যমুনা ব্রহ্মপুত্র তিস্তায় মাছশূন্যতা
পাবনা ও সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি:
পাবনা ও সিরাজগঞ্জ জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত পদ্মা ও যমুনা নদী। ইলিশ ছাড়াও পাঙ্গাশ, রুই, কাতলা, মৃগেলসহ ছোট-বড় প্রায় সব ধরনের মাছে সমৃদ্ধ ছিল এসব নদী। তিন দশক আগেও পাবনায় পদ্মা নদী ও মোহনা থেকে বছরে ১০ হাজার টনেরও বেশি মাছ ধরা হতো। কিন্তু বর্তমানে সেখানে মাছ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র এক হাজার টন। একইভাবে মাছশূন্য হয়ে পড়েছে দেশের অন্যতম বৃহৎ নদী ব্রহ্মপুত্র ও তিস্তা।
কেবল মাছের পরিমাণ নয়, প্রজাতির সংখ্যাও কমে এসেছে এসব নদীতে। রাজশাহীর গোদাগাড়ী ও চারঘাট এলাকায় পদ্মা নদীতে একসময় ১৪১ প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত। এখন মাত্র ৩৮ প্রজাতির মাছের দেখা মেলে সেখানে। বাকি ৬০ প্রজাতির মাছ দুষ্প্রাপ্য এবং ৫৯ প্রজাতির মাছ অতি বিরল হয়ে পড়েছে।
কয়েক দশক আগেও দেশীয় প্রজাতির বিভিন্ন মাছের অন্যতম প্রধান উৎস ছিল যমুনা, ব্রহ্মপুত্র ও তিস্তা নদী। সে সময় এসব নদীতে প্রচুর পরিমাণে মিলত রুই, কাতলা, মৃগেল, কালবাউশ, পাঙ্গাশ, বাটা, সরপুঁটি, গলদা ও বাগদা, চাকা, বোয়াল ও আইড়, শোল, গজার ও টাকি, শিং, মাগুর ও কৈ। কিন্তু এখন আর সে সুদিন নেই। বর্তমানে নদী থেকে আহরিত মাছের মাত্র ১ দশমিক ৬১ শতাংশ আসছে যমুনা ও ব্রহ্মপুত্র থেকে।
তথ্য বলছে, ১৯৮৪-৮৫ অর্থবছরে বৃহত্তর পাবনা জেলার নদী ও মোহনা থেকে প্রায় ১০ হাজার ৫৬৮ টন মাছ ধরা হতো। কিন্তু গত অর্থবছরে পাবনা ও সিরাজগঞ্জের (বৃহত্তর পাবনা) নদীতে মাছ পাওয়া গেছে মাত্র ১ হাজার ১৪৫ টন। অর্থাৎ তিন দশকের ব্যবধানে নদী থেকে মাছের প্রাপ্তি কমেছে প্রায় ৮৯ শতাংশ।
জেলা গেজেটিয়ার ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ইয়ারবুক অব দি এগ্রিকালচারাল স্ট্যাটিসটিকস-২০১৪ এর তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে যমুনা নদী থেকে প্রায় ২ হাজার ২৯৪ টন মাছ আহরণ করা সম্ভব হয়েছে, যা মোট আহরিত মাছের মাত্র ১ দশমিক ৩৭ শতাংশ। পানি ও পলিপ্রবাহের দিক থেকে ব্রহ্মপুত্র সারা পৃথিবীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নদী। সে ব্রহ্মপুত্র থেকে এখন মাছ ধরা হয় মাত্র ৪১২ টন, যা মোট আহরিত মাছের মাত্র শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ। অথচ একসময়ে এ দুটি থেকে বছরে ৩৫-৪০ হাজার টন মাছ আহরণ করা হতো।
অন্যদিকে তিস্তা নদী এখন অনেকটাই পানিশূন্য হয়ে পড়েছে। তিস্তা ব্যারেজের কাছে আগে তিস্তা নদীর সর্বাধিক গড় প্রবাহ ছিল ২ লাখ ৮০ হাজার কিউসেক এবং সর্বনিম্ন গড় প্রবাহ ছিল ১০ হাজার কিউসেক। কিন্তু উজানে ভারত ক্রমবর্ধমান হারে পানি সরিয়ে নেয়ায় বাংলাদেশে তিস্তার পানিপ্রবাহ এখন এক-দেড় হাজার কিউসেকে নেমে এসেছে। এমনকি খরার সময় তা ৫০০ কিউসেকে গিয়ে ঠেকে। ফলে মাছ তো দূরের কথা, পানি পাওয়াটাই এখন এ নদীর একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানবসৃষ্ট বিভিন্ন অপরিণামদর্শী কারণেই নদী থেকে এখন আর মাছ পাওয়া যাচ্ছে না। নদীতে পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ার পাশাপাশি কল-কারখানার বিষাক্ত বর্জ্য, নদীদূষণের কারণেও কমছে মাছের উৎপাদন। নদী শাসন ও বন্যা নিয়ন্ত্রণের নামে যত্রতত্র বাঁধ দেয়ার ফলে প্রধান প্রধান নদ-নদীর পানি কোনোভাবেই বিল-বাঁওড় বা প্লাবনভূমিতে প্রবেশ করতে পারছে না। এসব নদীতে প্যানকালচার ইউনিটের আওতায় মাছ চাষ করতে গিয়ে নদী ও খাল-বিলে বাঁধ দিয়ে দেশীয় প্রজাতির মাছের অবাধ বিচরণে বাধা সৃষ্টি করা হয়েছে। এতে মাছের স্বাভাবিক গতিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
অন্যদিকে দূষণের কারণে মাছের খাদ্য কমে যাচ্ছে। এছাড়া রয়েছে নদীতে প্রজনন মৌসুমে প্রজননক্ষম মাছ ও পোনা ধরা, নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার ও মাছের আবাসস্থল ধ্বংস।
এ বিষয়ে মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. আনিছুর রহমান বলেন, নদীতে পানিপ্রবাহ ধরে রাখা কিংবা পানি স্বাভাবিক রাখার দায়িত্ব নৌ-মন্ত্রণালয়ের। আবার নদীর দূষণ প্রতিরোধে বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় কাজ করবে। কিন্তু আমরা নদীকেন্দ্রিক মাছ উৎপাদনে যথেষ্ট সহায়ক পরিবেশ পাচ্ছি না। আবার নদী কমিশন মাছ উৎপাদনে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারছে না।
জানা গেছে, গত অর্থবছর দেশে মাছ উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৩৫ লাখ টন। এর মধ্যে নদী থেকে মাছ আহরণ হয়েছে প্রায় দুই লাখ টন, যার সিংহভাগই আবার ইলিশ। তবে যমুনা-ব্রহ্মপুত্র-তিস্তা নদীতে ইলিশ তো মিলছেই না, অন্যান্য মাছও প্রায় দুষ্প্রাপ্য হয়ে পড়েছে। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে যমুনা নদী থেকে যেসব মাছ আহরণ করা হয়েছে, তার মধ্যে ছিল ৬৬ টন রুই, ৩৬ টন কাতলা, ২০ টন মৃগেল, ১০৩ টন বোয়াল, ১২৯ টন ছোট মাছ এবং অন্যান্য অভ্যন্তরীণ জলাশয়ের মাছ ১ হাজার ৮৫৫ টন। অন্যদিকে ব্রহ্মপুত্র নদী থেকে বোয়াল ৩৭ টন, রুই ১১ এবং অন্যান্য অভ্যন্তরীণ জলাশয়ের মাছ ৩০৫ টন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভিয়েতনামে মাত্র ১০ হেক্টর জমি থেকে সর্বনিম্ন ৫০০ টন মাছ উৎপাদন হয়। অথচ বাংলাদেশের প্রায় ৩৪৫ কিমি দৈর্ঘ্যের বড় দুটি নদীতে মাছ উৎপাদন হচ্ছে মাত্র ২ হাজার ৭০৬ টন। নদীর মতো সম্পদের অপব্যবহারে এর চেয়ে বড় দৃষ্টান্ত আর হতে পারে না। এ অবস্থা থেকে দ্রুত বেরিয়ে আসতে সমন্বিত পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে হবে। তা না হলে চাষকৃত মাছের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে পড়তে হবে। তখন কৃষিজমি ও মাছ চাষে জমি ব্যবহারের ক্ষেত্রে দেখা দেবে দ্বন্দ্ব।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) মাৎস্য বিজ্ঞান অনুষদের অধ্যাপক ড. এমএ ওয়াহাব বলেন, সারা বিশ্বে মাছ উৎপাদনে সবচেয়ে উত্কৃষ্ট উৎস হলো নদী। যেসব দেশে নদী কিংবা এ ধরনের সুযোগ নেই, সেখানেই কেবল চাষে উৎসাহী হয়। অথচ বাংলাদেশে নদীকেন্দ্রিক প্রচুর সম্পদ থাকলেও তা মাছ উৎপাদনে ব্যবহার করা হচ্ছে না। তাই এখনই মানুষের পুষ্টি ও খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নদীকেন্দ্রিক মৎস্য উৎপাদনে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি প্রয়োগ করতে হবে।

