জনপ্রিয়তা বাড়ছে ভাসমান পদ্ধতিতে সবজি চাষ (ভিডিও)

নিজস্ব প্রতিবেদক:
জলাবদ্ধ বা বিল এলাকায় ভাসমান পদ্ধতিতে চারা উৎপাদন ও সবজি চাষ সারা দেশে ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছে। এ পদ্ধতিতে ক্রমেই আকৃষ্ট হয়ে উঠছে দেশের বিভিন্ন জেলার কৃষকরা। তবে অন্যান্য জেলা চেয়ে পিরজপুর জেলায় এ পদ্ধতি বেশ জনপ্রিয়।

জানা গেছে, স্বরূপকাঠি উপজেলার উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে ১নং বলদিয়া ইউনিয়নের বিল অঞ্চলখ্যাত চামী ও গগন এলাকা এবং নাজিরপুর উপজেলার কলারদোয়ানিয়া ও দেউলবাড়ী দোবরা ইউনিয়নের ১৩ থেকে ১৫টি গ্রামের নিম্নাঞ্চল বৈশাখ থেকে কার্তিক মাস পর্যন্ত থৈ থৈ করে পানিতে। ফলে এ সময় কৃষি কাজ না থাকায় অলস সময় কাটাতে হতো কৃষকদের। বর্তমানে নাজিরপুরে প্রায় ১০ হাজার ও স্বরূপকাঠিতে দুই গ্রামের শতাধিক পরিবার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত থেকে ভাসমান ধাপের ওপর সবজি চারা উৎপাদন করে। এর মাধ্যমে কৃষকরা নিজেরা স্বাবলম্বী হওয়ার পাশাপাশি অন্যদেরও স্বাবলম্বী করছেন। সবজির চারা পরিবহন ও ক্রয়-বিক্রয়ের মাধ্যমে জীবিকার ব্যবস্থা হয়েছে কয়েক হাজার মানুষের। অনাবাদি জমি বর্তমানে খুবই মূল্যবান হয়ে উঠেছে ওই এলাকার মানুষের কাছে।

প্রায় ৩০ বছর আগে ভাসমান এ চাষ পদ্ধতির উদ্ভাবন করেন জেলার নাজিরপুর উপজেলা ও নেছারাবাদ (স্বরূপকাঠী) উপজেলার কৃষকরা। আস্তে আস্তে এ চাষাবাদ ছড়িয়ে পড়ে বরিশাল, গোপালগঞ্জ, খুলনা এবং যশোরসহ বিভিন্ন বিল ও হাওর-বাঁওড় এলাকায়।

এলাকাবাসী ও কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিল এলাকা হওয়ায় বছরের বেশিরভাগ সময় এসব এলাকার জমি পানিতে তলিয়ে থাকে। ফলে ওই সব জমিতে কোনো ফসল চাষ করা সম্ভব হয় না এবং জমিগুলো কচুরিপানা, দুলালী বন, শেওলা ও ফ্যানা ঘাসসহ বিভিন্ন জলজ উদ্ভিদে ভরা থাকে। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে কৃষকরা সম্মিলিত উদ্যোগে জমির পানিতে প্রাকৃতিকভাবে জন্ম নেয়া উদ্ভিদকে স্তূপ করে বিশেষ এক পদ্ধতিতে পানির ওপরই ৭০ থেকে ৮০ ফুট লম্বা ও পাঁচ থেকে ছয় ফুট চওড়া এবং ২ থেকে ২.৫ ফুট বীজতলা (স্থানীয়ভাবে ধাপ নামে পরিচিত) তৈরি করে তার ওপর নারকেলের ছোবড়ার গুঁড়া ও ক্ষুদ্রাকৃতির বিভিন্ন ধরনের জলজ উদ্ভিদ পচিয়ে বীজতলা বানানো হয়। সেখানে বীজ বপন করে উৎপাদন করা হয় বিভিন্ন প্রজাতির চারা, এমনকি স্বল্পজীবী বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি। কৃষকরা বিশেষভাবে তৈরিকৃত ধাপের ওপর প্রায় সব ধরনের শাকসবজির চারা ও শাকসবজি উৎপাদন করেন। নাজিরপুর ও নেছারাবাদ থেকে উৎপাদিত চারাই দক্ষিণাঞ্চলের অধিকাংশ চারার চাহিদা পূরণ করে। বর্তমানে ওই সব বিল অঞ্চলে শত শত হেক্টর জলাবদ্ধ জমিতে কয়েক হাজার কৃষক ও চারা ব্যবসায়ী চাষাবাদ নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। আগে তারা চারা বিক্রি করে খুব একটা লাভবান না হলেও, বর্তমানে চারার দাম ভালো থাকায় কৃষকরা বেজায় খুশি।

সরেজমিনে দেখা গেছে, জেলার নাজিরপুর উপজেলা সদর থেকে ২০ কিলোমিটার উত্তরে নিম্নাঞ্চল দেউলবাড়ী দোবড়া ও মালিখালী ইউনিয়নের মুগারঝোর, কলারদোয়ানিয়া, দীর্ঘা, বৈঠাকাঠা, খলনি, মেদা, সাঁচিয়া, পাকুরিয়া, গাওখালী, পদ্মডুবি, বিল ডুমুরিয়াসহ অনেক গ্রামের পতিত জমিতে ভাসমান পদ্ধতিতে শাকসবজি ও এর চারা উৎপাদন এবং ক্রয়-বিক্রয়ে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন কৃষকরা।

কৃষকরা ধাপ পদ্ধতিতে বীজ থেকে লাউ, কুমড়া, পেঁপে, বেগুন, বাঁধাকপি, করলা, ঝিঙে, শিম, বরবটি, টমেটো ও শসার চারা উৎপাদন করেন।

নাজিরপুর উপজেলার মুগারঝোর গ্রামের কয়েকজন কৃষক জানান, এক মৌসুমে চারা উৎপাদন ও বিক্রি করে একরে প্রায় ২২ হাজার টাকা লাভ থাকে। পানিবেষ্টিত এ অঞ্চলে ধাপ পদ্ধতির চাষে জড়িত চাষিদের সহজশর্তে ঋণ দিলে চাষাবাদের আরও বিস্তৃতি ঘটবে। মানুষের আর্থিক অবস্থার উন্নতি হবে। মুগারঝোর কৃষি উন্নয়ন সমিতির সভাপতি আক্তার হোসেন বলেন, পণ্য পরিবহনের জন্য উন্নত ব্যবস্থা চালুসহ এলাকায় একটি হিমাগার স্থাপনের দাবি আমাদের দীর্ঘদিনের। এ ছাড়া বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) একটি বীজ বিক্রয় কেন্দ্র স্থাপন একান্ত জরুরি। পাশাপাশি কচুরিপানা সঙ্কটের কারণে চাষাবাদ ব্যাহত হচ্ছে। তাই এ এলাকায় কচুরিপানা চাষাবাদ করার কৌশল উদ্ভাবন প্রয়োজন।

বিস্তারিত দেখুন ভিডিওতে….

  •  
  •  
  •  
  •  

Tags: