করোনা যুদ্ধে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক

aaa

রোহান ইসলাম, নিজস্ব প্রতিবেদকঃ

দেশে প্রথম করোনা শনাক্ত হয় ২০২০ সালের ৮ মার্চ। সেদিন আইইডিসিআরের পক্ষ থেকে জানানো হয় বাংলাদেশে ৩ জন করোনা রোগী শনাক্তের কথা। এরপর থেকে ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে করোনার প্রকোপ। করোনা মোকাবেলায় সামনের সারিতে কাজ করছেন ডাক্তার নার্সরা, পিছিয়ে নেই বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়।

সরকার অনুমোদিত করোনা শনাক্তকরণের সরকারি ও বেসরকারি ল্যাবের উপযুক্ততা যাচাই, যন্ত্রপাতির সচলতা ও সার্বিক তত্ত্বাবধানে আইইডিসিআরের পক্ষ থেকে তৈরি করা ১৮ জনের এক্সপার্ট পুলের হয়ে কাজ করছেন বাকৃবির চারজন গবেষক।

তারা হলেন অধ্যাপক ড. রোখসানা পারভীন (মিথুন), প্যাথলজি বিভাগ, ড. মোহাম্মদ নুরুজ্জামান, প্যাথলজি বিভাগ, ড. মোঃ মুনির হোসেন, পশু প্রজনন ও কৌলি বিজ্ঞান বিভাগ, ড. কে. এইচ. এম নাজমুল হুসাইন নাজির, মাইক্রোবায়োলজি এন্ড হাইজিন বিভাগ।

করোনা শনাক্তকরণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ কি? জানতে চাইলে ভেটেরিনারি অনুষদের প্যাথলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ নুরুজ্জামান জানান, করোনা শনাক্তকরণে আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে জিনিসটি মনে হয়েছে সেটি হলো করোনা শনাক্তকরণের প্রতিটি ধাপ সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা থাকা। করোনা শনাক্তকরণের জন্য কতগুলো রুম প্রয়োজন হয় যেমন এক্সট্রাকশন রুম, মাস্টারমিক্স রুম, পিসিআর রুম। এগুলো একটি আরেকটি থেকে আলাদা থাকাটা খুবই জরুরি এবং এ রুমগুলোতে পর্যাপ্ত ভেন্টিলেশনও খুবই জরুরি।

করোনা সংক্রমণ কিছুদিন কম হলেও বর্তমানে তা আশংকাজনকভাবে বাড়ছে। এর কারণ জানতে চাইলে ড. রোখসানা পারভীন বলেন, এটা বিভিন্ন কারণে হতে পারে। বিশেষ করে ভাইরাসের বৈশিষ্ট্যগত যে পরিবর্তন অর্থাৎ মিউটেশনের কারণে হতে পারে যা আসলে জিনোম সিকুয়েন্স করে জানা যায়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে গত তিন মাসের ডাটাবেজ পর্যবেক্ষণ করে জানা যায় যে ভ্যারিয়েন্টগুলো ব্রাজিল, যুক্তরাজ্য, দক্ষিণ আফ্রিকায় দেখা গেছে সেগুলোই কিন্তু এখন আমাদের দেশে দেখা যাচ্ছে।

কাজ করতে গিয়ে কি ধরণের সমস্যা দেখা গেছে? জানতে চাইলে ড. কে. এইচ. এম. নাজমুল হুসাইন নাজির বলেন, সবগুলো ল্যাবেরই কমন সমস্যা হচ্ছে পর্যাপ্ত জৈব নিরাপত্তার অভাব, দক্ষ জনবলের অভাব, এছাড়া করোনা শনাক্তকরণের জন্য পর্যাপ্ত মেশিনের অভাব।

করোনা মহামারি পরবর্তী করোনা টেস্ট ল্যাবগুলো কিভাবে ব্যবহার করা যেতে পারে? এ বিষয়ে জানতে চাইলে অধ্যাপক ড. মোঃ মনির হোসেন বলেন, করোনা মহামারির পরবর্তীকালে ল্যাবগুলোতে যেন অন্যান্য সংক্রামক ব্যাধি শনাক্তকরণে ব্যবহার করা যায় এজন্য এখনি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন।

সরকারের একার পক্ষে করোনা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়, করোনা মোকাবেলায় প্রয়োজন সম্মিলিত প্রয়াস এমনটাই মনে করেন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ নুরুজ্জামান। তিনি বলেন, আমরা জনগণ যদি না বুঝি যে আমাদের অসচেতনতার কারণে আমার পরিবার ও অন্যান্যের মধ্যে করোনা ছড়িয়ে পড়তে পারে তাহলে সরকার কিন্তু একা এই করোনা মোকাবেলা করতে পারবে না।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন গবেষক হিসেবে করোনা গবেষণায় আর কি কি করার আছে এমন প্রশ্নের জবাবে ড. রোখসানা পারভীন বলেন, ডাটাবেজ থেকে সিকুয়েন্স নিয়ে আমরা ইন্টারনাল এনালাইসিস করতে পারি। এবং সে কাজটি কিন্তু আমরা ইতিমধ্যে করছি তবে বিষয়টি সময়সাপেক্ষ। এর মাধ্যমে আমরা জানতে পারবো আসলে ভাইরাসের মিউটেশন কিভাবে হচ্ছে, মিউটেশন রেট কত। একটা ভাইরাস কিভাবে মিউটেশন করছে এটা জানার জন্য জিনোম ক্যারেক্টরাইজেশন অতি গুরুত্বপূর্ণ। এবং এটা করা উচিত তাহলেই বাংলাদেশে যে ধরণের ভাইরাস সংক্রমণ করছে তার সম্পর্কে বিস্তারিত জানা সম্ভব।

আমরা যে পদ্ধতিতে করোনা শনাক্ত করছি সে পদ্ধতিতে কি করোনার নতুন মিউটেশন গুলো শনাক্ত করা সম্ভব? এ বিষয়ে ড. কে. এইচ. এম. নাজমুল হুসাইন নাজির বলেন, হ্যাঁ সেভাবেই আসলে প্রাইমার ডিজাইন করা হয়েছে যেনো কোন মিউটেশন হলেও তা শনাক্ত করা যায়। যে অংশ সাধারণত মিউটেশন হয় না সে অংশ থেকে ডিএনএর অংশ নিয়েই প্রাইমার ডিজাইন করা হয়েছে।

করোনা মোকাবেলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োজন বলে মনে করেন অধ্যাপক ড. মোঃ মুনির হোসেন। তিনি বলেন, যতদ্রুত সম্ভব পিসিআর বা র্যাপিড টেস্টের মাধ্যমে স্ক্রিনিং করা দরকার। ল্যাবগুলোকে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারের জন্য পরিকল্পনা প্রয়োজন।

করোনা মোকাবেলায় প্রথম থেকেই ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের সাথে পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে কাজ করছে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. লুৎফুল হাসান বলেন, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একটি পিসিআর মেশিন ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফেব্রিকেশন ল্যাব থেকে ফেসশিল্ড তৈরি করে করোনা মোকাবেলায় যারা প্রথম সারিতে কাজ করছেন যেমন ডাক্তার, নার্স, মেডিকেল কর্মী, পুলিশ তাদের মাঝে বিতরণ করেছি।

ভবিষ্যতে এ কাজের মাত্রা বৃদ্ধির প্রত্যয় ব্যক্ত করে তিনি বলেন, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর মুহম্মদ হোসেন কেন্দ্রীয় ল্যাবরেটরিতে একটি সিকুয়েন্সার মেশিন প্রতিস্থাপিত হয়েছে। আমরা আশা করছি ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের সাথে থেকে এখানে যেসকল স্যাম্পল আসে তাদের সিকুয়েন্সিং এর কাজটা এখানেও করতে পারি।

ভিডিও- https://www.youtube.com/watch?v=fZehBCnkAgM

 

  •  
  •  
  •  
  •  

Tags: