথা বলে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে ইন্টারনেটের স্পীড বাড়িয়ে দেয়া সম্ভব কি না বা শিক্ষার্থীদের মাঝে এমন কোন আপদকালীন স্বল্প মূল্যে ইন্টারনেট প্যাকেজ প্রদান করা গেলে শিক্ষার্থীরা শিক্ষাকাযক্রমে যুক্ত হতে পারবে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মাঝে যাদের আর্থিক সমস্যা তাদেরকে বাছাই করে ঋণ দেওয়া গেলে তারা কিছুটা হলেও তাদের সংকট কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হবে ।
ফ্রি ইন্টারনেট কিংবা স্মার্ট ফোন কেনার জন্য লোন দিয়ে বাংলাদেশে শিক্ষার্থীদের অনলাইন প্লাটফর্মে কতটুকু আনা সম্ভব এই সম্পর্কে সুব্রত কুমার কুরী (পিএইচডি ফেলো, ভার্জিনিয়া টেক ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাষ্ট্র ) বলেন, সকল শিক্ষার্থীদের মাঝে এই অনলাইন ডিভাইস দিয়ে কোন ভাবেই বাংলাদেশের শিক্ষা ক্ষেত্রে অনলাইন প্লাটফর্মে আনা সম্ভব না ! তিনি বলেন, যদি ১০০ জন শিক্ষার্থীদের মাঝে এই ডিভাইস দেয়া হয় দেখা যাবে ১০-২০ জন কে নানা কারনে একসঙ্গে নাও পাওয়া যেতে পারে। নানা ত্রুটির কারনে অনলাইনে তাদের একসাথে পাওয়া নাও যেতে পারে ।
ফ্রি ইন্টারনেট ডেটা সম্পর্কে সুব্রত কুমার কুরী বলেন, শিক্ষার্থীদের মাঝে যে ডেটাগুলো দেওয়া হবে তারা কি যথাযথ শিক্ষাক্ষেত্রে ব্যবহার করবে, এটাও একটা ভাবার বিষয় । স্মার্ট ফোন থাকলেই যে শিক্ষার্থী অনলাইনে ক্লাস করতে পারবে তা কিন্তু না। কারন শিক্ষার্থীদের মাঝে ট্যাব বা টাইপিং করার মথ যথাযথ ডিভাইস থাকতে হবে। তিনি মনে করেন শিক্ষার্থীদের ডিভাইস কিংবা স্মার্ট ফোন কিনে দেওয়ার মত এত বড় একটা সিদ্ধান্ত ভেবে চিন্তে যুক্তিযুক্ত উপায়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার ।
আলোচনায় উপস্থিত শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে ছাত্র-ছাত্রীদের সমস্যা সম্পর্কে জানতে চাইলে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেটেরিনারি অনুষদ বিভাগের ছাত্রী আনিকা তাসনিম পূর্বা বলেন, ছাত্র-ছাত্রীরা যখন সরাসরি ক্লাসে অংশগ্রহণ করত, তখন তাদের ইচ্ছাশক্তি বা আগ্রহটা বেশী ছিল ক্লাসে অংশগ্রহন করাটা । কারন প্রতিনিয়ত তাদের মাথায় পরীক্ষার বিষয়গুলো ঘুরপাক খেত এবং এগুলো ভেবে তারা সব সময় প্রস্তত থাকত । কিন্তু এখন শিক্ষার্থীরা সবাই যার যার বাসায় অবস্থান করছে। এক কথায় বলতে গেলে তারা অবসর সময় পার করছে। পরীক্ষার কথা ভেবে অনলাইন ক্লাস করার আগ্রহটা কমে যায় ।
আলোচনায় উপস্থিত অপর একজন ছাত্রী রিফা তাসনিম (মাৎস্য বিজ্ঞান অনুষদ, বাকৃবি ) বলেন, আমি আমার বান্ধবীদের অনলাইন ক্লাস করার জন্য বললে তারা নানা রকম অজুহাত দেখায় এবং ভয় পায় । কারন যদি হঠাৎ করেই বলা হয় ক্লাস টেষ্ট কিংবা ব্যবহারিক পরীক্ষার জন্য অনলাইনে আসতে হয়। এই কারনে কিন্তু তারা অতটা অনলাইনে ক্লাস করার আগ্রহী হয়ে উঠেনা। অনেক শিক্ষার্থী তাকে বলেন যেন কারিকুলাম টা পরিবর্তন করে ছোট করা হয়। এতে করে পুরা কারিকুলাম কাভার করা অল্পসময়ে সম্ভব হবে।
করোনা পরবর্তী সেশন জন কমানে সম্ভব কিনা এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রফেসর ড. মোঃ সহিদুজ্জামান বলেন, ছাত্র-শিক্ষক সবাই এগিয়ে আসলে সেশন জোট কমানো সম্ভব। এজন্য আলোচনা করে সমস্যাগুলো সমাধান করা দরকার। কোর্স কারিকুলাম কমানোর বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন আছে। এটি হয়ে গেলে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের লোড কমে যাবে এবং সেশনজোট কমানো আরও সহজ হবে। এছাড়া পরীক্ষা ও মূল্যায়নের বিষয়গুলো প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে পবিবর্তন করা দরকার।
করোনা পরর্বতী সময় র্কোস ভিত্তিক ক্লাসের সংখ্যা বাড়িয়ে দেওয়া হলে তা ছাত্র-ছাত্রীরা কি ভাবে নিবে, এই সর্ম্পকে জানতে চাইলে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালেয়ের ছাত্রী সামন্ত র্পূবা বলেন যদি কোর্সের সবকিছু পড়াতে অল্প সময়ে বেশি চাপ দেওয়া হয় তাহলে শিক্ষার্থীদের উপর চাপ বেড়ে যাবে। আর যেহেতু বার্ডেন টা অনেক বেশী পড়ে যাবে সেক্ষেত্রে সব স্টুডেন্ট টেকআপ করতে পারবে কিনা সেটা হয়তো একটা প্রশ্ন থেকে যায় । তিনি বলেন যদি এই করোনা অবস্থায় আমাদের পাশ করতে হয় তাহলে রির্টান কোন পরীক্ষা না রেখে ভাইভার আয়োজন করা হয় তাহলে দেখা যাবে একজন শিক্ষার্থীকে প্রশ্ন করা হবে তখন যে কোন ভাবেই নেটে সার্চ করে বা দেখিয়ে বলার তেমন কোন স্কোপ থাকবে না। শুধু ভাইভা টাই আয়োজন করা গেলে ভাল হত।
এই প্রসঙ্গে রিফা তাসনিম বলেন আমরা ৪ মাস পড়াশুনা থেকে বেশ কিছু দুরে সরে আছি। হঠাৎ করে চাপ বেড়ে গেলে অনেকটা মেন্টাল প্রেসারে পরে যাব এবং আসলেই কোপ আপ করতে পারবো কিনা?
যদি করোনা পুরাপুরি নির্মূল না হয় তাহলে সে ক্ষেত্রে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আমাদের কি ধরণের ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন? এই প্রসঙ্গে সুব্রত কুমার কুরী বলেন স্টুডেন্টদের অবশ্যই ফেস মাস্ক বা ফেস কভারিং পড়তে হবে, সোশাল ডিস্টেসিং করতে হবে এবং পাবলিক হেলথ নিয়ে যারা কাজ করেন তাদের সমন্বয়ে একটি কমিটি করে ছাত্র ছাত্রীরা কি ভাবে স্বাস্থ্য বিধি মানবে সেই বিষয়ে আমাদের পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
এ প্রসঙ্গে প্রফেসর ড. সহিদুজ্জামান বলেন , প্রথমত শিক্ষার স্বাস্থ্যগত পরিবেশ নিশ্চিত করা। এর মাঝে যে বিষয় গুলো আসতে পারে সেগুলো হলো শিক্ষার্থীদের জন্য স্বাস্থ্য সম্মত আবাসন ব্যবস্থা। অনেক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আবাসন সংকট রয়েছে, রয়েছে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার অভাব। বিশ্ববিদ্যালয় খোলার আগে কর্তৃপক্ষের এগুলো নিয়ে এখনই কাজ শুরু করা প্রয়োজন। একটি মাত্র কক্ষে একসাথে গাদাগাদি করে অনেক শিক্ষার্থীকে থাকতে হয় যেটিকে গণরুম বলা হয়ে থাকে যা মোটেও স্বাস্থ্যসম্মত নয়।
আলোচনা অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন বাকৃবি ভেটেরিনারি অনুষদের শিক্ষার্থী রনি ইবনে মাসুদ

