সারা দেশে জনপ্রিয় হচ্ছে পুষ্টিকর ড্রাগন ফল চাষ (ভিডিও)
নিজস্ব প্রতিবেদক:
বাংলাদেশে একটি অপ্রচলিত ফলের নাম ড্রাগন। কৃষক ও গ্রাহকদের মধ্যে দিন দিন এর জনপ্রিয়তা বাড়ছে। একদিকে এর পুষ্টিমান যেমন ভালো এবং তেমনি বাণিজ্যিক দিক দিয়েও লাভজনক।
ড্রাগন ফলের ইংরেজী নাম: Dragon fruit বৈজ্ঞানিক নাম: Hylocereus undatus. এর উৎপত্তিস্থল সেন্ট্রাল আমেরিকা। তবে ভিয়েতনামে এ ফল সর্বাধিক বাণিজ্যিকভাবে চাষ করা হয়। বর্তমানে এ ফলটি মেক্সিকো, সেন্ট্রাল ও দক্ষিণ আমেরিকা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, দক্ষিণ চীন, ইসরাইল, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়াসহ বাংলাদেশেও চাষ করা হচ্ছে।
এ দেশের মাটি ও আবহাওয়া ড্রাগন ফল চাষের জন্য যথেষ্ঠ উপযোগী। ২০০৭ সালে বাংলাদেশে প্রথম ড্রাগন ফলের প্রবর্তন করেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাউ জার্ম প্লাজম সেন্টারের পরিচালক প্রফেসর ড. এমএ রহিম। তিনি এ ফলের জাত নিয়ে আসেন থাইল্যান্ড, ফ্লোরিডা ও ভিয়েতনাম থেকে। সেসব গাছ এখন দিব্যি ফল দিচ্ছে। এরই মধ্যে এ ফলের বাণিজ্যিক চাষের সম্ভাবনা উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। এই সফলতার ওপর ভিত্তি করেই জার্ম প্লাজম সেন্টারের পক্ষ থেকে নাটোর, রাজবাড়ী, রাঙ্গামাটিসহ এখন দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ড্রাগন ফলের চাষ সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ড্রাগন ফল ক্যাকটাস গোত্রের একটি ফল। গাছ দেখে সবাই একে চির সবুজ ক্যাকটাস বলেই মনে করেন। এশিয়ার মানুষের কাছে এ ফল অনেক জনপ্রিয়, হালকা মিষ্টি-মিষ্টি। এ ফলকে ড্রাগন ফল ছাড়াও পিটাইয়া, টিহায়া ইত্যাদিও নামে ডাকা হয়। ড্র্রগন ফল গাছ শুধুমাত্র রাতে ফুল দেয়। ফুল সপরাগায়িত; তবে বিভিন্ন মাছি, মৌমাছি ও পোকা-মাকড় এর পরাগায়ন ত্বরান্বিত করে এবং কৃত্রিম পরাগায়নও করা যেতে পারে।
কৃষি বিজ্ঞানীদের মতে, সবধরনের ডায়েটের জন্য এ ফলটি উপযুক্ত। এ ফল শরীরের জন ফাইবার সরবারহ করে যা পেটের পীড়া এবং লিভার এর জন্য উত্তম। খাবারের পর ডেজার্ট হিসাবে পূর্ব ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে এ ফল খাওয়ার রেওয়াজ রয়েছে। এ ফলটি প্রচুর পরিমানে ভিটামিন সি, মিনারেল এবং উচ্চ ফাইবার যুক্ত। জুস তৈরিতেও ফলটি অত্যন্ত উপযোগী। খাদ্যমানের প্রাচুর্যের জন্য হয়তো এ ফল উৎপাদনকারী দেশগুলোতে প্রতিবেলার খাবারের সাথে এ ফল না থাকলে যেন তাদের খাওয়া অপূর্ণ থেকে যায়। ড্রাগন ফল দেখতে অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও মনোমুগ্ধকর। ডায়াবেটিক রোগীরা এ ফল খেয়ে সহজেই ডায়াবেটিক নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। ফ্রেশ ফ্রুটের চেয়ে শুষ্ক ফ্রুট অনেক ভালো। এ ফল সালাদের সাথেও ব্যবহার করা হয়ে থাকে।
বাণিজ্যিক ভিত্তিতে সফলভাবে চাষ করার জন্য বাউ ড্রাগন ফল -১ (সাদা), বাউ ড্রাগন ফল -২ (লাল) নির্বাচন করা যেতে পারে। এছাড়া হলুদ ড্রাগন ফল, কালচে লাল ড্রাগন ফল চাষ করা যেতে পারে। বীজ এবং শাখা উভয় থেকেই গাছটির চারা উৎপাদন করা যায়। বীজ থেকে চারা করলে সময় একটু বেশি লাগে। তাই শাখা থেকে চারা উৎপাদন করা হয় বেশি। এ ফলটির জন্য শুষ্ক ট্রপিক্যাল জলবায়ু প্রয়োজন। মধ্যম বৃষ্টিপাত এ ফলের জন্য ভালো। উপযুক্ত বৃষ্টিপাত ৬০০-১৩০০ মি.মি. ও তাপমাত্রা ৩৮-৪০˚সে। অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতে ফুল ঝরে পরে এবং ফলের পঁচন দেখা দেয়। প্রায় সব ধরনের মাটিতেই ড্রাগন ফল চাষ করা যায়। তবে পানি জমে না এমন উঁচু জমিতে এ ফলটি চাষ করা ভালো।
বর্তমানে ঢাকার কিছু অভিজাত হোটেলে প্রতি কেজি ড্রাগন ফল ৩০০ থেকে ৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। নাটোরসহ দেশের অন্যান্য স্থানে এর আবাদ হলে দাম কমবে বলে আশা করেন দেশের উদ্যান বিশেষজ্ঞরা। এছাড়াও ইউরোপ ও আমেরিকায় দিন দিন এ ফলের চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে। আশা করা যায়, দুই-এক শতাব্দীর মধ্যেই ইউরোপ-আমেরিকায় ড্রাগন ফল প্রধান ফল হিসেবে আবির্ভূত হবে। সেইসঙ্গে বাংলাদেশও ড্রাগন ফল উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে প্রসিদ্ধি লাভ করবে বলে মনে করেন বাউ জার্ম প্লাজম সেন্টারের পরিচালক প্রফেসর ড. এম.এ রহিম।

