বিদায় বেলা রংয়ের খেলা

সজীব হোসাইন,রংপুর :

সাত বছর আগে ভর্তি হওয়ার পর হাঁটি হাঁটি পা পা করে যাত্রা শুরু হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ব্যাচ। অস্থায়ীভাবে ২০০৮-০৯ শিক্ষাবর্ষে তিনটি অনুষদের অধীনে ৬টি বিভাগের ৩০০ জন ছাত্রছাত্রী নিয়ে রংপুর শহরের লালকুঠি শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয় ২০০৯ সালের ৪ এপ্রিল। একে একে বছর পার। আরও পড়াশোনা, আরও টেনশন। অস্থায়ী ক্যাম্পাস থেকে স্থায়ী ক্যাম্পাস পাওয়া সবই যাঁদের চোখের সামনে। ক্যাম্পাসের আনাচে-কানাছে যাঁদের ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে কত মজার স্মৃতি আনন্দ বেদনার বিভিন্ন ঘটনা। আজ তাঁদের অনেকেরই সম্পন্ন হয়েছে স্নাতকোত্তর। মনের কোনে তাই বেজেছে বিদায়ের ঘণ্টা। নবীন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে নানামুখী আন্দোলনে দীর্ঘ সেশনজটে রয়েছেন তাঁরা। অ্যাকাডেমিক ক্যালেন্ডার অনুযায়ী অনেক আগেই শিক্ষা জীবন শেষ করে বিদায় নেওয়ার কথা থাকলেও বিদায় বেলায় যেন সব ভুলে গেলেন প্রথম ছয়টি বিভাগের ছাত্রীরা।

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে ২০১৩ সাল থেকে প্রথম হলের আবাসিকতা পান প্রথম ব্যাচের ছাত্রীরা। হলে ইতোমধ্যে কেটেছে তাঁদের দীর্ঘ সময়। বিদায় বেলায় তাই চোখ ভার করে শেষ হাসির চেষ্টা যেন সকলরই। তাই মঙ্গলবার(২৩ ফেব্রুয়ারি) দিনটা প্রতিদিনের মত আলো ঝলমলে হলেও মনের কোনে বিষাদের অজানা সুর। আলো মন ছুঁয়েও যেন ছুঁতে পারছে না। আর এক সাথে জমবে না আড্ডা। হবে না সুখ- দুঃখের খুনসুটি। কারণ আজই তাঁরা আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় নিচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের একমাত্র ছাত্রী হল শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হল থেকে।
হল সমাপনী বা বিদায় উৎসবের দিন সকাল থেকে জড়ো হতে থাকেন ক্যাম্পাসে। সবাইকে টি-শার্ট বিতরণ করা হয়। অনেকেই হাতে তুলে নেন খেলনা বাঁশি, ঢোল আর ঝুনঝুনি। এগুলোর শব্দে মুখরিত হতে থাকে ক্যাম্পাস চত্বর। আর ব্যান্ড পার্টি তো সঙ্গেই ছিল। হলটির প্রাধ্যক্ষ ড. তুহিন ওয়াদুদ উপস্থিতিতে আনুষ্ঠানিকভাবে সূচনা করেন বিদায় উৎসবের। তারপর শুরু হয় রং ছোড়াছুড়ি। একে অন্যকে রঙে রাঙানোর পালা। ব্যান্ড পার্টির বাজনার তালে তালে নাচতে নাচতে গান গাইতে গাইতে মুখরিত হয় পুরো ক্যাম্পাস। আবার বিকালে সবাই মিলে প্রিয় ক্যাম্পাস ভ্রমণ।
‘বেলা বাড়ার সাথে সাথে বাড়তে থাকে বিদায়ের সুরধ্বনী, প্রিয় ক্যাম্পাসের জন্য, শিক্ষক আর ছোট ভাই-বোনদের জন্য এভাবে কাঁদাবে হবে তা জানা ছিল না। কিভাবে সময় গুলো পার করলাম ভাবতেই পারি না। যদি আবার প্রথম থেকে শুরু করতে পারতাম তাহলে মনে হয় আরও ভালো হত’— অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে এভাবেই বলছিলেন প্রথম ব্যাচের ছাত্রীরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটা ইটের গল্প যাঁদের জানা তাঁদের হারিয়ে পুরো ক্যাম্পাসই যেন থমথমে!

সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে হলটির প্রাধ্যক্ষ ড. তুহিন ওয়াদুদের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ কে এম নূর-উন-নবী। এ সময় উপাচার্য প্রথম ছয়টি বিভাগের সর্বোচ্চ ফলাফলধারী বাংলা বিভাগের আরিফা সুলতানা, অর্থনীতি বিভাগের সল্পনা রানী রায়, গনিত বিভাগের মারিনা আক্তার, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের লাবনী আক্তার, একাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরনেশন সিস্টেমস্ বিভাগের তাহমিনা বেগম রুমিকে বিশেষ সম্মাননা ক্রেস্ট প্রদান করেন। পরে প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থীদের উত্তরীয়,স্যুভেনির ও সম্মাননা ক্রেস্ট প্রদান করা হয়।

BRUR 23.02.2016 (2)

সমাপনী সম্মাননা পর্বের অনুষ্ঠানে সুইটি সরকার সৃষ্টির সঞ্চালনায় বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য করেন উপাচার্যের সহধর্মিণী গুলনাহার নবী, প্রকৌশল ও প্রযুক্তি অনুষদের ডিন ড. মো. তাজুল ইসলাম, বিজনেজ স্টাডিজ অনুষদের ডিন ড. মো. মতিউর রহমান, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের প্রাধ্যক্ষ কমলেশ চন্দ্র রায়। এসময় অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন হলটির সহকারী প্রাধ্যক্ষ শেখ মাজিদুল হক, ড. নিতাই কুমার ঘোষ, সাব্বীর আহমেদ চৌধুরী, কুন্তলা চৌধুরী, কাশফিয়া ইয়াসমিন অম্বা প্রমুখ।

সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের বিশেষ চমক হিসেবে ছিল র্যা ম্প ওয়াক। যেখানে উপাচার্যের সাথে হাঁটেন ইংরেজি বিভাগের প্রথম ব্যাচের ছাত্রী সাদিয়া কবীর। সমাপনী অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে সবার অনুভূতি প্রকাশের মাধ্যমে শেষ হয় হল সমাপনী। হলে আবাসিক ছাত্রীরা তাদের অনুভূতির কথা ব্যক্ত করে বলেন, ‘ভীষণ আনন্দ লাগছে ঠিকই কিন্তু তার মাঝেও খানিকটা বেদনা লুকিয়ে আছে, আর সেটা হচ্ছে-ভালোবাসার বেরোবি ক্যাম্পাস এবং বন্ধুদেরও ছেড়ে যাওয়ার কষ্ট।’

সবশেষে অশ্রুসিক্ত লোচনে আর নির্বাক কণ্ঠে তাদের অন্তর বলে উঠে যেন, ‘দেখা হবে বন্ধু কারণে বা অকারণে…’। আর এই এরকম কিছু টক-ঝাল-মিষ্টি-মধুর গানের মধ্য দিয়ে শেষ হয় আনন্দঘন প্রথম ব্যাচের হল সমাপনী উদযাপন।

  •  
  •  
  •  
  •  

Tags: