রাজশাহীর ঐতিহ্য পুঠিয়া রাজবাড়ী, বাঘা মসজিদ ও বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর

বঙ্গবন্ধু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধিঃ

পাঁচ বছর মামাবাড়ি রাজশাহী যাওয়া হয় না । তাই ভাবলাম এই শীতকালীন ছুটিতে একটু মামাবাড়ি বেড়াই আসি । যেই কথা সেই কাজ । সকাল ৮ টায় ভাইপোকে সাথে নিয়ে স্টেশনে হাজির হয়ে গেলাম । ৮ টা ২০ এ ট্রেন । টিকিট কেটে ট্রেনে উঠে বসলাম । ট্রেন ছাড়ল, দুপুর ১ টা ৩০ মিনিটে পৌছে গেলাম রাজশাহী । মামা এসে আমাদের নিয়ে গেলেন বাসায় । পুঠিয়া যেহেতু আমার মামাবাড়ি, পরদিন পুঠিয়া থেকে বেড়ানো শুরু ।

পুঠিয়ার জমিদার/রাজাগণ প্রশাসনিক কাজকর্ম পরিচালনার জন্য এবং ধর্মীয় কার্যাদি সম্পন্নের জন্য বিভিন্ন স্থাপত্য কাঠামো ও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মন্দির নির্মাণ করেন, যা আজও কালের সাক্ষী হিসাবে টিকে আছে । পুঠিয়ায় অবস্থিত অধিকাংশ মন্দিরে পোড়ামাটির ফলক স্থাপিত আছে । এখানকার পুরাকীর্তির মধ্যে পাঁচআনি রাজবাড়ী বা পুঠিয়া রাজবাড়ী, চারআনি রাজবাড়ী ও ১৩টি মন্দির রয়েছে । পুঠিয়ার প্রত্ননিদর্শনের মধ্যে ১৪টি স্থাপনা প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসাবে ঘোষনা করেছে ।

পুঠিয়া রাজবাড়ীঃ ১৮৯৫ সালে মহারানী হেমন্তকুমারী দেবী আকর্ষনীয় ইন্দো ইউরোপীয় স্থাপত্যরীতিতে আয়তাকার দ্বিতল বর্তমান রাজবাড়ীটি নির্মাণ করেন । ভবনের সম্মুখ ভাগের স্তম্ভ, অলংকরন, কাঠের কাজ, কক্ষের দেয়ালে ও দরজার উপর ফুল ও লতাপাতার চিত্রকর্ম চমৎকার নির্মাণ শৈলীর পরিচয় বহন করে । রাজবাড়ীর ছাদ সমতল, ছাদে লোহার বীম, কাঠের বর্গা এবং টালি ব্যবহৃত হয়েছে। নিরাপত্তার জন্য রাজবাড়ির চারপাশে পরিখা খনন করা হয়েছিল ।

পুঠিয়া রাজবংশের ইতিহাসঃ পুঠিয়া রাজবংশ মুঘল সম্রাট আকবর এর সময় (১৫৫৬-১৬০৫) প্রতিষ্ঠিত হয়। সে সময় পুঠিয়া লস্করপুর পরগনার অর্ন্তগত ছিল । ১৫৭৬ সালে মুঘল সম্রাট আকবর এর সুবেদার মানসিংহ বাংলা দখল করার সময় পুঠিয়া এলাকার আফগান জায়গীরদার লস্কর খানের সাথে যুদ্ধ হয় । এ যুদ্ধে পুঠিয়া রাজবংশের প্রথম পুরুষ বৎসাচার্য যিনি পুঠিয়ায় একটি আশ্রম পরিচালনা করতেন, তিনি মানসিংহকে বুদ্ধি পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করায় লস্কর খান পরাজিত হন । এ জন্য মানসিংহ বৎসাচার্যকে পুঠিয়া এলাকার জমিদারী দান করেন ।

বৎসাচার্য জমিদারী নিজ নামে না নিয়ে তার পুত্র পীতম্বর এর নামে বন্দোবস্ত নেন । পীতম্বর জমিদারীর আয়তন বৃদ্ধি করেন ।পীতম্বর নিঃসন্তান অবস্থায় মৃত্যু বরণকরলে তার সহোদর নীলাম্বর জমিদারী প্রাপ্ত হন । সম্রাট জাহাঙ্গীর তাকে রাজা উপাধি দান করেন । নীলাম্বর এর মুত্যুর পর পুত্র আনন্দরাম সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হন ।

আনন্দরাম এর একমাত্র পুত্র রতিকান্তের জ্যেষ্ঠ পুত্র রামচন্দ্র সকল সম্পত্তির মালিক হন । রামচন্দ্রের দ্বিতীয় পুত্র নরনারায়নের পর তার একমাত্র পুত্র প্রেমনারায়ন রাজ্যাধিকার পান । প্রেমনারায়ন এর পুত্র অনুপনারায়ণ এর সময় পুঠিয়া জমিদারীটি বার্ষিক ১,২৫,৫১৬ টাকা খাজনায় মুর্শিদকুলী খানের সাথে বন্দোবস্ত হয় । অনুপনারায়ণের চারপুত্র (নরেন্দ্র, মেদ নারায়ন, রুপ নারায়ণ ও প্রাণ নারায়ণ) এর মধ্যে ১৭৪৪ সালে রাজ স্টেট বিভক্ত হয় । বড় ভাই নরেন্দ্র নারায়ণের অংশে পাঁচ আনা এবং ছোট তিন ভাই এর অংশে সাড়ে তিন আনা নির্ধারিত হয় । বড় ভাই নরেন্দ্র নারায়ণের অংশ পাঁচ আনি এস্টেট এবং রুপ নারায়ণের অংশ চার আনি এস্টেট নামে পরিচিত ।

নরেন্দ্র নারয়নের জ্যেষ্ঠ পুত্র ভুবেন্দ্রনাথ ১৮০৯ সালে রাজা বাহাদুর উপাধি লাভ করেন । ভুবেন্দ্রনারায়ণের একমাত্র পুত্র জগন্নারায়ণ রায়ের দ্বিতীয় স্ত্রী ভুবনময়ী হরেন্দ্রনারায়ণকে দত্তক নেন । রাজা হরেন্দ্রনারায়নের পুত্র যোগেন্দ্রনারায়ণ মৃত্যুর পূর্বে সকল সম্পত্তি স্ত্রী শরৎসুন্দরীর নামে দিয়ে যান । শরৎসুন্দরী ১৮৬৬ সালে রাজশাহীর গুনাইপাড়ার কেশবকান্ত চক্রবতীর পুত্র রজনীকান্তকে দত্তক নিয়ে নাম দেন যতীন্দ্রনারায়ণ । শরৎসুন্দরী শিক্ষা ও চিকিৎসা খাতে প্রচুর দান করতেন । তার অজস্র দান ও নিঃস্বার্থ জনসেবায় মুগ্ধ হয়ে ১৮৭৪ সালে বৃটিশ সরকার তাকে “রানী” উপাধিতে এবং পরবর্তিতে ১৮৭৭ সালে “মহারানী” উপাধিতে ভূষিত করেন । কুমার যতীন্দ্রনারায়ণ ১৮৮০ সালে ঢাকা জেলার ভূবনমোহন রায়ের কন্যা হোমন্তকুমারী দেবীকে বিয়ে করেন । হোমন্তকুমারী দেবী ১৫ বছর বয়সে ৬ মাসের সন্তান গর্ভে নিয়ে বিধবা হন । তিনি পুঠিয়ার বিরাট রাজ প্রাসাদটি নির্মাণকরে শাশুড়ী মহারানী শরৎসুন্দরী দেবীর শ্রদ্ধায় উৎসর্গ করেন । হেমন্তকুমারী দেবী বহুসংখ্যক সৎকাজের জন্য লর্ড কার্জন কর্তৃক ১৯০১ সালে “রানী” এবং ১৯২০ সালে লর্ড আরউইনের আমলে “মহারানী” উপাধিতে ভূষিত হন । তার মৃত্যুর পর ধীরে ধীরে সারাদেশে জমিদারি প্রথার বিরুদ্ধে গণজাগরণ ঘটলে ক্রমান্বয়ে পুঠিয়া রাজবংশেরও বিলোপ ঘটে ।

গোবিন্দ মন্দিরঃ পুঠিয়া পাঁচআনি জমিদার বাড়ি অঙ্গনে অবস্থিত গোবিন্দ মন্দির একটি গুরুত্বপূর্ণ পুরাকীর্তি। একটি উচু বেদীর উপর প্রতিষ্ঠিত বর্গাকার নির্মিত মন্দিরের কেন্দ্রস্থলে আছে একটি কক্ষ ও চার কর্ণারে রয়েছে ৪টি বর্গাকৃতির ছোট কক্ষ । গর্ভগৃহের চারপাশে ৪টি খিলান প্রবেশ পথ আছে । মন্দিরের কার্ণিশ সামান্য বাকানো । মন্দিরের পিলার ও দেয়াল অসংখ্য দেব-দেবী, যুদ্ধের সাজসজ্জা, ফুল ইত্যাদির পোড়ামাটির ফলক দ্বারা সজ্জিত । প্রেম নারায়ণ রায় আঠার খ্রিস্টাব্দের প্রথম দিকে এই মন্দির নির্মাণ করেন বলে জানা যায় ।

বড় আহ্নিক মন্দিরঃ উত্তর-দক্ষিণে লম্বা আয়তাকার পূর্বমুখি এ মন্দিরে পাশাপাশি ৩টি কক্ষ আছে । মাঝের কক্ষের পূর্বদিকে তিনটি খিলান প্রবেশ পথ এবং উপরে দোচালা আকৃতির ছাদ আছে । আয়তাকার কক্ষের দক্ষিণ ও উত্তর পাশের কক্ষ দুটি বর্গাকৃতির এবং পূর্বদিকে ১টি করে সরু খিলান প্রবেশ পথ আছে এবং ছাদ চৌচালা আকৃতির । মন্দিরটির সম্মুখের দেয়ালে অসংখ্য পোড়ামাটির ফলক রয়েছে । পুঠিয়া চারআনি জমিদার কর্তৃক মন্দিরটি সতের-আঠার শতকের মধ্যবর্তী সময়ে নির্মিত বলে জানা যায় ।
ছোট আহ্নিক মন্দিরঃ পুঠিয়া রাজবাড়ীর দক্ষিণ পাশে এ মন্দির অবস্থিত । আয়তাকার নির্মিত উত্তর দক্ষিণে লম্বা এ মন্দিরেরপূর্বদিকে পাশাপাশি ৩টি এবং দক্ষিণ দেয়ালে ১টি খিলান দরজা আছে । মন্দিরের ছাদ দোচালা আকৃতির এবং আংশিক বাকানো । মন্দিরটি আঠার খ্রিস্টাব্দে প্রেম নারায়ণ কর্তৃক নির্মিত বলে জানা যায় ।

বড় শিব মন্দিরঃ পুঠিয়া বাজারে প্রবেশ করতেই হাতের বাম পাশে শিবসাগর নামক দীঘির দক্ষিণ পাড়ে বড় শিব মন্দির অবস্থিত । ১৮২৩ সালে নারী ভূবনময়ী দেবী মন্দিরটি নির্মাণ করেন । উচু মঞ্চের উপর নির্মিত মন্দিরটির দক্ষিণ দিকে সুপ্রশস্ত সিড়িসহ প্রধান প্রবেশপথ । মন্দিরের চারপাশে টানা বারান্দা এবং বারান্দায় রয়েছে ৫টি করে খিলান প্রবেশপথ । মন্দিরের উত্তর পাশে অবস্থিত দীঘিতে নামার জন্য বাঁধানো ঘাট রয়েছে । চারকোণে ৪টি ও কেন্দ্রস্থলে ১টি চুড়া আছে ।

