নাটোরে প্রাণের কারখানায় ধ্বংসযজ্ঞ!

ইসাহাক আলী, নাটোর প্রতিনিধি:
বুধবার সন্ধ্যা থেকে বৃহস্পতিবার সকাল ৯টা। মাঝখানের দীর্ঘ ২১ ঘন্টায় দফায় দফায় বিক্ষোভ আর হামলা ভাংচুর লুটপাটে ধবংসযজ্ঞে পরিণত হয়েছে প্রাণ কারখানা। আন্দোলনকারী শ্রমিকদের বিক্ষোভের সাথে স্থানীয় বহিরাগতদের হামলা ভাংচুরে ত্রাসের পরিবেশ সৃষ্টি হয় কারখানা জুড়ে। কারখানার ক্যাশ কাউন্টারের ভল্ট ভেঙ্গে লুট করা হয় টাকা আর পরীক্ষাগারসহ সকল স্থানই এখন সাক্ষ্য দিচ্ছে ধ্বংস লীলার।

কারখানার অভ্যন্তরে পূবালী ব্যাংকের এটিএম বুথ ভেঙ্গে চেষ্টা চলে টাকা লোপাটের। শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধি এবং ওভার টাইম কমানোর দাবীসহ ১২ দফা দাবীতে নাটোরের একডালার প্রাণ এগ্রো লিঃ দীর্ঘ ২১ঘন্টাব্যাপী চলে এই ধ্বংসলীলা।

এসময় শ্রমিকদের প্রতিরোধ করতে গেলে তাদের ইটপাটকেলের আঘাতে কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হয়। বৃহস্পতিবার সকালে স্থানীয় সংসদ সদস্য, জেলা ও পুলিশ প্রশাসনের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। বর্তমানে কারখানা এলাকায় অতিরিক্তি পুলিশ ও র‌্যাব মোতায়ন করা হয়েছে। পরে বিকেলে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রতিষ্ঠান পরিচালকের পক্ষ থেকে কয়েক কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতির কথা স্বীকার করে। তবে তার সুনির্দিষ্ট পরিমান না জানাতে পারেননি তারা। কর্তৃপক্ষের কিছু ভুল ও বহিরাগতদের উস্কানীতে এ ঘটনা ঘটায় দুঃখ প্রকাশ করেন প্রাণের কর্তা ব্যক্তিরা। তবে মেরামত ও পুনঃস্থাপনের কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত কারখানার উৎপাদন বন্ধ থাকবে বলে জানিয়েছে কারখানা কর্তৃপক্ষ।

প্রত্যক্ষদর্শী ও আন্দোলনকারী শ্রমিকরা অভিযোগ করেন, শহরতলীর একডালা এলাকায় স্থাপিত প্রাণ এগ্রো লিমিটেড কর্তৃপক্ষ শ্রমিকদের ১২ ঘন্টা কাজ করিয়ে ১১ ঘন্টার বেতন-ভাতা প্রদান করেন। এছাড়া ওভার টাইম ডিউটির ১৯ টাকা ঘন্টা থেকে কমিয়ে ১৬ টাকা ঘন্টা নির্ধারণ করেন। এতে শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়লে বুধবার সন্ধ্যায় কারখানার ভিতর বিক্ষোভ মিছিল করে তারা। পরে মিছিলে বিভিন্ন ইউনিটের শ্রমিকরা যোগ দিয়ে একাডেমিক ভবন, পরীক্ষাগার (টেষ্টিং ল্যাব) সহ বিভিন্ন স্থাপনায় ব্যাপক ভাংচুর চালায়।

পুলিশ জানায়, খবর পেয়ে রাতেই জেলা ও পুলিশ প্রশাসনের উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষ ঘটনাস্থলে গিয়ে শ্রমিকদের শান্ত করে। বৃহস্পতিবার সকালে কারখানার ভেতরে থাকা বিক্ষুদ্ধ শ্রমিকদের সাথে দিনের শিফটের শ্রমিকরা একত্রিত হয়ে বিক্ষোভ মিছিল করে ও ভাংচুর চালায়। এ সময় তাদের সাথে যোগ দেয় বহিরাগত বিক্ষুব্ধরাও। শ্রমিকদের শান্ত করতে গেলে কনষ্টেবল মিজানুরসহ কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হয়। এ সময় বহিরাগতরা মালামালসহ ক্যাশ কাউন্টারের টাকাসহ মালামাল লুটপাট করে। ভেতরে থাকা ব্যাংকের এটিএম বুথেও ভাংচুর করা হয়। পরে স্থানীয় সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম শিমুল, জেলা প্রশাসক খলিলুর রহমান সহ পুলিশের উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষ শ্রমিকদের দাবী-দাওয়া নিয়ে প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনা করে দাবী পুরনের আশ্বাস দিলে শান্ত হয় শ্রমিকরা। বর্তমানে কারখানা এলাকায় অতিরিক্ত র‌্যাব, পুলিশ মোতায়ন করা হয়েছে।

নাটোর সদর সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার রফিকুল ইসলাম জানান, খবর পেয়ে বুধবার রাতেই তিনি পুলিশ ফোর্সসহ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। শ্রমিকদের দাবী-দাওয়ার ব্যাপারে ও যাতে পুনরায় শ্রমিক অসন্তোষ না ঘটে সে ব্যাপারে মনিটারিং করার বিষয়ে জেলার উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষ প্রাণ এগ্রো লিমিটেড কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনা চালাচ্ছেন।

এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক খলিলুর রহমান ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে জানান, শ্রমিকদের অভিযোগ সরকারী বিধি মোতাবেক বেতন ভাতাদি না পাওয়ায় তাদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষোভ বিরাজ করছিল। তারা বিভিন্ন সময় দাবী করলেও প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ সে ব্যাপারে কোন পদক্ষেপ না নেওয়ায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। শ্রমিকরা স্থানীয় সংসদ সদস্যকে তাদের দাবী-দাওয়া পূরণে ব্যবস্থা গ্রহণের দায়িত্ব দিয়েছে। সংসদ সদস্য তাদেরকে আশ্বাস দিলে তারা শান্ত হয়। বর্তমানে পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে। শ্রমিকদের কাছ থেকে লিখিতভাবে তাদের দাবী-দাওয়াগুলো নিয়ে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের কাছে দেওয়া হয়েছে।

NP4স্থানীয় সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম শিমুল জানান, শ্রমিকরা কারখানায় বিক্ষোভ ও ভাংচুর করেছে এমন খবর পেয়ে জেলা ও পুলিশ প্রশাসনকে সাথে নিয়ে তিনি ঘটনাস্থলে গিয়ে শ্রমিকদের শান্ত করেন। শ্রমিকদের এক সপ্তাহ অপেক্ষা করতে বলা হয়েছে। এ ব্যাপারে প্রাণ এগ্রো লিঃ-এর কর্তৃপক্ষের সাথে বসে শ্রমিকদের দাবী-দাওয়ার ব্যাপারে আলোচনা করে সমস্যার সমাধান করা হবে।

এদিকে, বিকেলে স্থানীয় একটি রেষ্টুরেন্টে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে প্রাণ এগ্রো লিঃ-এর পরিচালক ইলিয়াস মৃধা এ ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের কিছু ভূল ত্র“টি ও বহিরাগতদের উস্কানীতে এই অনাকাংখিত ঘটনা ঘটেছে। বহিরাগতরা কারখানায় ভাংচুর করা ছাড়াও ভোল্ট ভেঙ্গে টাকা লুট করেছে। কোন শ্রমিক এ ঘটনা ঘটায়নি বলে তারা দাবী করেন। কারণ শ্রমিকদের সাথে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের যথেষ্ট ভাল সম্পর্ক রয়েছে। তারা এখনও পর্যন্ত মৌখিক বা লিখিত ভাবে প্রাণ কর্তৃপক্ষের কাছে জানায়নি। পরিচালক এ ঘটনায় কয়েক কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতির কথা স্বীকার করেন। এদিকে তিনি যারা এ ঘটনা ঘটিয়েছে আইনী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বললেও শ্রমিকদের ন্যায্য দাবীর ব্যাপারে কোন আশ্বাসই দেননি। তবে কারখানার মেরামত ও পুনঃস্থাপনের কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত কারখানার উৎপাদন কাজ চালু করা সম্ভব হবে না। এ সময় প্রাণের মিডিয়া উইং এর সুজন মাহমুদসহ অন্যান্য কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলে।

এদিকে জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের হস্তক্ষেপে ক্ষোভ স্থিমিত হলেও শ্রমিকদের ন্যায্য দাবী উপেক্ষিত হলে এ আন্দোলন আবার দানা বেধে উঠতে পারে বলে মনে করেন স্থানীয় সুশীল সমাজ ও শ্রমিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।

  •  
  •  
  •  
  •  

Tags: