সাপ নিয়ে কুসংস্কারের রহস্য উদঘাটন

জয়তু কুমার মন্ডলঃ পরিক্রমায় চলে এসেছে বর্ষাকাল। এসময়ে দেশে সাধারনত চারদিকে পানিতে থৈ থৈ করে, সাপের উপদ্রব বেশ বেড়ে যায়। তবে বেশ মজার বিষয় হচ্ছে,বাংলাদেশে যেসব সাপ পাওয়া যায় তার প্রায় ৯৫% সাপ নির্বিষ কিংবা মৃদুবিষধর অর্থাৎ মানুষের জীবননাশের মতন ক্ষতিকারক নয়।

সাপ বাস্তুতন্ত্রের (Ecosytem) এর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ,তবে অজ্ঞতার কারনে ২১ শতকে এসেও সাপকে ভীষণশত্রু মনে করা হয়। এছাড়াও সাপ নিয়ে প্রচলিত রয়েছে বেশ শক্তপোক্ত অনেক কুসংস্কার। অথচ বাস্তুতন্ত্রের দেখভালের পাশাপাশি সাপের বিষ থেকে তৈরি হয় বিভিন্ন রকমের জীবনরক্ষাকারী ওষুধ, চামড়া দিয়ে তৈরি হয় পৃথিবীর সব নামী দামী ব্র্যান্ডের জুতা,ব্যাগ,বেল্ট। কার্যত সেকারনেই চামড়ার বাজারেও সাপের চামড়ার রয়েছে বিশাল এক নাম ডাক।

চলুন আজ জেনে নেই সাপ নিয়ে আমাদের মাঝে বহুল প্রচলিত কিছু কুসংস্কার

১. সাপ এবং ওঝানামা
এটি এদেশের সবচেয়ে প্রচলিত এবং ভয়ংকর কুসংস্কার। এখনো দেশের অধিকাংশ মানুষজন মনে করে ওঝা ঝাড়-ফুক, যাদু-মন্ত্র ইত্যাদি ইত্যাদি দিয়ে সাপের বিষ নামাতে সক্ষম। শুরুতেই বললাম দেশের বিষাক্ত সাপের সংখ্যা মাত্র শতকরা ৫ শতাংশ। সুতরাং বেশিরভাগ সময়েই যেটা হয়, যেসব সাপে কাটা রোগী ওঝার শরণাপন্ন হয় তার অধিকাংশই নির্বষ কিংবা মৃদু বিষধর সাপের অর্থাৎ জীবননাশের ঝুকিই নেই।

এখন অনেকের মনে প্রশ্ন ঘুরছে না আমি তো দেখেছি গোখরা সাপের কামড়ের রোগী পর্যন্ত ওঝা সুস্থ করে তুলেছে, ঠিক এই প্রশ্নের প্রেক্ষিতে আগে আসুন আরেকটা তথ্য জানুন সেটা হলো যে বিষাক্ত সাপ যে সব সময় কামড় দিলেই বিষ লাগবে ব্যাপারটা এমন ও না।
সাপের বিষ সাপের কাছে অনেক মূল্যবান এবং একমাত্র ও সর্বোচ্চ হাতিয়ার। প্রকৃতির নিয়ম অনুযায়ীই কোনো প্রজাতিই পারত পক্ষে তার সর্বোচ্চ হাতিয়ারের যত্রতত্র ব্যবহার করেনা। মূলত সাপ তার বিষ ব্যবহার করে তার শিকার করতে অর্থাৎ তার খাদ্যের ব্যবস্থা করতে। আমি আপনি নিশ্চিত একটা ৪ ইঞ্চি ব্যাসের আকারের গোখরা সাপের খাদ্য নই,সুতরাং সাপ আমাদের কে খাদ্য হিসেবে শিকার করতে কামড়ায় না।

ঠিক একারনেই অনেক সময় সাপ কামড়ায় কিন্তু বিষ ছাড়েনা,বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ড্রাই বাইট (Dry Bite) অর্থাৎ আপনি যে গোখরা সাপের কামড়ের রোগীকে ওঝা দ্বারা সুস্থ হতে দেখেছেন তা আসলে ড্রাই বাইট ছিল,এখানে ওঝার কোন কৃতিত্ব নাই। কার্যত ওঝার যাদু বিদ্যায় কোন জোর নেই যার দ্বারা সাপের বিষ নামে তাই সাপে কাটা রোগীকে নিয়ে ওঝার শরণাপন্ন না হয়ে নিকটস্থ হাসপাতালে যান।

২.সাপ গাভীর বাট থেকে দুধ খায়
দেশে প্রচলিত একটি প্রবাদ আছে দুধ কলা দিয়ে কাল সাপ পোষা তবে মজার ব্যাপার হলো যে সাপ দুধ এবং কলা কোনটাই খায় না। সাপ খাবার হিসেবে বিভিন্ন ধরনের পোকা মাকড় , ইঁদুর ব্যাঙ ইত্যাদি গ্রহণ করে। দুধ এবং কলা হজমের জন্য যথাযথ পরিপাক তন্ত্রও সাপের নেই এবং গাভীর বাট থেকে দুধ চুষে (Suck) খাবে এমন কোন অঙ্গও নেই সুতরাং সাপের দুধ কলা খাওয়ার কোন প্রশ্নই আসেনা।

৩.সাপুড়ে বীণ বাজিয়ে সাপকে ডেকে আনে
এমনটা শুধু সিনেমাতেই হয়, এককালে বাংলা সিনেমার একটা অন্যতম কনটেন্ট ছিল সাপুড়ের বীণ বাজিয়ে সাপ কে ডেকে আনার। তবে বাস্তবে সাপের শ্রবন শক্তি খুবই ক্ষীণ এবং আমাদের মতন এত উন্নত কান নেই, সাপ জিহ্বার মাধ্যমে তার শোনার কাজ কোন রকমে চালায়। বীণের শব্দে সাপের দূরদুরান্ত থেকে ছুটে আসার বিন্দুমাত্র কোন সম্ভাবনা নেই।

এছাড়া হাটে বাজারে সাপ খেলার সময় সাপুড়ে বীণ বাজায় এবং সাপ তার তালে তালে নাচে এখানেও আসলে তার নাচের কারণ বীণের শব্দ না, লক্ষ করে দেখবেন সাপুড়ে বীণ বাজানোর সাথে সাথে কৌশলে হাত নাড়ায় এবং বীণ বাজায়, সাপ মূলত হাতের নড়াচড়া দেখে বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে এবং নিজেও দুলতে থাকে।

৪.হাসনাহেনা ফুলের গন্ধে সাপ চলে আসে
একথার বৈজ্ঞানিক কোন ভিত্তি নেই কখনো কেউ তা দেখেছে এমন ও প্রমাণ নেই সম্ভবত ফুলের গন্ধে যেসব পোকা মাকড় আসে সেসব খেতে আবার ব্যাঙ আসে, সেই ব্যাঙ কে শিকার করতে সাপ এসেছিল কোন এককালে তারপর থেকে সেটিই প্রচলিত হয়ে গেছে।

  •  
  •  
  •  
  •  
ad0.3

Tags: ,