চিকিৎসার নামে নির্যাতনে পুলিশ কর্মকর্তার মৃত্যু ও আমাদের মূল্যবোধ

ড. মোঃ সহিদুজ্জামান

রাজধানী ঢাকার আদাবরে একটি মানসিক হাসপাতালে (মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্র) ভর্তিকৃত একজন সিনিয়র পুলিশ কর্মকর্তাকে পিটিয়ে হত্যা করেছে বলে খবরে প্রকাশিত হয়েছে। এ সংক্রান্ত একটি ভিডিও ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। নানা মহলে এ নিয়ে চলছে সমালোচনা ও পর্যালোচনা। সোমবার সকালে ভর্তির পর কয়েক মিনিটের মধ্যেই মারা যান সেই পুলিশ কর্মকর্তা। পরিবারের অভিযোগ, ভর্তির পরপর হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তাঁকে পিটিয়ে হত্যা করেছে। এ বিষয়ে পুলিশ ও পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা হয়েছে এবং অভিযুক্তদের গ্রেফতারও করা হয়েছে। তদন্ত চলছে। হয়তবা পুরো বিষয়টি আরও পরিস্কার হয়ে জনসম্মুখে আসবে।

জানা যায়, জ্যেষ্ঠ সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) আনিসুল করিম ৩১তম বিসিএসের পুলিশ ক্যাডারে প্রথম স্থান অধিকার করেন। তিনি সর্বশেষ বরিশাল মহানগর পুলিশে কর্মরত ছিলেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাাণরসায়ন ও অণুপ্রাণবিজ্ঞান বিভাগের ৩৩ ব্যাচের ছাত্র ছিলেন তিনি। এমন একজন মেধাবী পুলিশ অফিসারকে হত্যার অভিযোগ নিঃসন্দেহে আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, মনুষত্ববোধ ও মূল্যবোধের অবক্ষয়ের ভয়াবহতা প্রমান করে। পরিচয় পাওয়ার পর এভাবে একজন পুলিশের জেষ্ট কর্মকর্তাকে চিকিৎসা বা নিয়ন্ত্রণের নামে বর্বরতা আমাদের শঙ্কাকে আরো বাড়িয়ে তুলেছে।

হাসপাতালটির স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর এবং মানসিক চিকিৎসার হাসপাতাল পরিচালনার জন্য যেসব লাইসেন্স দরকার হয় তার কোনটিই নেই বলেও সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয় পুলিশের পক্ষ থেকে। ভিডিও ফুটেজে যারা আনিসুল করিমকে টেনে হিঁচড়ে ওই বিশেষ কামরাটিতে নিয়ে যায় তারা কেউই চিকিৎসক ছিলেন না। এদের মধ্যে চার জন ওয়ার্ড বয়, দুজন সমন্বয়কারী, আর কয়েকজন পরিচ্ছন্নকর্মী ছিল বলে পুলিশের সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করা হয়। ভাইরাল হওয়া ভিডিওটিতে দেখা যায়, সেখানে সবাই মিলে আনিসুল করিমকে উপুড় করে ফেলে চেপে ধরে রেখেছে। কেউ আঘাত করছে। এক পর্যায়ে আনিসুল করিমের মুখে পানি ছেটাতে দেখা যায়। পরে সাদা রঙের অ্যাপ্রোন পরা এক নারী কক্ষে প্রবেশ করেন এবং মিডিয়ার বক্তব্য অনুযায়ী সেখানে আনিসুল করিমের রক্তচাপ পরীক্ষা করা হয় এবং বুকে চেপে সিপিআর দিতে দেখা যায়। কিন্তু তাতেও সাড়া দেননি তিনি। তাহলে কি তিনি সেখানেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছেন?

ভর্তি করানোর সময় আনিসুল করিম যদি অস্বাভাবিক বা উচ্ছৃঙ্খল আচরন না করে থাকেন তাহলে ওভাবে হাত পা বেঁধে মধ্যযুগীয় কায়দায় বিশেষ রুমে নিয়ে যাওয়ার কি কারণ তা খুঁজে বের করা উচিত। যদিও হাসপাতাল (মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্র) কর্তৃপক্ষ বলছে, উচ্ছৃঙ্খল আচরণ করায় তারা পুলিশ কর্মকর্তাকে শান্ত করার চেষ্টা করেছিল এবং নিজেকে ও অন্যকে যাতে আঘাত করতে না পারেন তার জন্য ওই কক্ষে নিয়ে গিয়ে শুইয়ে দেয়ার সময় অজ্ঞান হয়ে যান তিনি। কিন্তু একজন মানসিক রোগীকে এই বর্বর পন্থায় ধরে নিয়ে, মারধর করে জোড় পূর্বক শুইয়ে দেয়ার যে চিত্র ভিডিওতে দেখা গেছে তা হিউম্যান ইথিক্স বা মেডিকেল ইথিক্স এবং ট্রিটমেন্ট প্রটোকলের মধ্যে পড়ে কি না তাও খতিয়ে দেখা দরকার।

হৃদরোগ ইনিস্টিটিউট থেকে মাইন্ড এইড হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সময় এবং ভর্তি প্রক্রিয়ার সময় তিনি স্বাভাবিক ছিলেন বলে খবরে প্রকাশিত হয়। হঠাৎ করে এমন কি ঘটল যে তার আচরণ অস্বাভাবিক ও উচ্ছৃঙ্খল হয়ে গেলে, কোন কিছু না বলে হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারিদের মারধর শুরু করলেন পুলিশ অফিসার- এমন অভিযোগের কতটুকু ভিত্তি আছে? এমন কি কায়দায় তারা নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করল যে তারা রোগীকে একবারেই চিরদিনের জন্য নিস্তেজ করে দিল। যারা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে তা কি আদৌ মানসিক রোগী নিয়ন্ত্রণে প্রশিক্ষনপ্রাপ্তÍ নাকি সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে প্রশিক্ষনপ্রাপ্ত । এসব প্রশ্ন থেকেই যায়।

বলা যায় এসব কর্মচারী-কর্মকর্তা নামের সন্ত্রাসীদের পুষে থাকে অনেক হাসপাতাল। তাদেরকে হয়তবা এসব নির্দেশনা দেয়া থাকতে পারে। এভাবে তারা অভ্যস্ত। এটাই হয়ত তাদের নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি। হয়তবা এসব কাজ তারা প্রতিনিয়ত এভাবে করায় এবং কোন বাঁধার বা জোড়ালো প্রতিবাদের সম্মুখীন না হওয়ায়, মিডিয়াতে প্রকাশ না পাওয়ায়, ভিডিও ভাইরাল না হওয়ায়- কে সাধারণ মানুষ আর কে বিশেষ শ্রেণির মানুষ তাদের মাথায় কাজ করে না। আর তাদের নিষ্ঠুর নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির যাতাকলে পড়ে দূর্ভাগ্যক্রমে অনেকের মতই জীবন দিতে হল সেই পুলিশ কর্মকর্তাকে।

বেসরকারী হাসপাতালগুলো বিভিন্ন মাধ্যমে রোগী বাগিয়ে নিয়ে সেবার নামে প্রতারনা করার অভিযোগ নতুন কিছু নয়। বিশেষ করে সাধারণ মানুষ সচারচর তাদের প্রতারণা ও বঞ্চনার শিকার হচ্ছে। হাতিয়ে নিচ্ছে প্রয়োজনের মাত্রতিরিক্ত অর্থ। তাদের প্রতারণার শিকার হয়ে অনেক হারান সহায়- সম্পতি কখনও বা জীবন। আবার কেউ স্বজনদের হারিয়েও রেহাই পান না। সরকারি হাসপাতালগুলো থেকে রোগী বাগিয়ে নেয়ার জন্য এসব বেসরকারী হাসপাতাল বা স্বাস্থ্য সেবা ও নিরাময় কেন্দ্রগুলোতে দালাল নিয়োগ দেওয়া থাকে, তাদের থাকে বিশেষ চক্র এমনকি সিন্ডিকেট। অ্যাম্বুলেন্স ও অটোরিক্সা চালক থেকে শুরু করে চিকিৎসক পর্যন্ত অনেককেই এই সিন্ডিকেট বা চক্রের সাথে জড়িত থাকতে দেখা যায় যার প্রমান আমরা নিকট অতীতেই দেখেছি।

আমাদের দেশের আইন শৃঙ্খলা বাহিনীতে অনেক অনেক দক্ষ অফিসার আছেন যাঁরা নিরলস ভাবে পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। অনেক মেধাবী এখন এসব পেশায় এসে দেশের মানুষের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন, চেষ্টা করে যাচ্ছেন। যাদের অবদানে দেশে জঙ্গী দমন, যে কোন জঠিল পরিস্থিতিতেও অপরাধীকে ধরা, করোনায় সাধারণ মানুষের পাশে দাড়ানো সহ নানা ঝুঁকিপূর্ণ কাজ বিচক্ষণতার সাথে করে যাচ্ছেন তার নিদর্শন আমরা অনেক দেখেছি এবং দেখছি। তাদের যেমন সীমাবদ্ধতা আছে সেটিও যেমন সত্য তেমনি কিছু পুলিশ সদস্যের অপকর্মে তাদের অনেক ভাল কাজগুলো ঢাকা পড়ে যায়। এই বাহিনীর একজন মেধাবী অফিসারকে চিকিৎসা ব্যবস্থার নামে মেরে ফেলা জাতির জন্য নিঃসন্দেহে অশনিসংকেত।

দেখা গেছে, বিশ্বস্ত ও শক্তিশালী কোন মাধ্যমে বা সুপারিশে অথবা নিজস্ব প্রতিষ্ঠানের মাধমে না গিয়ে সাধারণভাবে বা ব্যক্তিগতভাবে চিকিৎসার জন্য গেলে প্রতারিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে অনেক হাসপাতালে। দেশের বিদ্যমান পরিস্থিতি ও বাস্তবতায় এটি করা প্রয়োজন যদি কারও সুযোগ থাকে। পুলিশ কর্মকর্তার পরিবার এক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানিক সহায়তা আগে থেকে নিলে হয়ত ভাল হত।

মানুষের নৈতিক মূল্যবোধের অভাব, সামাজিক অবক্ষয় ও বিচার ব্যবস্থায় দ্রুত ও কার্যকরী পদক্ষেপের অভাবে দেশে প্রতিনিয়ত কোন না কোন দূর্ঘটনা ঘটছে বলে অনেকেই মনে করেন। সমাজের অসুস্থ অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা, অর্থ ও ক্ষমতার সাথে মানুষের অবস্থানের মূল্যায়ন দেশ ও জাতিকে এক অজনা গন্তব্যের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। খোজ নিলে এরকম হয়ত অনেক কথিত সেবাকেন্দ্র পাওয়া যাবে যারা অর্থের জন্য এসব অনৈতিক ও বর্বর কাজ করছেন যা অনেক সময় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও মিডিয়াতে দেখা যায়। অনেক হাসপাতাল বা রিহ্যাব সেন্টারে কোন চিকিৎসা দেওয়ার নামে মারধর করা হয় হয়। তাদের কোন স্পেশালিষ্ট ডাক্তার থাকেনা। এসব রিহ্যাব সেন্টারগুলোতে সরকারের নজরদারি করা উচিত।

এসব নিষ্ঠুর নির্যাতনের ঘটনা বিভিন্ন রিহ্যাব সেন্টারগুলোতে হয়ত নতুন কিছু নয়। দূর্ভাগ্যক্রমে মৃত হলে বিশেষ করে ক্ষমতাবান মানুষ বা বিশেষ পেশা বা শ্রেণির কারো মৃত হলে বিষয়গুলো গুরুত্ব সহকারে বেড়িয়ে আসে। আসামীদের পরিনাম অনেকদুর পর্যন্ত ও গড়ায়। শেষমেষ কি হয় তা হয়ত অনেকক্ষেত্রে জানা যায় না। মিডিয়া বা জনগনের সোচ্ছারেও ভাল ফল পাওয়া যায় অনেক ক্ষেত্রে। কিন্তু স্বাভাবিক নিয়মে ও সমানগুরুত্বে সবকিছু চললে হয়ত একদিন এসব নিয়ন্ত্রন করা সম্ভব হবে।

আমাদের দেশে দেখা যায়, ঘটনা ঘটার পর আমরা ব্যবস্থা নেই এবং কিছুদিন এটি নিয়ে বিভিন্ন মহলকে সরব থাকতে দেখা যায়। তারপর আবার আগের অবস্থায় চলে যায়। দুর্ণীতিবাজ ও নির্যাতনকারীরা আবার স্বাভাবিক হয়ে যায়। অথচ প্রতিটি বিষয়ের মনিটরিং ও নিয়ন্ত্রণের জন্য রয়েছে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং বেতনভোগী জনবল। তারা যদি তাদের দ্বায়িত্ব সঠিকভাবে ও সময়মত পালন করেন তাহলে এরকম অনেক অনাকাঙ্খিত ঘটনা থেকে রেহাই পাওয়া সম্ভব।

প্রফেসর ড. মোঃ সহিদুজ্জামান
লেখক ও গবেষক

  •  
  •  
  •  
  •