ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদনে ঘুরছে সাফল্যের চাকা (ভিডিও)

বান্দরবান সংবাদদাতা:
বান্দরবানের সদর ইউনিয়নের গোয়ালিখোলার কৃষক আবুল বশর গত বছরের অক্টোবর থেকে এই পর্যন্ত নানা কৃষি পণ্য বিক্রি করে ২ লাখ ৭০ হাজার টাকা আয় করেছেন। তাঁর এই সাফল্যের পেছনে বড় কোনো পুঁজি বা প্রযুক্তি নেই। সামান্য কেঁচোই রাতারাতি লাখপতি কৃষকে পরিণত করেছে তাঁকে।

কী করে এই সাফল্য? আবুল বশর যা বললেন, তার সারমর্ম হলো, গোবর মিশ্রিত মাটিতে কেঁচোর চাষ করছিলেন তিনি। কেঁচোর বংশ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে গোবর থেকে তৈরি হয় ভার্মি কম্পোস্ট বা কেঁচো কম্পোস্ট সার। এই সার ও কেঁচো কয়েক একর সবজি খেতে দিয়ে বাকিটুকু বিক্রিও করলেন তিনি। সবজি খেতের ফলন হলো প্রত্যাশার চেয়ে বেশি। জমিতে কীটনাশক প্রয়োগও করেননি তিনি।

মেহগনিগাছের বীজ, চিটাগুড়, গোবর আর কচুরিপানা দিয়ে তৈরি জৈব কীটনাশক ব্যবহার করে পেয়েছেন বিষমুক্ত সবজি। বিষমুক্ত সবজি, কেঁচো ও সার বিক্রি করে লাভের মুখ দেখেছেন তিনি।

গোয়ালিখোলায় আবুল বশরের মতো আরও অনেক কৃষক কেঁচোর সাহায্য নিয়ে কাঙ্ক্ষিত লাভের মুখ দেখেছেন। তাঁরা সবাই নিজ বাড়িতে কেঁচো ও ভার্মি কম্পোস্ট সার উৎপাদন করেছেন। সেই সার ব্যবহার করে ফলিয়েছেন বিষমুক্ত সবজি। এলাকার আরেক চাষি থুইসানু মারমা জানান, বেসরকারি সংস্থা তরঙ্গ থেকে তারা একটি কেঁচো তিন টাকা করে সংগ্রহ করে চাষ করেছেন। এরপর জমিতে কেঁচো থেকে উৎপাদিত সার ব্যবহার করে আশাতীত ফলন পেয়েছেন। এ জন্য তাঁরা কেঁচো উৎপাদন, ভার্মি কম্পোস্ট ব্যবহার ও বাজারজাতকরণে আগ্রহী হয়েছেন তাঁরা। এতে সারের খরচ কমলেও ফসলের উৎপাদন বেড়েছে। পাশাপাশি কেঁচো ও ভার্মি কম্পোস্ট বিক্রি করে বাড়তি আয়ও করেছেন তাঁরা।


আবার ফেরা যাক আবুল বশরের কথায়। সফল এই চাষি অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ১৫ হাজার টাকার কেঁচো, ৩৫ হাজার টাকার ভার্মি কম্পোস্ট সার, ২ লাখ ১০ হাজার টাকার বিষমুক্ত শিম ও ১০ হাজার টাকার ক্যাপসিকাম বিক্রি করেছেন। খেতে এখনো মরিচ, শসা, জালি কুমড়া ও লাউ রয়েছে। এসব বিক্রি করেও ভালো লাভ থাকবে বলে জানান তিনি।

আবুল বশর বলেন, ‘কেঁচো এভাবে ভাগ্য বদলে দিতে পারে, তা আমার আগে জানা ছিল না। চাষ করেই বুঝতে পারছি, কেঁচো ও কেঁচো থেকে পাওয়া জৈব সার বিক্রি করে লাখ টাকা আয় করা যায়। আবার কেঁচো সারে উৎপাদিত জৈব কৃষি পণ্যের দামও অনেক বেশি।’

আবুল বশর জানান, গোয়ালিখোলার চাষিদের বেশ কয়েকটি সমবায় সমিতি এখন জৈব পদ্ধতিতে চাষ করতে চাষিদের উৎসাহ দিচ্ছে। আর খরচ কম ও লাভ বেশি হয় বলে এই পদ্ধতি জনপ্রিয়তাও পাচ্ছে। কথা হয় বান্দরবান মসলা চাষি সমিতির সভাপতি চিংসাউ মারমার সঙ্গে। তিনি বলেন, কেঁচো উৎপাদন অত্যন্ত লাভজনক। প্রতিটি কেঁচো দুই টাকা করে বিক্রি করা যায়। কেঁচো থেকে পাওয়া জৈব সার নিজে ব্যবহারের পাশাপাশি প্রতি কেজি ৩৫-৪০ টাকায় বাজারে বিক্রিও করা যায়।

এ ব্যাপারে বেসরকারি সংস্থা তরঙ্গের কৃষি কর্মকর্তা মহিউদ্দিন চৌধুরী বলেন, কেঁচো জিবরাইলিক অ্যাসিড নামে একধরনের পদার্থ নিঃসরণ করে। গোবর ও পচনশীল উপাদানের সঙ্গে ওই অ্যাসিড মিশে গেলে ইউরিয়া, পটাশসহ বিভিন্ন রাসায়নিক সারের সব গুণাগুণ একসঙ্গে পাওয়া যায়। এ জন্য জৈব কেঁচো সার ব্যবহার করলে আর অন্য কোনো সার ব্যবহারের প্রয়োজন হয় না।

বান্দরবান কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আলতাফ হোসেন বলেছেন, বান্দরবানে অনেক কৃষক এখন রাসায়নিক সার ত্যাগ করে জৈব প্রযুক্তির কেঁচো সার ব্যবহার করছেন। এর মধ্যে সুয়ালক, গোয়ালিখোলা, ডলুপাড়া ও ক্যামলংয়ের চাষিদের মধ্যে এটি জনপ্রিয় হয়েছে। ছড়িয়ে পড়ছে অন্য উপজেলায়ও।

  •  
  •  
  •  
  •  

Tags: