সারা দেশে বাড়ছে চলনবিলের শুঁটকির চাহিদা

নাটোর প্রতিনিধি:
স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে যাচ্ছে নাটোরের চলনবিলের শুঁটকি মাছ। চলতি বছর প্রায় ৫০ মেট্রিক টন শুটকি উৎপাদন হবে যার বাজার মূল্য কোটি টাকারও বেশি। স্থানীয় বাজার সৃষ্টি, শুটকি সংরক্ষণাগার তৈরি আর সেইসঙ্গে সনাতন পদ্ধতির পরিবর্তে আধুনিক পদ্ধতিতে শুটকি তৈরি করতে পারলে তা বিদেশে রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব বলে মনে করেন মৎস্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা।

জেলা মৎস অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, নাটোর সদরসহ সিংড়া, গুরুদাসপুর, বড়াইগ্রাম উপজেলা জুড়ে রয়েছে বিস্তীর্ণ চলনবিল। মৎস্য সম্পদে ভরপুর চলনবিল এলাকার মৎস্যজীবীদের অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে শুঁটকি তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করে। চলনবিলের মাছ স্বাদযুক্ত হওয়ায় এ মাছের শুঁটকির চাহিদাও বেশি। বছরের ছয় মাস টেংরা, পুটি, চান্দা, চিংড়ি, গুচিসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ শুকিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করেন তারা।

সরেজমিনে নাটোর-বগুড়া মহাসড়কের পাশে সিংড়া উপজেলার নিঙ্গুইন এলাকার শুঁটকি শুকানোর চাতালে গিয়ে দেখা যায়, দলবেধে নারী ও পুরুষ শ্রমিকেরা শুঁটকি শুকানোর কাজে ব্যস্ত সময় পার করছে। রোদের মাঝে শুঁটকি ওলট-পালট করে দিচ্ছে কেউ কেউ। তাদের মধ্যে কেউ আবার ছোট-বড়, ভালো-মন্দ শুটকি আলাদা করতে দম ফেলার সময় পাচ্ছেন না।

মহাসড়কের পাশেই বসে গেছে অস্থায়ী বাজার। গাড়ি থামিয়ে দামদর করে বিলের বিভিন্ন ধরনের শুঁটকি কিনছেন অনেকেই। শুঁটকি ব্যবসায়ী জয়নাল মিয়ার সঙ্গে এ বিষয়ে কথা হয়।

তিনি জানান, চলনবিলের মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে শুঁটকি তৈরি করে সৈয়দপুর, রংপুর, তিস্তার আড়তদারের কাছে পৌঁছে দেন। এখনো চলনবিল এলাকায় বাজার সৃষ্টি হয়নি। এখান থেকে শুঁটকি মাছ জেলার বাইরের মোকামগুলোতে নিয়ে যেতে মৎস্যজীবীদের খরচ অনেক বেশি পড়ে। সে কারণে তাদের লাভের পরিমাণ কমে যায়। আড়ৎদার ও পাইকারী ব্যবসায়ীরা নাটোরে এসে শুঁটকি কিনে নিয়ে গেলে তাদের লাভের পরিমাণ বেশি হত বলে জানান তিনি।

আরেক ব্যবসায়ী জমির উদ্দিন জানান, মান ভেদে প্রতিকেজি শুঁটকি ২০০ থেকে ৩০০ টাকায় বিক্রি হয়। তবে এ বছর মাছের পরিমাণ কম। চলনবিলে অবৈধ বাধাই জালের ব্যবহার বেশি। এ কারণে বিলে মাছ কমে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে চলনবিলের মাছ আর শুঁটকি ব্যবসায়ে ধস নামবে। তাই বাধাই জালের ব্যবহার বন্ধে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেন তিনি।

স্থানীয় বাসিন্দা রাকিবুল ইসলাম জানান, চলনবিলের শুঁটকি কোন রকম রাসায়নিকের প্রয়োগ ছাড়াই প্রক্রিয়াজাত করা হয়। এটা অত্যন্ত সুস্বাধু হওয়ায় সারা দেশে এর চাহিদা আছে। তবে চলনবিল অঞ্চলে একটা শুটকি সংরক্ষণাগার খুবই দরকার।

ট্রাক থামিয়ে শুঁটকি কিনতে আসা সবুজ মন্ডল জানান, জীবিকার তাগিদে বিভিন্ন জেলায় ছুটাছুটি করতে হয়। নাটোরের উপর দিয়ে যাওয়ার সময় তিনি চলনবিলের শুঁটকি কিনে নিয়ে যান। দামে সাশ্রয় ও মানে ভালো হওয়ায় তিনি বরাবরই এখানকার শুঁটকি কিনতে আগ্রহী থাকেন।

শুঁটকি আড়তে কাজ করে কর্মসংস্থান হয়েছে অনেকের। তার মধ্যে নারী শ্রমিকের সংখ্যই বেশি। বছরের ছয় মাস কর্মসংস্থান হলেও এখানে নারী শ্রমিকদের খুবই কম মজুরি দেওয়া হয়। পুরুষ শ্রমিকদের দৈনিক হাজিরা ৩০০ টাকা হলেও মাত্র ১২০ টাকা দৈনিক হাজিরায় কাজ করেন রাজিয়া বেওয়া, আম্বিয়া বেগমের মতো অনেকেই।

আধুনিক পদ্ধতি প্রয়োগ করা গেলে চলনবিলের শুঁটকি রপ্তানি করে বৈদাশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব হবে উল্লেখ করে জেলা মৎস কর্মকর্তা আতাউর রহমান খাঁন। তিনি জানান- চলনবিলে প্রচুর মাছ উৎপাদন হয়। এখান থেকে দেশীয় প্রজাতির বিভিন্ন মাছ কোনো রকম রাসায়নিকের প্রয়োগ ছাড়াই শুঁটকি করা হয়। চলনবিল অঞ্চলে ১ কোটি টাকার বেশি মূল্যের শুঁটকি উৎপাদন হয়।

তবে স্থানীয়ভাবে বাজার সৃষ্টি ও সেই সঙ্গে একটা সংরক্ষণাগার থাকলে ব্যবসায়ীরা আরও লাভবান হতো। স্থানীয় মৎস অধিদপ্তর শুঁটকির বাজার তৈরি এবং সরকারি অথবা বেসরকারিভাবে সংরক্ষণাগার তৈরির জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে জানান তিনি।

  •  
  •  
  •  
  •  

Tags: