ভেড়া ও মহিষের উৎপাদন বাড়ানো প্রয়োজন

ড. মোঃ সহিদুজ্জামান

ছোট বেলার কথা- বাবা প্রায়ই মহিষের মাংস কিনতেন।খেতে ভালই লাগত। লাল মাংস, বড় বড় আঁশ, চর্বি তুলনামূলক কম, স্বাদেও অতুলনীয়।সেই মহিষ কমতে কমতে এখন অনেকটাই বিলুপ্তির পথে।আবার ভেড়ার মাংস দেশে জেনেশুনে তেমন খাওয়া না হলেও বিদেশে ভেড়ার মাংস হরহামেশাই খাওয়া হত। লাম্ব (১ বছরের নিচের ভেড়ার মাংস) বেশ সুস্বাদু এবং চাহিদা রয়েছে বিশ্বের অনেক দেশেই। বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে ভেড়ার মাংস সচারচর ব্যবহার করতে দেখা যায় বিদেশে।

আমাদের দেশে মহিষ ও ভেড়া পালন প্রায় দুই দশক আগেও জনপ্রিয় ছিল। কালের আবর্তে পিছিয়ে গেছে এসব প্রাণীর উৎপাদন ও ভক্ষণ। গরুর পরেই ছিল মহিষের স্থান। মহিষ দুধ উৎপাদনের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে পরিচিত। গরু পালনের খরচের তুলনায় মহিষপালনের ক্ষেত্রে বাসস্থান এবং খাদ্য খরচ অনেকটা কম কারণ মহিষ বালুচর আর নদী বিধৌত বাথান এলাকায় সবুজ ঘাস খেয়ে থাকে। মহিষ গড়ে ১৫ বছর বাঁচে এবং সমগ্র জীবণচক্রে প্রায় ১৬-১৭টি বাচ্চা প্রদান করে থাকে। গরুর তুলনায় মহিষের রোগবালাইও অপেক্ষাকৃতকম এবং প্রতিকূল আবহাওয়ায় মহিষ অতি সহজে বাঁচতে পারে।

পত্রপত্রিকার তথ্য মতে, জাতীয় আয় ও সংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশে প্রাণিসম্পদের মধ্যে চতুর্থ স্থানে ভেড়া।ভেড়া অত্যন্ত কষ্টসহিষ্ণু এবং প্রতিকূল পরিবেশে শুকনো খড় এবং শস্যের অবশিষ্ট খেয়েও জীবনধারণ করতে পারে।ভেড়া দলবদ্ধভাবে থাকতে পছন্দ করে। এ কারণে গরুর সঙ্গে অতিরিক্ত জনবল ছাড়াই ভেড়া পালন সম্ভব। ভেড়া পালনের বড় সুবিধাটি হলো, গরুর সঙ্গে একই খামারে বা ঘরে ছাগল পালন করা যায় না কিন্তু অতি সামান্য খরচ ও সহজ পরিচর্যায় ভেড়া পালন করা যায়। চর এলাকার বাথানে, উপকূলে এবং হাওরাঞ্চলের চারণভূমিতে প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত কাঁচা ঘাস খাইয়ে অল্প খরচে বৎসরের শুকনো মৌসুমসহ প্রায় সব সময়ই ভেড়া পালন করা সম্ভব। যেসব জায়গায় পতিত জমি থাকে, বন-জঙ্গল আছে, সেখানে পালনের সুবিধাও বেশি। খামার পরিচালনায় খাদ্য খরচও অনেক কম। ভূমিহীন, প্রান্তিক চাষি, বেকার যুবক, দুস্থ মহিলা এমনকি স্কুলের ছাত্রছাত্রী যারা বেশি পুঁজি জোগাড় করতে পারে না, তারা ভেড়া পালন করে দ্রুত আয়ের পথ করে নিতে পারে। আমাদের দেশে চারণভূমির যে সমস্যা, তাতে ভেড়া পালনের প্রতি বেশি নজর দিতে হবে।তাই কৃষিজমির ওপর চাপ সৃষ্টি না করে অল্প জায়গাতেই প্রতিটি পরিবারে কয়েকটি ভেড়া পালন করে আমাদের প্রাণিজ আমিষের প্রয়োজন মেটানো যেতে পারে।

মহিষের মাংসের মধ্যে আন্তকোষীর চর্বি কম থাকায় স্বাস্থ্যঝুঁকি কম। মহিষের চামড়ার নিচে চর্বির যে মোটা স্তর পড়ে তা সরিয়ে ফেললে অনেকটাই চর্বিহীন মাংস ভক্ষণ করা সম্ভব। মহিষের ও ভেড়া উভয়ের মাংসে উচ্চমাত্রায় প্রোটিন, জিংক, কপার, আয়রণ ও সেলিনিয়াম থাকে। চর্বি ও কোলস্টেরলও কম। এছাড়াও অধিক পরিমান রয়েছে ওমেগা-৩ ও ওমেগা-৬ নামের ফ্যাটি এসিড যা শরীরের কোলেস্টেরল কমাতে, এবং হার্ট ও মস্তিস্ক সুরক্ষা এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে। মহিষের দুধে কঠিন পদার্থ ও চর্বি বেশি থাকায় মহিষের দুধ অনেক প্রকার মিষ্টি খাদ্যপণ্য তৈরির জন্য বেশ উপযোগী। গবেষণার তথ্যমতে ভেড়ার মাংসে কনজুগেটেড লিনোলিইক এসিড নামে এক ধরণের পদার্থ উচ্চমাত্রায় থাকে যা কি না ক্যান্সার, করোনারি হার্ট ডিজিজ ও ডায়াবেটিস প্রতিরোধে সহায়তা করে।

সরকারের উন্নয়নমূলক প্রকল্প ও প্রানিসম্পদ অধিদপ্তরের সহায়তায় ভেড়া ও মহিষ উৎপাদনের দিকে নজর দেওয়া হয়েছে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হিসাবে সারা দেশে তিন হাজার ৬৩২টি ভেড়ার নিবন্ধিত খামার রয়েছে। এর বাইরেও অনেকে অল্প পরিসরে দু-চারটি বা ১০ থেকে ২০টি করে ভেড়া লালনপালন করছে। জানা যায়, দেশের প্রাণিজ আমিষের উৎপাদন এবং জাতীয় অর্থনীতিতে অবদানের কথা বিবেচনায় বর্তমান সরকারের ৩১ কোটি ৭৩ লাখ টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়িত হচ্ছে ‘সমাজভিত্তিক ও বাণিজ্যিক খামারে দেশি ভেড়ার উন্নয়ন ও সংরক্ষণ (কম্পোনেন্ট-বি) প্রকল্প। প্রকল্পের অধীনে পার্বত্যাঞ্চলের ২৫ উপজেলায় ৫০০ পরিবারের মধ্যে এক হাজার ৫০০ ভেড়া বিনামূল্যে বিতরণ, ১৩ হাজার সুফলভোগীকে ভেড়া পালন বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া, ১২৮ কন্ট্রাক্ট গ্রোয়ার ভেড়ার খামার তৈরি, সারা দেশে ১৩ হাজার ক্ষুদ্র ও মাঝারি ভেড়ার খামার স্থাপন এবং ভেড়ার মাংস জনপ্রিয় করার নানামুখী প্রচার চালানোসহ প্রকল্পের প্রায় সব কাজ শেষ হয়েছে।

মহিষের দুধের উৎপাদন বাড়াতে সম্প্রতি ৬৭ কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ করেছে সরকার। দেশের ৮ বিভাগের ১২ জেলার ১২ উপজেলায় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে নেওয়া এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএলআরআই)। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে মহিষের দুধের উৎপাদন বাড়ানো ছাড়াও দেশে উৎপাদিত শংকর জাতের মহিষের উৎপাদনশীলতা যাচাই ও বাচ্চা উৎপাদন বাড়বে। দেশীয় আবহাওয়ায় পোষ মানানোর লক্ষ্যে বিশুদ্ধ শংকর জাতের মহিষের সেলেকটিভ ব্রিডিং কার্যক্রম গ্রহণ করা যাবে এবং লাভজনক মহিষ পালন ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের লক্ষ্যে ন্যূনতম ৫টি প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও খামারি পর্যায়ে যুক্ত করা যাবে বলে পত্রপত্রিকায় তথ্য প্রকাশিত হয়।

কম খরচ আর অধিক লাভজনক হওয়ায় গ্রামাঞ্চলের মানুষ ভেড়ার খামারের দিকে ঝুঁকছেন। দেশের কিছু অঞ্চলে মহিষে পালনও আস্তে আস্তে বাড়ছে। অন্য প্রাণীর তুলনায় এসব প্রাণীর লালনপালন খরচ ও রোগব্যাধি কম হওয়ায় বাণিজ্যিকভাবে পালনের ব্যাপক সুযোগ-সম্ভাবনা রয়েছে বাংলাদেশে। এসব প্রাণীর খামার গড়ে তুলে বেকারত্ব মোচন বা আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ রয়েছে। এছাড়া করোনা কালীন ও করোনা পরবর্তী অর্থনীতি টিকিয়ে রাখতে অন্যান্য প্রাণীর পাশাপাশি মহিষ ও ভেড়ার উৎপাদন ও বহুমূখী ব্যবহার তরান্বিত করা প্রয়োজন।প্রয়োজন বাংলাদেশের আবহাওয়া-উপযোগী নতুন জাত উদ্ভাবন এবং উদ্যেক্তা তৈরির পাশাপাশি বাজার তৈরি।

এসব প্রাণীর বহুমূখী ব্যবহার নিশ্চিত করতে না পারলে এর উৎপাদন লাভজনক করা সম্ভব হবে না এবং উদ্যোক্তরা পালনে আগ্রহী হবেন না। বিশেষ করে এদের মাংস ও দুধ এবং নানাবিধ প্রক্রিয়াজাত পন্য ভক্ষণ জনপ্রিয় করতে হবে। মহিষ ও ভেড়াকে জনপ্রিয় করতে পশু হিসেবে মহিষ ও ভেড়া কোরবানী দিতে উৎসাহিত করা, মাংস প্রক্রিয়াজাত করে বাজারজাত করা, পুষ্টিগুন ও স্বাস্থ্য সহায়ক বিষয়গুলো মানুষের সামনে তুলে ধরতে হবে। এজন বিভিন্ন প্লাটফরমে বেশি বেশি আলোচনা ও মিডিয়াতে বিষয়গুলো প্রচার করা যেতে পারে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেটেরিনারি অনুষদের প্রফেসর জালাল উদ্দিন ভেড়া পালনে মানুষে আগ্রহী ও ভেড়ার মাংসকে জনপ্রিয় করতে কাজ করে যাচ্ছেন। শুধু তাই নয় নিরাপদ ভেড়ার মাংস উৎপাদনে নির্মাণ করেছেন আধুনিক স্লটার হাউজ (কসাইখানা)। এক অনলাইন আলোচনায় তাঁর এসব উদ্যোগের কথা জানা যায়।

মহিষ ও ভেড়া নিয়ে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ এবং কিছু প্রতিষ্টানের মাধ্যমে প্রকল্প প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা হলেও কৃষিসংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তেমন কোন গবেষণা বরাদ্দ দেখা যায় না। সরকারের এসব বড় বড় প্রকল্পে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সম্পৃক্ত করলে গবেষণা আরও তরান্বিত হত পাশাপাশি মহিষ ও ভেড়ার উৎপাদনে দক্ষ গ্রাজুয়েট ও টেকসই প্রযুক্তি উদ্ভাব্ন করা সম্ভব হত।

বিগত কয়েক বছরে মহিষ ও ভেড়ার উৎপাদন বাড়লেও বাজারে এসবের মাংসকে এখনও জনপ্রিয় করা যায়নি। ভেড়া ও মহিষের মাংস ছাগল ও গরুর মাংস হিসেবে বিক্রির প্রবণতা এখনও রয়ে গেছে। এসব মাংসের প্রতি অনীহা এবং পুষ্টির বিষয়ে মানুষের অজ্ঞতাও কম নয়। উৎপাদন বাড়ার পাশাপাশি তাদের মাংসকে জনপ্রিয় করতে তুলতে না পারলে লালনপালন লাভজনক হবে না। সরকারী ও বেসরকারীভাবে প্রচারণা এবং বিদেশে রপ্তানির করার উদ্যোগ গ্রহণ করলে এই সম্ভবনাময় খাতটি ঘুড়ে দাঁড়াতে পারে।

 

প্রফেসর ড. মোঃ সহিদুজ্জামান, লেখক ও গবেষক
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়
szaman@bau.edu.bd

  •  
  •  
  •  
  •