ছোট শিব মন্দিরঃ বর্গাকারে নির্মিত ছোট আকৃতির এ মন্দিরটি রাজবাড়ী হতে ১০০ মিটার দক্ষিণে পুঠিয়া-আড়ানী সড়কের পূর্বপাশে অবস্থিত । মন্দিরের দক্ষিণ দেয়ালে ১টি মাত্র খিলান প্রবেশপথ আছে । মন্দিরের কার্ণিশগুলো আংশিক বাকানো এবং পোড়ামাটির অলংকরণদ্বারা সজ্জিত ।

দোল মন্দিরঃ পুঠিয়া বাজারের মধ্যে অবস্থিত বর্গাকারে নির্মিত ৪ তলা বিশিষ্ট একটি সুদৃশ্য ইমারত । মন্দিরের চতূর্থ তলার উপরে আছে গম্ভুজাকৃতির ছাদ । পুঠিয়ার পাঁচআনি জমিদার ভুবেন্দ্রনারায়ণ রায় ১৭৭৮ খ্রিস্টাব্দে মন্দিরটি নির্মাণ করেন ।

জগন্নাথ/ রথ মন্দিরঃ বড় শিব মন্দির সংলগ্ন পূর্বদিকে শিবসাগর নামক দীঘির দক্ষিণ পাশে জগন্নাথ বা রথ মন্দির অবস্থিত । দোতলার কক্ষটি ছোট এবং চারপাশে উন্মুক্ত প্রবেশদ্বার রয়েছে । মন্দিরটি ১৮২৩ খ্রিস্টাব্দে রানী ভূবনময়ী কর্তৃক নির্মিত বলে জানা যায় ।
চারআনি জমিদারবাড়ীঃ পাঁচআনি রাজবাড়ী থেকে প্রায় ১২৫ মিটার পশ্চিমে শ্যামসাগর দিঘীর পশ্চিম পাড়ে পুঠিয়ার চারআনী জমিদার বাড়ী অবস্থিত ।

ছোট গোবিন্দ মন্দিরঃ বড় আহ্নিক মন্দিরের উত্তর পাশে বর্গাকারে নির্মিত মন্দিরটি ছোট গোবিন্দ মন্দির নামে পরিচিত । এক কক্ষ বিশিষ্ট মন্দিরের পূর্ব ও দক্ষিণ দিকে সরু বারান্দা,দক্ষিণ দিকে ৩টি এবং পূর্ব দিকে ১টি খিলান প্রবেশ পথ আছে । মন্দিরের চারপাশের কর্ণারে ও দরজার দুপাশ পোড়ামাটির ফলক দ্বারা নান্দনিকভাবে সজ্জিত । এটির কার্নিশ ধনুকের ন্যায় বাকানো ও উপরে একটি ফিনিয়েল বিশিষ্ট চুড়া আকৃতির ছাদ আছে । দেয়ালের ফলকগুলোতেও যুদ্ধের কাহিনী, বিভিন্ন হিন্দু দেব দেবীর চিত্র, সংস্কৃত ভাষায় রচিত পোড়ামাটির ফলক ইত্যাদি দ্বারা সজ্জিত । এ মন্দিরটি খ্রিস্টীয় ১৭/১৮ শতকে নির্মিত বলে জানা যায় ।

অন্যান্য দর্শনীয় স্থানঃ হাওয়া খানাঃ এটি পুঠিয়া বাজার থেকে ৩ কিলোমিটার পশ্চিমে একটি পুকুরের মধ্যবর্তী স্থানে হাওয়াখানা অবস্থিত । দ্বিতল এ ইমারতের নীচতলার আর্চযুক্ত । এ ইমারতের দক্ষিণ পাশে দোতালায় উঠার জন্য সিড়ি আছে । পুঠিয়া রাজবাড়ীর সদস্যরা রাজবাড়ী থেকে রথ বা হাতীযোগে, পুকুরে নৌকায় চড়ে এসে অবকাশ যাপন এবং পুকুরের খোলা হাওয়া উপভোগ করতেন বলে জানা যায় ।
কৃষ্ণপুর মন্দিরঃ পুঠিয়া বাজার থেকে দেড় কিলোমিটার পশ্চিমে কৃষ্ণপুর গ্রামে খোলা মাঠে অবস্থিত মন্দিরটি। প্রবেশপথের উপরে ও দুপাশে পোড়ামাটির ফলকদ্বারা চমৎকারভাবে সজ্জিত ।

শিব মন্দিরঃ পুঠিয়া বাজারের ১ কিলোমিটার পশ্চিমে কৃষ্ণপুর গ্রামে ছোট আকৃতির এ মন্দিরটি অবস্থিত । স্থানীয়ভাবে খিতিশ চন্দ্রের মঠ হিসাবে পরিচিত হলেও প্রকৃতপক্ষে এটি একটি শিব মন্দির । বর্গাকারে নির্মিত মন্দিরের দক্ষিণ ও পূর্ব দেয়ালে ১টি করে খিলান দরজা আছে ।

কেষ্ট খেপার মঠঃ বড় শিব মন্দির থেকে আনুমানিক ৫০০ মিটার পশ্চিমে রাম জীবনপুর গ্রামে অবস্থিত এ মন্দিরটি । স্থানীয়ভাবে কেষ্ট খেপার মঠ নামে পরিচিত । বর্গাকারে নির্মিত এর দক্ষিণ দেয়ালে ১টি মাত্র প্রবেশপথ আছে এবং উপরে ২৫টি মৌচাকৃতির ছাদ দ্বারা আবৃত । মন্দিরটি ১৮শ শতকের শেষ দিকে নির্মিত বলে ধারনা করা যায় ।

পুঠিয়া যাওয়ার মাধ্যমঃ রাজশাহী জেলা সদর হতে ৩২ কিঃমিঃ উত্তর- পূর্বে নাটোর মহাসড়ক অভিমুখে পুঠিয়া অবস্থিত । বাসে করে দেশের যে কোন স্থান হতে পুঠিয়া আসা যায় এবং ট্রেনে করে নাটোর অথবা রাজশাহী নেমেও সড়কপথে সহজে আসা যায় । পুঠিয়া বাসস্ট্যান্ড থেকে মাত্র ১ কিঃমিঃ দূরে অবস্থিত পুঠিয়া রাজবাড়ী । অটো তে মাত্র ১০ টাকা ভাড়া লাগে ।

বাঘা মসজিদ রাজশাহী জেলা সদর হতে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে বাঘা উপজেলায় অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক মসজিদ । সুলতান নাসিরউদ্দীন নসরাত শাহ ১৫২৩ খ্রিস্টাব্দে মসজিদটি প্রতিষ্ঠা করেন ।

ইতিহাসঃ মসজিদটি ১৫২৩-১৫২৪ সালে হুসেন শাহী বংশের প্রতিষ্ঠাতা আলাউদ্দিন শাহের পুত্র সুলতান নসরাত শাহ নির্মাণ করেন । পরবর্তীতে বিভিন্ন সময় এই মসজিদের সংস্কার করা হয় এবং মসজিদের গম্বুজগুলো ভেঙ্গে গেলে ধ্বংসপ্রাপ্ত মসজিদে নতুন করে ছাদ দেয়া হয় ১৮৯৭ সালে ।

স্থাপত্য বৈশিষ্ট্যঃ মসজিদটি ২৫৬ বিঘা জমির ওপর অবস্থিত । সমভুমি থেকে থেকে ৮-১০ ফুট উঁচু করে মসজিদের আঙিনা তৈরি করা হয়েছে । উত্তর পাশের ফটকের ওপরের স্তম্ভ ও কারুকাজ ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে । মসজিদটিতে ১০টি গম্বুজ রয়েছে । আর ভেতরে রয়েছে ৬টি স্তম্ভ । মসজিদটিতে ৪টি মেহরাব রয়েছে যা অত্যন্ত কারুকার্য খচিত । দৈর্ঘ্য ৭৫ ফুট প্রস্থ ৪২ ফুট, উচ্চতা ২৪ ফুট ৬ ইঞ্চি । দেয়াল চওড়া ৮ ফুট গম্বুজের ব্যাস ৪২ ফুট, উচ্চতা ১২ ফুট । চৌচালা গম্বুজের ব্যাস ২০ ফুট উচ্চতা প্রায় ৩০ ফুট। মাঝখানের দরজার ওপর ফার্সি ভাষায় লেখা একটি শিলালিপি রয়েছে ।

মসজিদটির গাঁথুনি চুন-সুরকি দিয়ে । ভেতরে এবং বাইরের দেয়ালে মেহরাব ও স্তম্ভ রয়েছে । বাঘা মসজিদের দৈর্ঘ্য ২২.৯২ মিটার, প্রস্থ ১২.১৮ মিটার এবং উচ্চতা ২৪ ফুট ৬ ইঞ্চি। এর দেয়াল ২.২২ মিটার পুরু । মসজিদটিতে সর্বমোট ১০টি গম্বুজ, ৪টি মিনার (যার শীর্ষদেশ গম্বুজাকৃতির) এবং ৫টি প্রবেশদ্বার রয়েছে । এই মসজিদটি চারদিক হতে প্রাচীর দিয়ে ঘেরা এবং প্রাচীরের দু’দিকে দু’টি প্রবেশদ্বার রয়েছে । মসজিদের ভিতরে-বাইরে সবর্ত্রই টেরাকোটার নকশা বর্তমান । মসজিদের পাশে অবস্থিত বিশাল দিঘীও একটি দর্শনীয় স্থান । এছাড়া বাঘা মসজিদের পাশেই রয়েছে একটি মাজার শরীফ ।

বিবরণঃ বাঘা মসজিদটির গাঁথুনি চুন এবং সুরকি দিয়ে । মসজিদের ভেতরে এবং বাইরের দেয়ালে সুন্দর মেহরাব ও স্তম্ভ রয়েছে । এছাড়া আছে পোড়ামাটির অসংখ্য কারুকাজ যার ভেতরে রয়েছে আমগাছ, শাপলা ফুল, লতাপাতাসহ ফার্সি খোদাই শিল্পে ব্যবহৃত হাজার রকম কারুকাজ । এছাড়া মসজিদ প্রাঙ্গণের উত্তর পাশেই রয়েছে হজরত শাহদৌলা ও তার পাঁচ সঙ্গীর মাজার । বাংলার স্বাধীন সুলতান আলাউদ্দিন হুসাইন শাহর পুত্র নাসিরউদ্দীন নসরত শাহ জনকল্যাণার্থে মসজিদের সামনেই একটি দিঘী খনন করেন ।
শাহী মসজিদ সংলগ্ন এ দিঘিটি ৫২ বিঘা জমির ওপর রয়েছে । এই দিঘির চারপাশে রয়েছে সারিবদ্ধ নারিকেল গাছ । প্রতিবছর শীতের সময় এ দিঘিতে অসংখ্য অতিথি পাখির কলতানে এলাকা মুখরিত হয়ে ওঠে । বর্তমানে দিঘিটির চারটি বাঁধানো পাড় নির্মাণ করা হয়েছে । এ ছাড়া এ মসজিদ সংলগ্ন জহর খাকী পীরের মাজার রয়েছে । মূল মাজারের উত্তর পাশে রয়েছে তার কবর । এ ছাড়া মসজিদ সংলগ্ন মাটির নিচ থেকে মহল পুকুর আবিষ্কৃত হয় ।
১৯৯৭ সালে মাজারের পশ্চিম পাশে খনন কাজের ফলে ৩০ ফুট বাই ২০ ফুট আয়তনের একটি বাঁধানো মহল পুকুরের সন্ধান মেলেছে । এই পুকুরটি একটি সুড়ঙ্গপথ দিয়ে অন্দরমহলের সঙ্গে যুক্ত ছিল । তিন দিক থেকে বাঁধানো সিঁড়ির ভেতরে নেমে গেছে ।
মসজিদের ভেতরে ও বাইরে রয়েছে প্রচুর পোড়ামাটির ফলক । মসজিদের ভেতরে উত্তর-পশ্চিম কোণে একটু উঁচুতে নির্মিত একটি বিশেষ নামাজের কক্ষ আছে । এ মসজিদ সংলগ্ন এলাকায় প্রতিবছর ঈদুল ফিতরের দিন থেকে ৩ দিন পর্যন্ত ‘বাঘার মেলা’র আয়োজন করা হয় । শোনা যায়, মেলাটি ৫০০ বছরের ঐতিহ্য । পরিবার পরিজন আত্মীয় স্বজন নিয়ে ঘুরে আসতে পারেন বাঘা মসজিদ । রাজশাহীর প্রত্নতাত্তিক নিদর্শন গুলোর অন্যতম এটি । উল্লেখ্য, আগের ৫০ টাকার নোটে বাঘা মসজিদ ছবি আছে ।

বাঘা মসজিদ যাওয়ার মাধ্যমঃ পুঠিয়া বাসস্ট্যান্ড থেকে প্রায় ২০ কিঃমিঃ দূরে অবস্থিত বাঘা মসজিদ । বাঘা মসজিদ যেতে হলে প্রথমে পুঠিয়া থেকে বাসে বা অটো করে আড়ানি যেতে হবে । ভাড়া ১৫ থেকে ২০ টাকা । এরপর অটো করে সোজা বাঘা মসজিদ । ভাড়া ঐ একই ১৫ থেকে ২০ টাকা । পর্যটক দের থাকার জন্য আছে জেলা পরিষদ ডাকবাংলো ।

বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর রাজশাহী শহরে স্থাপিত তথা বাংলাদেশের প্রথম জাদুঘর । এটি প্রত্ন সংগ্রহে সমৃদ্ধ । এই প্রত্ন সংগ্রহশালাটি ১৯১০ খ্রিস্টাব্দে ব্যক্তিগত উদ্যোগে স্থাপিত হয়েছিল । বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর টি বর্তমানে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করে ।
ইতিহাসঃ বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর রাজশাহী শহরের কেন্দ্রস্থল সাহেব বাজার হেতেম খাঁ-তে অবস্থিত । প্রত্নতত্ত্ব সংগ্রহের দিক থেকে এটি দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সংগ্রহশালা । বরেন্দ্র জাদুঘর প্রতিষ্ঠায় নাটোরের দিঘাপাতিয়া রাজপরিবারের জমিদার শরৎ কুমার রায়, আইনজীবী অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় এবং রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুল এর শিক্ষক রামপ্রসাদ চন্দ্রের উল্লেখযোগ্য আবদান রয়েছে ।
১৯১০ খ্রিস্টাব্দে তারা বাংলার ঐতিহ্য ও নিদর্শন সংগ্রহ ও সংরক্ষণের জন্য বরেন্দ্র অনুসন্ধান সমিতি গঠন করেন । ঐ বছরে তারা রাজশাহীর বিভিন্ন স্থানে অনুসন্ধান চালিয়ে ৩২টি দুষ্প্রাপ্য নিদর্শন সংগ্রহ করেন । এই নিদর্শনগুলো সংরক্ষণ করার জন্য শরৎ কুমার রায়ের দান করা জমিতে জাদুঘরটির নিজস্ব ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হয় । নির্মাণ শেষ হয় ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দে । একই বছরের ১৩ নভেম্বর বাংলার তৎকালীন গভর্নর কারমাইকেল জাদুঘরটি উদ্বোধন করেন ।
১৯১১ খ্রিস্টাব্দে কলকাতা জাদুঘর হঠাৎ এতে সংরক্ষিত সকল নিদর্শন দাবি করে বসে । তৎকালীন গভর্নর কারমাইকেলের প্রচেষ্টায় ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দে ১৪ ফেব্রুয়ারী তারিখে জারীকৃত একটি সরকারি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে বরেন্দ্র জাদুঘরকে এর নিদর্শন সংগ্রহ ও সংরক্ষণের ব্যপারে স্বাধীকার প্রদান করা হয় ।
১৯২৩ খ্রিস্টাব্দে জাদুঘর কর্তৃপক্ষের সাথে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় যৌথভাবে নওগাঁর পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহারের খনন কাজ শুরু করে । পরবর্তিতে বরেন্দ্র অনুসন্ধান সমিতির একক প্রচেষ্টায় পাহাড়পুর থেকে ২৫৬টি নিদর্শন আবিষ্কৃত হয় । ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের পরে জাদুঘরটির অস্তিত্ত্ব নিয়ে সংকট দেখা দেয় । ১৯৪৯ থেকে ১৯৬১ খ্রিস্টাব্দ পযর্ন্ত জাদুঘর ভবনটির অর্ধেকাংশ মেডিকেল স্কুল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল । ১৯৬৪ খ্রিস্টাব্দে জাদুঘরটি বন্ধ হবার উপক্রম হলে ঐ বছরের ১০ অক্টোবর তারিখে এর স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় অধিগ্রহণ করে । জাদুঘরটির পরিদর্শকদের মধ্যে রয়েছেন মহাত্মা গান্ধী, নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু প্রমুখ সহ আনেক বিখ্যাত ব্যক্তিবর্গ ।
নিদর্শনসমূহঃ বরেন্দ্র জাদুঘরের সংগ্রহ সংখ্যা ৯ হাজারেরও অধিক । এখানে হাজার বছর আগের সিন্ধু সভ্যতার নিদর্শন রয়েছে । মহেনজোদারো সভ্যতা থেকে সংগৃহীত প্রত্নতত্ত, পাথরের মূর্তি, খিষ্ট্রীয় একাদশ শতকে নির্মিত বুদ্ধ মূর্তি, ভৈরবের মাথা, গঙ্গা মূর্তি সহ অসংখ্য মূর্তি এই জাদুঘরের অমূল্য সংগ্রহের অন্তর্ভুত। মোঘল আমলের রৌপ্র মুদ্রা, গুপ্ত সম্রাট চন্দ্রগুপ্তের গোলাকার স্বর্ণমুদ্রা, সম্রাট শাহজাহানের গোলাকার রৌপ্য মুদ্রা বিশেষ ভাবে উল্যেখয়োগ্য । এখানে প্রায় ৫০০০ পুঁথি রয়েছে যার মধ্যে ৩৬৪৬টি সংস্কৃত আর বাকিগুলো বাংলায় রচিত । পাল যুগ থেকে মুসলিম যুগ পযর্ন্ত সময় পরিধিতে অঙ্কিত চিত্রকর্ম, নূরজাহানের পিতা ইমাদ উদ দৌলার অঙ্কিত চিত্র এখানে রয়েছে ।

বরেন্দ্র জাদুঘর পরিদশনের এর সময়সূচীঃ শনিবার থেকে বুধবার সকাল ১০ থেকে বিকাল ৪.৩০ টা পর্যন্ত । শুক্রবার দুপুর ২.৩০ থেকে বিকাল ৫ টা পর্যন্ত । বৃহস্পতিবার বন্ধ । এছাড়াও এপ্রিল থেকে অক্টোবর সকাল ১০ থেকে বিকাল ৫ টা পর্যন্ত । নভেম্বর থেকে মার্চ সকাল ১০ থেকে বিকাল ৪.৩০ টা পর্যন্ত ।
বরেন্দ্র জাদুঘর যাওয়ার মাধ্যমঃ বরেন্দ্র জাদুঘর টি অবস্থিত রাজশাহী শহরে সাহেব বাজার এলাকায় । রাজশাহী শহর বা রাজশাহী রেল স্টেশন থেকে বরেন্দ্র জাদুঘরে যাওয়া যায় । ভাড়া ১০ থেকে ১৫ টাকা লাগবে ।

  •  
  •  
  •  
  •  

Tags: