সফলতার ৫৫ বছরে খাদ্যে স্বয়ম্ভরতা ও কৃষি অগ্রযাত্রা

প্রফেসর ড. মো. আলী আকবর:
কৃষিই আমাদের কৃষ্টি। চিরায়ত ঐতিহ্যের সূতিকাগার। কৃষির উৎকর্ষ ও গ্রাম উন্নয়নের মধ্যেই নিহিত রয়েছে এদেশের সমৃদ্ধির মূলমন্ত্র। এককথায়, কৃষিনির্ভর বাংলাদেশে কৃষি ব্যবস্থার উন্নতির মাঝেই রয়েছে জাতির অর্থনৈতিক বিপ্লব ও প্রাণশক্তি। বাংলাদেশের দারিদ্র্য দূরীকরণের প্রত্যয়ে দেশকে একটি শক্তিশালী আর্থসামাজিক অবকাঠামো উপহার দেয়ার লক্ষ্যে সবুজ বিপ্লবের ধারণাকে সামনে রেখে ১৯৬১ সালের ১৮ আগস্ট প্রতিষ্ঠা লাভ করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কৃষি শিক্ষার প্রাচীন ও সর্বশ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি)। ৫৫ বছরের অগ্রযাত্রায় আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা পদ্ধতি, উচ্চতর কৃষি গবেষণা, লাগসই কৃষি গবেষণার মাধ্যমে জাতির হৃদয়ে আপন মর্যাদায় অধিষ্ঠিত এ বিশ্ববিদ্যালয়। আজ ১৮ আগস্ট বাকৃবি পা রাখছে সফলতার ৫৬ বছরে।

এই বিশ্ববিদ্যালয় এ পর্যন্ত প্রায় ৪০ হাজার দক্ষ কৃষিবিদ তৈরি করেছে। এ পর্যন্ত জাপান, ইথিওপিয়া, সোমালিয়া, ইরান, মালদ্বীপ, পাকিস্তান, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, ভারত, শ্রীলঙ্কা এবং নেপাল থেকে পড়াশোনা করতে আসা শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ১১৭ জন। তাছাড়াও বিশেষ সমাবর্তনের মাধ্যমে এ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নোবেল লরিয়েট কৃষি বিজ্ঞানী ড. নরম্যান ই. বোরলগকে সম্মানসূচক ডিএসসি (অনারিস কজা) ডিগ্রি প্রদান করা হয়।

ভৌত অবকাঠামো:
একাডেমিক শিক্ষার পাশাপাশি একক প্রতিষ্ঠান ও স্থাপনায় সমৃদ্ধ বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। বিলুপ্তপ্রায় দেশি-বিদেশি ফল গাছের দেশের সবচেয়ে বড় ও বিশ্বের দ্বিতীয় সর্ববৃহৎ সংগ্রহশালা হলো বাকৃবি জার্মপ্লাজম সেন্টার। এখানে রয়েছে দেশের প্রথম এবং একমাত্র কৃষি জাদুঘর। দেশের একমাত্র ও দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহৎ মৎস্য জাদুঘর। জীববৈচিত্র্যের দিক দিয়ে দেশের সেরা ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বোটানিক্যাল গার্ডেন এ বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থিত। এ বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে একটি বৃহৎ দুগ্ধ খামার, পোলট্রি খামার, মৎস্য খামার, কৃষি খামার, ফিড মিল, মৎস্য হ্যাচারি, গো-ছাগলের জাত উন্নয়ন কেন্দ্র, ভেটেরিনারি ক্লিনিক এবং আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সংবলিত অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ হোসেন ল্যাবরেটরি। বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে গর্ব করার মতো একটি কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার। বাংলাদেশের একক প্রতিষ্ঠান বা স্থাপনা হিসেবে ক্যাম্পাসের ভেতর আছে বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা), বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএফআরআই), গ্র্যাজুয়েট ট্রেনিং ইনস্টিটিউট (জিটিআই), বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় রিসার্চ সিস্টেম (বাউরেস), উপমহাদেশের প্রথম প্লান্ট ডিজিজ ক্লিনিক, সিড প্যাথলজি সেন্টার, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় সম্প্রসারণ কেন্দ্র (বাউএক), আর্থসামাজিক গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো।

শিক্ষা কার্যক্রম:
ছয়টি অনুষদের আওতায় ৪৩টি শিক্ষা বিভাগের তত্ত্বাবধানে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে থাকে, যা নিম্নে উল্লেখ করা হলো:

ভেটেরিনারি অনুষদ আট, কৃষি অনুষদ ১৬, পশু পালন অনুষদ পাঁচ, কৃষি অর্থনীতি ও গ্রামীণ সমাজবিজ্ঞান অনুষদ পাঁচ, কৃষি প্রকৌশল ও কারিগরি অনুষদ পাঁচ এবং মাৎস্য বিজ্ঞান অনুষদ চারটি। উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট-উত্তর আট সেমিস্টারে বিন্যস্ত ৪ বছর মেয়াদি কোর্সের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক পর্যায়ে ভেটেনারি সায়েন্স, পশুপালন, কৃষি, কৃষি অর্থনীতি, কৃষি প্রকৌশল, খাদ্য প্রকৌশল ও মাৎসবিজ্ঞান ডিগ্রি প্রদান করা হয়ে থাকে। ভেটেরিনারি অনুষদের ইন্টার্নশিপ কর্মসূচি দুই সেমিস্টার ও পশুপালন অনুষদের ইন্টার্নশিপ এক সেমিস্টারে পুনর্বিন্যস্ত করা হয়েছে।

স্নাতকোত্তর পর্যায়ে মোট ৪০টি শিক্ষা বিভাগে একটানা তিন সেমিস্টারে বিন্যস্ত কোর্স-ক্রেডিট ও গবেষণাভিত্তিক ৪২টি বিষয়ে এমএস ডিগ্রি কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে থাকে। ডক্টরেট কার্যক্রম পূর্ণকালীন ৩ বছর মেয়াদি বা সর্বোচ্চ ৬ বছর পর্যন্ত বাড়ানো যেতে পারে এবং এর মধ্যে টানা ২ বছর বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থান শিক্ষার্থী-গবেষকের জন্য আবশ্যক। উচ্চশিক্ষা গবেষণা কমিটির ওপর স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রমের উন্নয়ন, সমন্বয় ও তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব ন্যস্ত রয়েছে। বর্তমানে ৩৮টি বিভাগ থেকে পিএইচডি ডিগ্রি প্রদান করা হয়ে থাকে।

গবেষণা:
১৯৯১ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে ৩২ একর জায়গা গিয়ে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহৎতম ফল সংগ্রহশালা বাকৃবি জার্মপ্লাজম সেন্টারটি এখন পর্যন্ত শত শত দেশি-বিদেশি ফলের বাণিজ্যিক জাত উদ্ভাবন করে দেশের পুষ্টি ও অর্থনৈতিক চাহিদা পূরণ করে আসছে। প্রায় ২২০ প্রজাতির ১০ হাজার ৫০০ মাতৃগাছসহ ৮০০ জাতের উদ্ভিদের মধ্যে ২১২টি আমের, পেয়ারার ৪৭টি, লিচুর ৩২টি, ৪৮ ধরনের সাইট্রিক ফল, ৬৮ জাতের ঔষধি ফল, কাঁঠাল ৯৮টি এবং বিশ্বের ৪৪ দেশ থেকে অর্ধশতাধিক ফলের সমারোহ দেখা যাবে এখানে। জার্মপ্লাজম সেন্টারের পরিচালক ড. এম এ রহিমসহ সহকারী গবেষকদের দ্বারা উদ্ভাবিত হয়েছে প্রায় ৭৫ জাতের ফল। পশুসম্পদ বিজ্ঞান সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তির মধ্যে মোরগ-মুরগির রানিক্ষেত রোগ ও ফাউল পক্সের প্রতিষেধক টিকা উৎপাদন; হাঁসের প্লেগ ভ্যাকসিন ও হাঁস-মুরগির ফাউল কলেরার ভ্যাকসিন তৈরি; হাঁস-মুরগির সুষম খাদ্য তৈরি, কৃত্রিম প্রজনন পদ্ধতিতে ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগলের সিমেন সংরক্ষণ; ছাগলের কৃত্রিম প্রজননের কলাকৌশল; গবাদিপশু উৎপাদন ও পুনরুৎপাদন বৃদ্ধিতে ইউরিয়া মোলাসেস ব্লক; কোয়েল পাখির নতুন উপজাত উদ্ভাবন উল্লেখযোগ্য।

মাৎস্যবিজ্ঞান প্রযুক্তিকে এগিয়ে নিয়েছে বাকৃবিতে পরিচালিত বিভিন্ন গবেষণা। এর মধ্যে গাঙ মাগুরের কৃত্রিম প্রজনন, একই সঙ্গে সবজি ও মাছের চাষ (একোয়াফনিক্স ও একোয়াজিওফনিক্স), ক্ষত রোগের প্রতিকার নির্ণয়, মাগুর, শিং, তারা বাইম, গুচি বাইম ও বাটা মাছের কৃত্রিম প্রজননসহ ভাসমান খাঁচায় মাছ চাষ পদ্ধতি; দেশি পাঙ্গাশের কৃত্রিম প্রজনন; এলোজাইম মার্কার ব্যবহার করে কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে কৈ মাছের কৌলিতাত্ত্বিক পার্থক্য নিরূপণ; হিমায়িত শুক্রাণুর মাধ্যমে দেশীয় জাতের মাছের পোনা উৎপাদন; মাছের পোনা পালনের জন্য রটিফারের চাষ; পেরিফাইটন পদ্ধতিতে মাছ চাষ, কুঁচিয়া মাছের প্রধান প্রজনন সময়কাল নির্ণয় প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।

সম্প্রসারণ-তৎপরতা:
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় সম্প্রসারণ কেন্দ্রের (বাউএক) অন্যতম লক্ষ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, শিক্ষক ও কৃষকের মধ্যে কার্যকর যোগসূত্র স্থাপন এবং প্রযুক্তি হস্তান্তর ও তত্ত্বাবধান।

প্রশিক্ষণ:
গ্র্যাজুয়েট ট্রেনিং ইনস্টিটিউট (জিটিআই) শিক্ষকদের জন্য একাডেমিক ফাউন্ডেশন ট্রেনিং কোর্সসহ কর্মকর্তা ও গবেষকদের জন্য চাকরিকালীন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে থাকে। সিড প্যাথলজি সেন্টারের ব্যবস্থাপনায় বীজের স্বাস্থ্য বিষয় এবং আর্থসামাজিক গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর মাধ্যমে কৃষি আর্থনীতি এবং গ্রামীণ সমাজবিজ্ঞান বিষয়ে গবেষণা ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়ে থাকে। কৃষি প্রকৌশল ও কারিগরি অনুষদের রিসার্চ, টেস্টিং ও কনসালটেশন ব্যুরোর তত্ত্বাবধানে কৃষি প্রকৌশল গবেষণা এবং প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালিনা ছাড়াও কৃষি প্রকৌশল সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশেষজ্ঞ সেবা, টেস্টিং ও কনসালটেশন সুবিধা প্রদান করা হয়ে থাকে। ল্যাঙ্গুয়েজ ল্যাবের ব্যবস্থাপনায় ইংরেজি ভাষায় কৃষি গ্র্যাজুয়েটদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য কমিউনিকেটিভ ইংলিশ ও প্রস্তুতিমূলক ওঊখঞঝ নামে দুইটি বিশেষায়িত সংক্ষিপ্ত কোর্স প্রদান করা হয়। পিজিডি ইন-আইসিটি কোর্স ২০০৫ সালে চালু হয়েছে। অ্যাগ্রি-বিজনেস ম্যানেজমেন্ট শিক্ষা কার্যক্রম চালু হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগ ও বিজ্ঞান সমিতির উদ্যোগে ১৫টি উচ্চমানসম্মত বৈজ্ঞানিক এবং কারিগরি জার্নাল প্রকাশিত হয়ে থাকে।

মুক্তিযুদ্ধে বাকৃবি:
১৯৭১ সালের ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় হারায় তার ১৯ বীর সন্তানকে। তারা হলেন জামাল হোসন, নাজমুল আহসান, শামসুল হক তালুকদার, নাজির আকতার কাশেম, আবদুল মতিন খন্দকার টিপু, হাবিবুর রহমান, আবুল কাশেম, খুরশীদ আলম শিবলু, কাজী মঞ্জুর হোসন, ইব্রাহিম মোস্তফা কামাল, মনিরুল ইসলাম আকন্দ নামের ১১ ছাত্র ও আক্কাস আলী, মধুসূধন, নূরুল হক, গাজী ওয়াহিদুজ্জামান, হাসান আলী, গিয়াস উদ্দিন নামের ছয় কর্মচারী এবং পরম শ্রদ্ধেয় শিক্ষক আশরাফুল ইসলাম ভূঁইয়াকে। তাদের নামে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন মিলনায়তনের পাশে নির্মাণ করা হয় মরণ সাগর নামের স্মৃতিসৌধ। এছাড়া মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন শহীদ ছাত্র মুক্তিযোদ্ধার নামে তিনটি হলের নামকরণ করা হয়। হলগুলো হচ্ছে শহীদ শামসুল হক হল, শহীদ নাজমুল আহসান হল এবং শহীদ জামাল হোসেন হল।

’৭০-এর দশকে বাংলাদেশের জনসংখ্যা ছিল সাড়ে ৭ কোটি। তারপরও দেশে ছিল প্রচ- খাদ্যাভাব, ক্ষুধা এবং দুর্ভিক্ষ দুর্ভিক্ষ। ক্ষুধা-দুর্ভিক্ষে মারা গেছেন অসংখ্য মানুষ। ২০১৫- সালে জনসংখ্যা ১৬ কোটির কোটায় পৌঁছালেও বাংলাদেশ আজ খাদ্যে স্বয়ংস্পূর্ণতার দ্বারপ্রান্তে। আর দেশকে খাদ্যে স্বয়ংস্পূর্ণতায় বাকৃবির অবদান অনস্বীকার্য। দেশে এরই মধ্যে আরও বেশ ক’টি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠলেও এটিই বাংলাদেশে উচ্চতর কৃষি শিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রে পথিকৃৎ এবং সর্ববৃহৎ বিশ্ববিদ্যালয়। কৃষিবিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রগতির ধারার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে বাকৃবি তার ৫৫ বছরের গৌরবময় ঐতিহ্য সমুন্নত রাখতে সক্ষম হবে আজকের দিনে এমনটি আমার স্থির প্রতীতি।

________________________________
প্রফেসর ড. মো. আলী আকবর

উপাচার্য, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ-২২০২

  •  
  •  
  •  
  •