২৫ ভাগ কম জনবল দিয়েই চলছে সরকারের স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম।

নিউজ ডেস্কঃ

সরকারের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের মোট অনুমোদিত জনবলের সংখ্যা ১ লাখ ৫৬ হাজার ৮৬৬। এসব পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন ১ লাখ ১৮ হাজার ৬৯৬ জন। সে হিসেবে ২৫ ভাগ কম জনবল দিয়েই চলছে সরকারের স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ২০১৯-২০ অর্থবছরের কার্যাবলি সম্পর্কিত বার্ষিক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

সরকারের প্রায় সব দপ্তরেই জনবল সংকট রয়েছে। স্বাস্থ্য খাতও এর ব্যতিক্রম নয়। চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল জনবল নিয়ে স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম চলে এলেও এতদিন এ নিয়ে খুব বেশি আলোচনা হয়নি। কিন্তু নভেল করোনাভাইরাস মহামারী এসে স্বাস্থ্য খাতের এ সীমাবদ্ধতার বিষয়টি বড় সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে।

স্বাস্থ্যসেবা বিভাগে অনুমোদিত জনবলের ৩৮ হাজার ১৭০টি পদেই নিয়োগ দেয়া সম্ভব হয়নি। জনবল নিয়োগ দেয়ার কারণ হিসেবে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে নতুন পদ সৃষ্টির কথা। আবার নিয়োগবিধি পরিবর্তনের ফলেও এ বিভাগের বেশকিছু প্রতিষ্ঠানে জনবল নিয়োগ দেয়া সম্ভব হয়নি।

২০১১ সালে জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি প্রণয়ন করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। সেই স্বাস্থ্যনীতিতে জনবল কাঠামো পূরণে বেশকিছু প্রস্তাব ছিল। কিন্তু এসব প্রস্তাব পরিপালন করা হয়নি। স্বাস্থ্যনীতির এসব লক্ষ্য পূরণ না হওয়ার বিষয়টিকে সামনে নিয়ে এসেছে চলমান কভিড-১৯ মহামারীর প্রাদুর্ভাব।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি সর্বজনীন স্বাস্থ্যনীতি থাকার পরও সে অনুযায়ী কাজ না হওয়ায় নীতিটি কাগুজে নীতিতে পরিণত হয়েছে। এমনকি এ স্বাস্থ্যনীতির আওতায় সরকারপ্রধানের নেতৃত্বে জাতীয় স্বাস্থ্য কাউন্সিল গঠনের কথা বলা হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়সহ বেসরকারি খাতের স্টেকহোল্ডার ও বিশেষজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত করে গঠিত এ কাউন্সিলকে গণ্য করা হয় স্বাস্থ্য খাতের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী সংস্থা হিসেবে। প্রধানমন্ত্রীও কাউন্সিলের একাধিক সভায় সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষাসহ অন্যান্য বিষয়ে একাধিক নির্দেশনা দিয়েছেন, যা কাউন্সিলের বিভিন্ন সভার কার্যবিবরণীতে উঠে এসেছে, যদিও তা বাস্তবায়ন হয়নি।

এ বিষয়ে অর্থনীতিবিদ সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও ব্র্যাকের চেয়ারপারসন ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, দায়বদ্ধতা না থাকায় স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে যে নীতি প্রণয়ন করা হয়েছিল, সেটি এক অর্থে কাগুজে নীতিতে পরিণত হয়েছে। কভিড-১৯ এ দুর্যোগের সময় সেটি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা স্বাস্থ্যনীতিতে উল্লেখ থাকলেও প্রস্তুতির ঘাটতি রয়ে গিয়েছিল। এ নীতি বাস্তবায়ন হলে তার সুফল জনগণই পেত বলে উল্লেখ করেন তিনি।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের ৩২৪টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন ২৩৩ জন। তাদের মধ্যে আবার ১৭ জন কর্মকর্তা সংযুক্ত। এ বিভাগের ৯১ জনের পদ শূন্য।

সবচেয়ে বেশি পদ খালি রয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে। এ অধিদপ্তরের ১ লাখ ১১ হাজার ৭০৯টি পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন ৮০ হাজার ৩৫৪ জন। অধিদপ্তরে শূন্য পদের সংখ্যা ৩১ হাজার ৩৫৫। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, পদ সৃষ্টির কারণে ২০১৯-২০ অর্থবছরে অনুমোদিত, পূরণকৃত ও শূন্য পদের সংখ্যা বেড়েছে। মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ১ হাজার ২০০ জন, মেডিকেল টেকনিশিয়ান ১ হাজার ৬৫০ জন, কার্ডিওগ্রাফার্সের ১৫০ পদ সৃষ্টি এবং বিভিন্ন স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে প্রথম (নন-মেডিকেল), দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর পদ সৃষ্টি হওয়ায় সংরক্ষিত পদের সংখ্যা বেড়েছে।

ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরে ৬১৭টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন ৩৫৮ জন। এ অধিদপ্তরে ২৫৯টি পদ খালি রয়েছে। নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তরের ৪২ হাজার ৯৭৪টি পদে বিপরীতে শূন্য পদের সংখ্যা ৫ হাজার ৮৬৮, ন্যাশনাল ইলেকট্রো-মেডিকেল ইকুইপমেন্ট মেইনটেন্যান্স ওয়ার্কশপ অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টারে (নিমিউ অ্যান্ড টিসি) ৯৫টি পদের বিপরীতে ৩৯টি, যানবাহন ও যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণ সংস্থার (টেমো) ৭৫টি পদের মধ্যে ২৭টি ও স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটে ২৯টি পদের বিপরীতে ছয়টিই খালি।

প্রতিবেদনে শূন্য পদের বিন্যাসও করা হয়েছে। তাতে বলা হয়, অতিরিক্ত সচিব বা তার ঊর্ধ্বে একজন কর্মকর্তার পদ খালি রয়েছে। জেলা কর্মকর্তার পদ খালি রয়েছে ৮৬টি। অন্যান্য প্রথম শ্রেণীর পদ খালি রয়েছে ২ হাজার ৮০২টি। দ্বিতীয় শ্রেণীর পদ খালি ৬ হাজার ৬০৯টি। তৃতীয় শ্রেণীর ১৮ হাজার ৯১২টি ও চতুর্থ শ্রেণীর পদ খালি ৯ হাজার ৭৬০টি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর সেবার আওতা বেড়েছে অনেক। তবে এর বিপরীতে জনবল কাঠামো সেভাবে বাড়ানো হয়নি। আবার অনুমোদিত জনবল কাঠামোরও পূর্ণাঙ্গ নিয়োগ দেয়া সম্ভব হয়নি। এতে ক্রমবর্ধমান বিপুল সেবা চাহিদার বিপরীতে জনবল ঘাটতি নিয়ে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় সেবা দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। ফলে সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও নিরবচ্ছিন্ন চিকিৎসাসেবা দেয়ার বিষয়টিও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এ সমস্যাকে আরো জটিল করে তুলেছে নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ পরিস্থিতি।

নভেল করোনাভাইরাস পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তড়িঘড়ি করে বিভিন্ন পদে নিয়োগ দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টাও করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। নিয়োগ দ্রুত করতে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমেও জনবল নিয়োগ দেয়া হচ্ছে।

  •  
  •  
  •  
  •  

Tags: