জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ : এ যুগের চে

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
বিশ্ব রাজনীতি বদলে দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসীদের ‘ওয়ান ইলেভেন হামলা’ এবং এরপর ইরাকে ইঙ্গ-মার্কিন বাহিনীর হামলার ঘটনার ‘পাপ’ এখনো বয়ে বেড়াচ্ছে বর্তমান বিশ্ব। অনেকে মনে করেন সেই পাপের ফসল আজকের পৃথিবীর জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাসবাদ।

তৎকালীন ইঙ্গ-মার্কিন মিত্র বুশ-ব্লেয়ার যে নজিরবিহীন অন্যায় এক যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিলেন, আজ ১৩ বছর পর তা কবুল করে নিচ্ছেন যুদ্ধ বাধানোর কারিগর ওই সময়ের অনেক কর্তাব্যক্তি। কিন্তু ততোদিনে সুন্দর পৃথিবীটা নরকে পরিণত হওয়ার দুয়ারে পৌঁছে গেছে।

ইরাক যুদ্ধ যে অবৈধ আর অন্যায় ছিল, সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের সাবেক উপপ্রধানমন্ত্রী জন প্রেসকটের স্বীকারোক্তিতে আবার তার প্রমাণ মিললো। প্রেসকট টনি ব্লেয়ারের মেয়াদকালে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তিনি সম্প্রতি সানডে মিররকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধটি ‘অবৈধ’ ছিল। তিনি দুঃখ ও ক্ষোভ প্রকাশ করে মিররে একটি কলাম লেখেন। এতে তিনি আক্ষেপ করে বলেন, অবৈধ ওই যুদ্ধে নিহত ১ লাখ ৭৫ হাজার নিরীহ ইরাকির জন্য তিনি ভীষণ মর্মাহত। তাকে বাকি জীবন বিপর্যয়কর এ স্মৃতি নিয়ে কাটাতে হবে। জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানের মতো গভীর দুঃখ ও ক্ষোভের সঙ্গে তিনি এখন একমত যে, ওই যুদ্ধ ছিল সাধারণ ইরাকিদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া।

আজকে ১৩ বছর পর এসে মিস্টার প্রেসকট যে সরল স্বীকারোক্তিটি দিলেন, তার কারণে অনেকে তাকে মহান বানিয়ে ফেলতে পারেন। তবে অনেকে দেখছেন ভিন্ন পরিপ্রেক্ষিত। বস্তুত, প্রেসকট নিজেকে ইতিহাসের কলঙ্কমুক্ত রাখার সামান্য চেষ্টা হিসেবে এটা করেছেন। তিনি বুঝতে পেরেছেন, সত্য চাপা থাকবে না। বুশ ও ব্লেয়ার যে গোটা বিশ্বে অন্যায় সব কার্যকলাপ চালিয়েছিলেন, নিরীহ রাষ্ট্র ও মানুষদের ওপর ছড়ি ঘুরিয়েছিলেন, তা একদিন না একদিন বেরিয়ে আসবেই।

হ্যাঁ, বেরিয়ে আসছেও। এবং সেটা কতিপয় তথ্যযোদ্ধার কারণেই সম্ভব হচ্ছে। সর্বযুগে, সর্বকালেই এ রকম কেউ না কেউ অত্যাচারিতের পাশে এসে দাঁড়ায়। সবাই যখন অত্যাচারীর অত্যাচারের তামাশা দেখতে মজমা জমায়, তখন এরা বুক চিতিয়ে দৃশ্যপটে হাজির হন। এরকমই একজন লড়াকু যোদ্ধা হলেন জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ। যাকে বলা হয় এ যুগের তথ্যবীর, এ যুগের চে গুয়েভারা।

তিনি যোদ্ধা। তবে তরবারি, চাপাতি, কালাশনিকভ রাইফেল দিয়ে তিনি যুদ্ধ করেন না। নিরেট প্রযুক্তির সহায়তা নিয়ে তথ্যহাতিয়ার ব্যবহার করে একে একে দুর্নীতিগ্রস্ত বিশ্বনেতাদের ওপর আক্রমণ দাগান, তাদের মুখোশ উন্মোচন করেন। যার কারণেই আজকের এই সত্য প্রকাশ। প্রেসকট যে কারণে সত্য স্বীকারে বাধ্য হচ্ছেন, সেটার গ্রাউন্ড তৈরি করেছেন জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের মতো তথ্যযোদ্ধারা।

অস্ট্রেলিয়ান এই কম্পিউটার প্রোগ্রামার একাধারে একজন প্রকাশক ও সাংবাদিক। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের বছর ১৯৭১ সালেই এই সাইবার যোদ্ধার জন্ম। শৈশব থেকেই বড্ড ডানপিটে সেই ছেলেটিই প্রথম বৈশ্বিক আলোচনায় আসেন ২০০৬ সালে। ওই বছরই জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ ‘উইকিলিকস’ প্রতিষ্ঠা করেন। অল্প সময়ের মধ্যে এই ওয়েবসাইট দুর্নীতিগ্রস্ত, দাঙ্গাবাজ, যুদ্ধবাজ বিশ্বনেতাদের গোপন তথ্য ফাঁস করে হৈচৈ ফেলে দেয়।

বিভিন্ন দেশের গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক গোপন তারবার্তা ফাঁস করে উইকিলিকস বিশ্বব্যাপী এখনও আলোড়ন সৃষ্টি করে চলেছে। তার প্রতিষ্ঠানের কম্পিউটার সার্ভার পৃথিবীর বহু দেশে অত্যন্ত গোপনীয় সুরক্ষিত স্থানে রাখা আছে। এসব স্থান থেকে মাঝে মধ্যে বিপুলসংখ্যক গোপন নথি প্রকাশ করে বিশ্বের নাগরিকদের প্রকৃত সত্য জানার সুযোগ করে দিচ্ছে। ফলে অ্যাসাঞ্জ এবং উইকিলিকস এখন রহস্যের আলো-আঁধারিতে মোড়ানো দুটি রহস্যময় নাম।

অ্যাসাঞ্জ প্রথম বড় বোমাটি ফাটান ২০১০ সালে। ওই বছর ইরাক যুদ্ধের ৩৯১৮৩২টি গোপন নথি প্রকাশ করেন তিনি। এরপর আফগানিস্তান যুদ্ধ নিয়েও ৭৭ হাজার নথি প্রকাশ করেন তিনি। সাধারণ মানুষের কাছে তিনি রীতিমত বীরের খেতাব পান আর অত্যাচারী, অন্যায়কারী দেশ শাসকদের কাছে তিনি আখ্যা পান গুপ্তচর বা দেশদ্রোহী হিসেবে। নানা বাধাবিপত্তি পেরিয়ে তার প্রতিষ্ঠিত উইকিলিকস রীতিমত যুদ্ধ ঘোষণা করে একনায়ক ও দুঃশাসকদের বিরুদ্ধে। সেই যুদ্ধ এখনো চলছে।

অ্যাসাঞ্জ এখনও কার্যত গৃহবন্দি। গত প্রায় চার বছর ধরে তিনি স্বেচ্ছাবন্দি হয়ে আছেন লন্ডনে ইকুয়েডরের দূতাবাসে। আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে দূতাবাসে আশ্রয় নেওয়া কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারে না আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সেই সুযোগটিই তাকে এখনো রক্ষা করে চলেছে। এ মাসেই তার বন্দিদশার চার বছর পূর্তি হয়েছে। ৩ জুলাই ছিল তার জন্মদিনও। বন্দিদশাতেই কেটেছে তার জন্মদিন। তারপরও তিনি থেমে নেই। তার তথ্যযুদ্ধ চলছেই।

দুষ্ট শাসকরা পৃথিবীটাকে একটা সর্বাত্মক নিয়ন্ত্রণমূলক রাষ্ট্রে পরিণত করতে প্রতিনিয়ত কোমর বেঁধে নামছে। আর তাদের বিরুদ্ধেই অ্যাসাঞ্জ ও তার উইকিলিকস বাহিনী বিদ্রোহ চালিয়ে যাচ্ছে। এ এক অন্যরকম বিদ্রোহ। যাকে বলা হচ্ছে সাইবার সংগ্রাম। সেই সংগ্রামের অকুতোভয় যোদ্ধা হলেন অ্যাসাঞ্জ এন্ড কোম্পানি।

উইকিলিকসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান সম্পাদক জুলিয়ান পল অ্যাসাঞ্জের জন্ম অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ডের টাউন্সভিলে। তবে তরুণ বয়স পর্যন্ত তিনি কাটিয়েছেন ম্যাগনেটিক আইসল্যান্ডে। তার বাবার নাম জন শিপটন, মা ক্রিস্টিন। অ্যাসাঞ্জের মায়ের জন্ম স্কটল্যান্ডে। অ্যাসাঞ্জ দাবি করেন, তার দাদা ছিলেন তাইওয়ানি জলদস্যু।

সম্ভবত তার রক্তে দস্যুতা, দূর্দমনীয়তার ইতিবাচক গুনটিই বেশি করে প্রকট। তা না হলে সেই ছোটকাল থেকেই তিনি দুর্বলের পক্ষ নিয়ে চলেছেন কেন? পৃথিবীর নানা দেশে বিচরণ করার ফলে নিজ দেশতো বটেই, কোনো দেশেই থিতু হতে পারেননি। ফলে, তিনি হয়ে উঠেছেন প্রকৃত বিশ্বনাগরিক।

উইকিলকসের যাত্রা শুরু থেকেই অ্যাসাঞ্জ সব সময় বলে আসছেন, তিনি গতানুগতিক সাংবাদিকতায় বিশ্বাস করেন না। তিনি সায়েন্টেফিক জার্নালিজম চর্চায় বিশ্বাস করেন। যেখানে পাঠক-দর্শকরা সংবাদের তথ্য-উপাত্ত নিজ চোখে দেখে শুনে তারপর বিশ্বাস করবে। জোর করে বিশ্বাস করাতে হবে না। উইকিলিকস সেই কাজটিই করে চলেছে।

বিখ্যাত ফ্যাশন ডিজাইনার ভিভেয়েন ইস্টউড যেমনটা বলেন, ‘অ্যাসাঞ্জ একজন জনপ্রিয় বীর। তিনি জনমত পরিবর্তনে অনেক বড় মাপের কাজ করেছেন। উইকিলিকসের মাধ্যমে বিশ্বের জনগণ প্রকাশিত সরকারি ভাষ্যের সাথে বিভিন্ন ঘটনার তুলনা করতে পেরেছে।’

বর্তমান বিশ্বের দুঃশাসকদের সবচেয়ে বড় শত্রুর নাম এখন জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ এবং উইকিলিকস। অ্যাসাঞ্জের কারণেই তারা এখন স্বস্তি নিয়ে ঘুমাতে যেতে পারেন না। যখনই তারা ঘুমানোর চেষ্টা করেন, এসে দুঃস্বপ্নের মতো হানা দেয় অ্যাসাঞ্জ ও তার উইকিলিকস। এই বুঝি আবার কোনো গোপন তারবার্তা ফাঁস করে দিল অ্যাসাঞ্জ বাহিনী। এ কারণে অ্যাসাঞ্জকে কোনঠাসা করার নানা উপায় নিয়ে ব্যস্ত তারা।

জাতিসংঘের একটি ওয়ার্কিং গ্রুপ অ্যাসাঞ্জকে ক্ষতিপূরণ দিয়ে মুক্তভাবে বেরিয়ে যাওয়ার পক্ষে মত দিলেও ব্রিটিশ-মার্কিন কর্তৃপক্ষ তাতে অনীহা দেখাচ্ছে। অ্যাসাঞ্জকে ঘিরে রাখা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ও ব্যয় বাড়াচ্ছে। এ জন্য তারা চার বছরে ব্যয় করেছে ২৫ মিলিয়ন পাউেন্ডরও বেশি। এতেই বুঝা যায়, সত্য প্রকাশ নিয়ে কতোটা ভীত ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ ও তার মিত্ররা। যে ধর্ষণের বানোয়াট অভিযোগে অ্যাসাঞ্জকে আসামী করা হয়েছে, সেই অভিযোগের কোনো ভিত্তি আজও মেলেনি।

দেশে দেশে নিপীড়ন দুঃশাসনবিরোধী আন্দোলনে আজ বড্ড বেশি প্রয়োজন অ্যাসাঞ্জ ও তার স্বেচ্ছাসেবী সাইবারযোদ্ধাদের মতো এমন অকুতোভয় বিপ্লবীদের।

লুৎফর রহমান হিমেল: সাংবাদিক, কলাম লেখক; বার্তা সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন।

  •  
  •  
  •  
  •  

Tags: