জঞ্জালমুক্ত গনতন্ত্রের জন্য প্রয়োজন জাতীয় ঐক্য: রাবিতে তথ্যমন্ত্রী

রাবি প্রতিনিধি:

চেতনার উপলব্ধি মানুষকে বেঁচে থাকতে সাহায্য করে। চেতনাহীন মানুষ বা জাতি সত্যিকার অর্থে অস্তিত্বহীন হয়ে পড়ে। তাই তো চেতনার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখি জাতিগত লড়াই, স্বাধীনতাযুদ্ধ কিংবা সাংস্কৃতিক আন্দোলন। এর জন্য মানুষ অকাতরে তার জীবন বিলিয়ে দিতেও কুন্ঠাবোধ করে না। জীবন দিয়েও সে রক্ষা করে তার চেতনাকে। এমনি এক চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ১৯৬৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি জীবন উৎসর্গ করেছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের শিক্ষক ও প্রক্টর ড. শামসুজ্জোহা। প্রকৃতপক্ষে তিনিই ছিলেন আমাদের মহান স্বাধীনতাযুদ্ধে প্রথম শহীদ বুদ্ধিজীবী। ড. জোহার আত্মত্যাগের পথ ধরেই এগিয়ে গিয়েছিল বাঙালি জাতির জাগরণী চেতনা, অর্জিত হয়েছিল আমাদের কাঙ্খিত স্বাধীনতা।

সৈয়দ মুহম্মদ শামসুজ্জোহা ১৯৩৪ সালের ১ মে পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। ড. জোহা ১৯৪০ সাল থেকে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত বাঁকুড়া জেলা স্কুলে পড়াশুনা করে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় কৃতিত্বের সাথে প্রথম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হন। ১৯৫০ সালে বাঁকুড়া ক্রিশ্চিয়ান কলেজ থেকে তিনি প্রথম শ্রেণীতে ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় পাস করেন। ১৯৫০ সালের প্রথম দিকেই পূর্ব ও পশ্চিমবঙ্গে সামপ্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হলে তার পরিবার পূর্ব পাকিস্তানে আসার সিদ্ধান্ত নেয় এবং এরই অংশ হিসেবে ১৯৫০ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়নে ¯œাতক (সম্মান) শ্রেণীতে ভর্তি হন । এর অল্প পরই পুরো পরিবার ঢাকায় চলে আসে।

ড.জোহা ১৯৫৩ সালে ¯œাতক (সম্মান) পরীক্ষায় দ্বিতীয় শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হন এবং ১৯৫৪ সালে কৃতিত্বের সাথে ¯œাতকোত্তর ডিগ্রী লাভ করেন। ২৩ ফেব্রুয়ারি রসায়ন বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন। এর কিছুদিনের মধ্যেই তিনি লন্ডনের ইমপেরিয়াল কলেজে-এ উচ্চ ডিগ্রী লাভের জন্য একটি স্কলারশীপ পান এবং ১৯৬১ থেকে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত তিনি যুক্তরাজ্যে তাঁর গবেষণা কাজের মাধ্যমে পিএইচডি ও ডিইসি ডিগ্রী লাভ করে ফিরে আসেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৬৫ থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত তিনি শাহ মখদুম হলের আবাসিক শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং এরপর নিযুক্ত হন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর হিসেবে।

১৯৬৯ সালের ১৮ ফেব্রয়ারি, পূর্ব রাত্রির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সকাল সাড়ে ৯টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের মেইন গেটে প্রায় হাজার দুয়েক ছাত্র-ছাত্রী বিভিন্ন হল থেকে এসে সমবেত হয় এবং চারজন করে লাইনে দাঁড়িয়ে শহরের দিকে অগ্রসর হবার চেষ্টা করছিল। পুলিশ ও ইপিআর মিছিলে বাধা দেয়, সেনাবাহিনীর জোয়ানরাও মিছিল ঠেকাতে ছাত্রদের দিকে রাইফেল তাক করে। ছাত্ররা যে কোন মূল্যে মিছিল করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ এবং তারা কর্মরত সেনা অফিসারদের সাথে তুমুল বিতর্কে লিপ্ত হন। মিছিল সামনে অগ্রসর হলে গুলি করার হুমকি দেয়া হলে ছাত্ররা আরো উত্তেজিত হয়ে উঠে। ড. জোহা তাঁর সহকর্মীদের নিয়ে একবার ছাত্রদেরকে পরিস্থিতির ভয়াবহতা বোঝাচ্ছেন আবার কখনও কর্মরত সেনা কর্মকর্তা ও ম্যাজিস্ট্রেটকে বোঝাচ্ছিলেন।

তিনি সামরিক কর্মকর্তাদের বার বার বলছিলেন, ‘প্লিজ ডোন্ট ফায়ার, আমার ছাত্ররা এখনই চলে যাবে ক্যাম্পাসের দিকে।’ কিন্তু অবাঙালি সামরিক অফিসারটি প্রথম থেকেই উত্তেজিত ছিলেন এবং তিনি বার বার জোয়ানদের গুলি করার জন্য প্রস্তুত হতে বলছিলেন। ড. জোহা তাঁর সহকর্মীদের নিয়ে অনেক কষ্টে একসময় ছাত্রদেরকে বুঝিয়ে গেটের ভেতরে পাঠাতে সক্ষম হলেন এবং ছাত্রদের অধিকাংশই তখন গেটের ভিতর হকি গ্রাউন্ডে চলে এসেছে । পরিস্থিতি যখন শান্ত হওয়ার পথে তখনই হঠাৎ করে গুড়ৃম গুড়–ম করে গুলির শব্দ। মহুর্তের মধ্যেই আতঙ্ক ও উৎকন্ঠা ছড়িয়ে পড়ে ছাত্র-শিক্ষকদেরে মাঝে। প্রথমে ছাত্ররা বুঝতে পারছিল না ড. জোহা ও তাঁর সহকর্মীদের ভাগ্যে কি ঘটেছে। দুপুর বারোটার দিকে ক্যাম্পাসে খবর আসে ড. জোহাকে প্রথমে কাছ থেকে গুলি ও পরে বেয়নেট চার্জ করে ক্ষত-বিক্ষত করা হয় এবং তাকে মরণাপন্ন অবস্থায় রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়, খবর পেয়েই ছাত্র-জনতা ভিড় জমায় হাসপাতালে। ইতিমধ্যেই প্রচুর রক্তক্ষরণের কারনে অপারেশন থিয়েটারে অনেক চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন ডাক্তাররা। ইন্তেকাল করেন ড. জোহা, কিন্তু নাম লিখিয়ে যান ইতিহাসের পাতায়, বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে প্রথম শহীদ বুদ্ধিজীবী হিসেবে। তার সেই রক্ত¯œাত পথ ধরে গণআন্দোলন গণঅভ্যুথানে পরিণত হয়।

২০০৮ সালে ড. জোহাকে মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কার দিয়ে সম্মান জানায় বাংলাদেশ সরকার। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের একটি হলের নামকরণ করা হয়েছে তার নামানুসারে এবং সেই থেকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন প্রতিবছর ১৮ ফেব্রুয়ারি দিনটি ‘শিক্ষক দিবস’ হিসেবে পালন করে আসছে।
দিবসটি উপলক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ ছুটি ছাড়াও নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে প্রশাসনসহ বিভিন্ন সংগঠন। দিবসটিকে কেন্দ্র করে প্রতিবছর আয়োজিত ‘জোহা স্মারক বক্তৃতা’য় এবার স্মারক বক্তা থাকবেন তথ্য মন্ত্রী হাসানুল হক ইনু।

এছাড়াও দিবসটি উপলক্ষে আয়োজিত বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে সকাল ৬ টা ৪৫ মিনিটে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে শহীদ ড. জোহার মাজার ও জোহা স্মৃতিফলকে পুষ্পস্তবক অর্পণ। সকাল ৭টায় আবাসিক হলসমূহসহ বিভিন্ন পেশাজীবী সমিতি ও সংগঠনের পক্ষ থেকে শহীদ ড. জোহার মাজার ও জোহা স্মৃতি ফলকে পুষ্পস্তবক অর্পণ। সকাল ৭ টা ১৫ মিনিটে ও সাড়ে ৭ টায় যথাক্রমে রসায়ন বিভাগ ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি কর্তৃক শহীদ ড. জোহার মাজার ও জোহা স্মৃতিফলকে পুষ্পর্স্তবক অর্পণ। সকাল সাড়ে ৮টায় বিশ্ববিদ্যালয় অফিসার সমিতি কার্যালয়ে আলোচনাসভা।

এছাড়া সকাল ১০ টায় সিনেট ভবনে জোহা স্মারক বক্তৃতা। এরপর বাদ জোহর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে কোরআনখানি ও বিশেষ মোনাজাত। বিকেল সাড়ে ৪ টায় শহীদ শামসুজ্জোহা হলে আলোচনা সভা ও সন্ধ্যায় প্রদীপ প্রজ্জ্বলন অনুষ্ঠিত হবে।

  •  
  •  
  •  
  •  

Tags: