স্বাস্থ্য ও পরিবেশবান্ধব বন্ধু চুলা
জাহিদ হাসান:
একটি দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত পরিবেশবান্ধব “বন্ধু চুলার” উপর একটি প্রতিবেদন পড়লাম। প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী বর্তমানে বাংলাদেশের প্রায় ৯০ ভাগ পরিবার এখনো রান্নাবান্নার কাজে প্রচলিত অস্বাস্থ্যকর চুলা ব্যবহার করে থাকে। এই চুলার ধোঁয়ার কারনে শ্বাসজনিত রোগে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ প্রতিবছর মারা যায়।
হাঁপানি, নিওমোনিয়াসহ অন্যান্য শ্বাস-প্রশ্বাসজনিত রোগে আক্রান্ত হয় প্রায় ২৫ লাখ মানুষ যাদের অধিকাংশই নারী ও শিশু। একজন নারী দিনের একটা বড় সময় রান্নাঘরে কাটান। তাঁর সঙ্গে তাঁর শিশু সন্তানও থাকে এ সময়। রান্নার সময় প্রচলিত চুলা থেকে যে ধোঁয়া উৎপন্ন হয় তা মা ও শিশু উভয়ের জন্যই অত্যন্ত ক্ষতিকর।
গবেষণায় দেখা গেছে, ধোঁয়ায় আক্রান্ত হয়ে যে ৫০ হাজার মানুষ মারা যাচ্ছে, তার মধ্যে ৩২ হাজারই শিশু। প্রচলিত চুলার অনেক অসুবিধা আছে। এতে জ্বালানী খরচ বেশি হয়, রান্নায় সময় বেশি লাগে, রান্নাঘরের দেয়ালে কালি ও ঝুল হয়, হাঁড়ি পাতিল বেশি ময়লা হয় ও রান্নাঘরের পরিবেশ দূষিত হয়। প্রচলিত চুলার কারণে আগুনজনিত দুর্ঘটনার ঘটনাও বেশি ঘটে থাকে।
তাছাড়া প্রচলিত চুলা মোটেও পরিবেশবান্ধব নয়, কারণ এ চুলায় রান্নার জ্বালানীর জন্য বছরে প্রায় ১৫০ কোটি মণ লাকড়ির দরকার হয়। এই লাকড়ি জোগাড় করতে গিয়ে নির্বিচারে বন উজাড় করা হচ্ছে যা আমাদের পরিবেশের জন্য মারাত্মক হূমকিস্বরূপ।
এসব সমস্যার সমাধান হতে পারে ‘বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ’ উদ্ভাবিত ও জার্মান সংস্থা ‘জিআইজেড’ কর্তৃক পরিমার্জিত একটি পরিবেশবান্ধব উন্নত চুলা যা ‘বন্ধু চুলা’ নামে পরিচিত। মূলত যে সব চুলায় জ্বালানী হিসেবে শুকনো কাঠ, খড় ইত্যাদি ব্যবহৃত হয়, সে সব চুলার বিকল্প হিসেবে বন্ধু চুলা ব্যবহার করা যায়। এই চুলা বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে সহজলভ্য উপকরণে তৈরী করা হয়েছে। ছাঁকনি, চিমনি ও টুপি এই চুলার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ছাঁকনির উপরে জ্বালানী পোড়ানো হয় ও চিমনির ভিতর দিয়ে ধোঁয়া ঘরের বাইরে চলে যায়। এ চুলায় আগুনের তাপ বেশি কাজে লাগে বলে কম জ্বালানীতে তাড়াতাড়ি রান্না হয়। বন্ধু চুলায় রান্না করার সময় নারী ও শিশু ধোঁয়ায় আক্রান্ত হয় না। এ চুলার জ্বালানীর পরিমাণ প্রচলিত চুলার অর্ধেক। এতে করে বছরে প্রায় ৭০ কোটি মণ লাকড়ি বেঁচে যাবে যা দেশ জুড়ে বৃক্ষ নিধনের পরিমাণ অনেক কমিয়ে দিবে। বন্ধু চুলা জ্বালানী সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব। এই চুলা ব্যবহার করলে রান্নাঘরের পরিবেশ ভাল থাকে।
রান্নাঘর থাকে পরিচ্ছন্ন। প্রচলিত চুলার চেয়ে বন্ধু চুলায় কম সময়ে রান্না করা যায় বলে নারীরা সংসারের অন্যান্য কাজে আরো বেশি সময় দিতে পারেন। তবে আমাদের দেশে এখনও বন্ধু চুলা খুব বেশি জনপ্রিয় হয় নি। কারণ এ চুলা সম্মন্ধে অনেক মানুষই তেমন কিছু জানে না। তাই সবাই যেন এই চুলা ব্যবহার করতে পারে সেজন্য টেলিভিশন ও অন্যান্য গণমাধ্যমে প্রচারণা চালানো উচিত। তাছাড়া বন্ধু চুলার প্রচলনের ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান তার ইউনিয়নের বাসিন্দাদের মধ্যে বন্ধু চুলা জনপ্রিয় করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারেন।
স্বাস্থ্য ও পরিবেশ রক্ষার জন্য বন্ধু চুলা ব্যবহার করা অত্যন্ত জরুরী। তাই এ চুলার ব্যাপক প্রসারের লক্ষ্যে দেশব্যাপী জনসচেতনতা তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি বন্ধু চুলারসীমাবদ্ধতাগুলো দূর করে একে আরও উন্নত ও গ্রাহকবান্ধব করে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।

