উচ্চশিক্ষা ও টেকসই উন্নতি

ড. মোহম্মদ তফাজ্জল হোসেন

কোন দেশের টেকসই উন্নতি নির্ভর করে ঐদেশের নতুন নতুন টেকসই প্রযুক্তি উদ্ভাবনের উপর। টেকসই প্রযুক্তি উদ্ভাবনের জন্যে প্রয়োজন উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার মান বাড়ানো। আর উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার তীর্থস্থান হল বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ তিনটি – গবেষণা, শিক্ষাদান, সম্প্রসারণ (Research, Education, Extension)। এই কাজটি যিনি করে থাকেন, তিনি হলেন শিক্ষক। শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড আর শিক্ষক হচ্ছেন সেই মেরুদণ্ডের মেরুরজ্জু (স্পাইনাল কর্ড)। বিশ্ববিদ্যালয়ে চরম প্রতিযোগিতায় ভাল রেজাল্ট করে শিক্ষক হতে হয়। যারা শিক্ষক হতে ইচ্ছুক তাদের বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান ও গবেষণা আগ্রহ সাধারণত বেশি থাকে এবং তাদেরকে সাবজেক্ট মেটার স্পেশালিস্ট হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। একটি টেকসই উন্নত জাতি গঠনের লক্ষ্যে, জ্ঞানের গভীরে প্রবেশ ও গবেষণার জন্যে অথবা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হওয়ার জন্যে এই সাবজেক্ট স্পেশালিস্টদের খুবই প্রয়োজন। একটি দেশের টেকসই উন্নতির জন্য গবেষক তৈরীর নিমিত্তে এই সাবজেক্ট মেটার স্পেশালিষ্ট অত্যাবশকীয়।

আমার জানা মতে বর্তমান বিশ্বে গবেষণা খাতে সবচেয়ে বেশি বাজেট রাখে দক্ষিণ কোরিয়া । প্রতিবছর বিশ্বের প্রচুর নামী দামী গবেষকদের আমন্ত্রণ জানায় তাদের দেশে এবং প্রতিনিয়ত নতুন নতুন টেকনোলজির পেটেন্ট অর্জন করছে। ইউরোপ বা আমেরিকার উদাহরণ দেওয়ার দরকার নাই। এশিয়ার কিছু দেশের উদাহারণ দেয়া যেতে পারে । মালয়েশিয়া বিগত কয়েক দশক যাবত, বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ হতে উচ্চ বেতন দিয়ে খ্যাতিমান শিক্ষকদের আমন্ত্রণ করে তাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়ানো ও গবেষণা করার জন্য । ইতিমধ্যে তারা শিক্ষাক্ষেত্রে প্রচুর উন্নতি সাধন করেছে । চীন এর কথা আলাদা করে বলতে হয় । বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে দামি পোস্টডক্টরাল ফেলোশিপ প্রদান করে চীন। তারা উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা খাতে এমন পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে ও পরিবেশ তৈরী করেছে যে, তাদের দেশে যত বিখ্যাত গবেষক, বিজ্ঞানী ও শিক্ষক অন্য দেশে ছিলো তাদেরকে আকর্ষণ করা হয়েছে । তাদের অধিকাংশই দেশের প্রতিষ্ঠানে ফিরে এসেছে । আমাদের সময় এসেছে এরকম পরিকল্পনা হাতে নেওয়ার । প্রযুক্তি ধার করে বেশি দিন টিকে থাকা যায় না । উন্নত দেশ তৈরী করতে হলে অবশ্যই টেকশই প্রযুক্তি উদ্ভাবন করতে হবে । প্রয়াত নন্দিত সাহিত্যিক ড. হুমায়ূন আহমেদ দৈনিক প্রথম আলোর এক কলামে লিখেছিলেন, উনি যখন ক্যান্সার চিকিৎসার জন্যে আমেরিকার সবচেয়ে বিখ্যাত হাসপাতালে গিয়েছিলেন, তখন হাসপাতালের পরিচালক এসে বাংলায় ওনাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন। তার মানে তিনি একজন বাঙালি। এরকম হাজারো বাঙালি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নামকরা প্রতিষ্ঠানে সম্মানিত অবস্থানে রয়েছেন, যেমন গবেষক, চিকিৎসক, কৃষিবিদ, প্রকৌশলী প্রভৃতি। তাদের অন্তর সদা ব্যাকুল থাকে দেশের জন্য কিছু করার, দেশে ফিরে এসে দেশ গড়ার। কিন্তু আমরা তাদের উপযুক্ত পরিবেশ দিতে পারিনা, সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে পারিনা । দেশের টেকশই উন্নতির জন্য আমাদের মেধাকে কাজে লাগাতে হবে ।

সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অভিন্ন নীতিমালা নামক যে মেনুস্ক্রিপ্ট তৈরি করা হয়েছে, তাতে আসলে সুদূর প্রসারী ও প্রশস্ত কোনো পরিকল্পনা আছে বলে মনে হয় না। বরং মনে হয় যে, এটা কোনো উর্বর মস্তিষ্কের খুবই অগভীর ও সংকীর্ণ চিন্তার ফসল। কাজী মোতাহার হোসেন চৌধুরী তার ‘শিক্ষা ও মনুষ্যত্ব’ প্রবন্ধে বলেছেন শিক্ষার দুটি উদ্দেশ্য। একটি ক্ষুদ্র উদ্দেশ্য অপরটি বৃহৎ উদ্দেশ্য। সংক্ষেপে ক্ষুদ্র উদ্দেশ্য হলো আমরা পাশ করে চাকরি করে জীবিকা নির্বাহ করব। আর বৃহৎ উদ্দেশ্য হল, আমরা জ্ঞান অর্জন করব, জ্ঞানচর্চা করব। আলোচিত অভিন্ন নীতিমালায়, শিক্ষার শুধু ক্ষুদ্র উদ্দেশ্যই ফুটে উঠেছে। বৃহৎ উদ্দ্যেশ্যের কোন স্থান হয়নি। এখানে শিক্ষকতাকে শুধুমাত্র একটা চাকরি হিসেবে দেখা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে এটা শুধুমাত্র একটা চাকরি নয়, এটা অনেক দায়িত্বের সমষ্টি।

উচ্চ শিক্ষা ধ্বংসের আর একটি ভয়ঙ্কর কারণ এখানে উল্লেখ না করলেই নয়। সবাই বিসিএস নামক সোনার হরিণের পেছনে দৌড়াচ্ছে। কথা ছিল একজন কৃষিবিদ কৃষি বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হবে, চিকিৎসক চিকিৎসা বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হবে, ইঞ্জিনিয়ার তার বিষয়ে দক্ষ হবে এবং দেশের উন্নয়নে তাদের মেধাকে কাজে লাগিয়ে নতুন নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করবে। তাদের এই টেকনিক্যাল বিশেষত্ব দিয়েই প্রত্যাশিত চাকরি পাবে। একজন শিক্ষক হিসেবে, আমি আমার ছাত্র-ছাত্রীদেরকে তার বিষয়ভিওিক জ্ঞানের প্রতি আকর্ষন করতে পারছিনা। বাস্তবতাকে মেনে নিয়েই তাদের সাথে একত্বতা প্রকাশ করছি । যার ফলশ্রুতিতে আমরা বিশেষজ্ঞ ডাক্তার, কৃষিবিদ বা প্রকৌশলী পাচ্ছিনা। আর সঙ্গত কারণেই আমরা বিদেশ নির্ভর হয়ে যাচ্ছি। এটা আমাদের উচ্চ শিক্ষার একটি ভয়ানক খারাপ দিক।

প্রশ্ন হল টেকনিক্যাল ছাত্ররা কেন অন্য সেক্টরে যাবে। তাদেরকে তাদের জায়গার ধরে রাখতে হবে। তাদের  জায়গায় মূল্যায়ন করতে হবে। মূল্যায়ন করতে না পারলেও অবমূল্যায়ন করা যাবে না।  সবচেয়ে আশংকার জায়গাটি হল, একজন ছাত্র যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন বিষয়ে ভাল রেজাল্ট করল। অতপর তার বিশেষায়িত জ্ঞানকে কাজে লাগানোর জন্য তাকে উক্ত বিভাগের শিক্ষক হওয়ার জন্য সুযোগ দিতে হবে যাতে সে আমাদের মেধাবী ছাত্রদেরকে তার জ্ঞান শেয়ার করতে পারে। কিন্তু ছাত্রটি যদি সে সুযোগ না পায়, এমনকি নিজ পেশায় চাকরি না নিয়ে অন্যত্র চলে যায় সেক্ষেত্রে তার বিশেষায়িত জ্ঞানকে কাজে লাগানো যাবে না। প্রতিনিয়ত বিষয়টি আমরা প্রত্যক্ষ করছি। তার এই জায়গাটি পূরণ হওয়া খুবই কঠিন এবং উচ্চশিক্ষার জন্য এটা একটা অশনি সংকেত ও বটে। যাহোক এভাবে আমাদের বিশেষায়িত জ্ঞান নষ্ট হয়ে গেলে অচিরেই হয়ত তার পরিনতি ভোগ করতে হবে।

উচ্চশিক্ষার মান উন্নয়নের লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন যে অভিন্ন নীতিমালা প্রণয়ন করেছে তা বাস্তবায়িত হলে উচ্চশিক্ষার পরিণতি সোনার ডিমপাড়া হাঁসের মতো হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অর্থাৎ এই সেক্টরে ভাল কেউ আসতে চাইবে না। এই নীতিমালা শুধুমাত্র শিক্ষকদের প্রমোশন বা আপগ্রেডেশনকে বিলম্বিত করতে দেখানো হয়েছে। সঠিক হলো, বিলম্বিত ও ত্বরান্বিত দুইটাই থাকতে হবে। অর্থাৎ বাধা ও অনুপ্রেরণা দুইটাই থাকতে হবে। মূল্যায়ন করতে হবে বৈজ্ঞানিক গবেষনা প্রবন্ধ প্রকাশ (ইমপেক্ট ফ্যাক্টর জার্নালে) ও ক্লাসে ছাত্র-ছাত্রীদের মূল্যায়নের ভিত্তিতে। ইমপেক্ট ফ্যাক্টর জার্নালে প্রকাশ করলেই তার বেতন বৃদ্ধি পাবে বা ইনক্রিমেন্ট যুক্ত হবে, অন্যথায় নয়। যে ব্যবস্থা দক্ষিণ কোরিয়ায় চালু আছে। এটা হলে গবেষকরা সারাদিন গবেষণাগারের পড়ে থাকবে। আর ক্লাসের পারফরমেন্স ছাত্র-ছাত্রীদের মাধ্যমে মূল্যায়ন করবে।

বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গত এক দশকে দেশে যে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে তা সত্যিই প্রশংসনীয়। এই সময়ে দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় তিনগুণ। ইতোমধ্যে আমরা মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছি। আমাদের পরবর্তী ভিশন-২০৪১, এই সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ উন্নত দেশে পরিণত হবে। ভিশন-২০৪১ কে বাস্তবায়ন ও ফলপ্রসূ করতে হলে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা খাতকে ঢেলে সাজাতে হবে এবং উচ্চশিক্ষা কমিশন গঠন করতে হবে ।

লেখকঃ
অধ্যাপক ড. মোহম্মদ তফাজ্জল হোসেন
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

  •  
  •  
  •  
  •  
ad0.3