করোনায় শিক্ষার্থীদের মানসিক অবস্থা
ড. মোঃ সহিদুজ্জামান
করোনায় সারা বিশ্ব যখন বিপর্যস্ত তখন দেশে শিক্ষার্থীদের মানসিক অবস্থা নিয়ে আমরা কতটুকু ভাবছি। অর্থনীতিকে সচল রাখতে সরকার প্রায় সবকিছু খুলে দিলেও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সংগত কারণে বন্ধ রেখেছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় ও খোলার অনিশ্চিয়তায় মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হচ্ছে আমাদের শিক্ষার্থীরা। অনেক শিশুর মানসিক ও অভ্যাসগত পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে যা বিভিন্ন জরিপে উঠে এসেছে।
সবচেয়ে খারাপ অবস্থা পার করছে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা। তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের উম্মুক্ত পরিবেশে যেখানে সময় কাটাত, পড়াশোনার পাশাপাশি বিভিন্ন চাকরির জন্য প্রস্তুতি নিতে ও পরীক্ষা দিতে পারত, টিউশনি করে দুটো পয়সা পেত- তাতে হঠাৎ পরিবর্তন ও তা দীর্ঘায়িত হওয়ায় মানসিক ও আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। ক্যারিয়ারের ভাবনায় অনেকে অস্থির সময় পার করছে। অনেকে আবার অর্থনৈতিক দৈন্যতায় পড়ে বিকারগ্রস্থ হচ্ছে।
শিক্ষার্থীরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন সমস্যার কথা বলে স্টাটাস দিচ্ছে প্রতিনিয়ত। তাদের কষ্ট ও ভাবনাগুলো শেয়ার করছে এইসব প্লাটফরমে। পরিবারের অসচ্ছলতা দেখে অনেক শিক্ষার্থী বাবা মায়ের কাছে হাতখরচটুকু চাইতে পারছে না। না পারছে কোন কিছু করতে, না পারছে সইতে, ফলে অনেকটাই ডিপ্রেশনে ভুগছে তারা। করোনার চেয়ে এই অবস্থাকে তারা বেশি আতঙ্ক মনে করছে। লকডাউন পরবর্তী সময় তারা কিভাবে গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট করবে? করোনা পরবর্তী পরিস্থিতি কি আবার স্বাভাবিক হবে! এইগুলো নিয়ে শিক্ষার্থীদের মাঝে ভেসে আসছে নানা দুশ্চিন্তা। যেখানে এসব শিক্ষার্থী দিন গুনত পাশ করে পরিবারকে সাপোর্ট দিবে, ভবিষ্যত গড়ে তুলবে, সেখানে হতাশা তাদের তাড়া দিয়ে বেড়াচ্ছে।
প্রতিষ্ঠান খুলতে না খুলতেই করোনার দ্বিতীয় ওয়েব চলে এসেছে। সংক্রমন ও মৃত্যুর হার উর্ধ্বমুখী হচ্ছে সারা বিশ্বে। এমতবস্তায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলা যদিও যৌক্তিক হবে না তথাপিও আমাদের বসে থাকলে চলবে না। বিকল্প চিন্তাধারায় ফলপ্রসু সমাধান নিয়ে আসার চেষ্টা করতে হবে সকলে মিলে।
বিদ্যমান অবস্থায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ দীর্ঘায়িত হলে প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকরী কোন পরিকল্পনা আছে কি না তাও স্পষ্ট নয় শিক্ষার্থীদের কাছে। শিক্ষার্থীরা অনিশ্চয়তা ও মানসিক বিপর্যস্ততার মধ্যে আর থাকতে চায় না। এমন অবস্থায় কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া বিশেষ করে অনার্স ও মাস্টার্স শেষ বর্ষের শিক্ষার্থীরা আর সহ্য করতে না পেরে অনেকে বাসা থেকে বেড়িয়ে পড়েছে। চাকরি ও মানসিক প্রশান্তির জন্য বাড়ি ছেড়ে অন্য জায়গায় গ্রুপ করে থাকছে। মানসিক কষ্ট ও অনিরাপত্তার কথা মাথায় নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় পার্শ্ববর্তী জায়গায় মেস করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চাকরির প্রস্তুতি ও গবেষণার কাজ করছে। এতে অনেকের ল্যাপটপ চুরি ও ছিনতাইরের মত ঘটনা ঘটছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বন্ধ থাকায় আবাসিক হলে তাদের জায়গা দিতে পারছে না কর্তৃপক্ষ। সব মিলিয়ে আমাদের শিক্ষার্থীরা চরম দূর্দিন পার করছে।
আবার অনলাইন কার্যক্রম চালু হলেও অনেকের সঠিকভাবে ক্লাস বুঝতে না পারা এবং মনোযোগ না থাকা, ডাটা কিনার সামর্থ না থাকা এবং ইন্টারনেটের গতির সমস্যা থাকায় তা কার্যকর হচ্ছে না বলে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর অনেকেই মত দিচ্ছেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। এদিকে গ্রামে যারা বাস করেন তারা অনলাইন ক্লাস করার তেমন সুযোগই পাচ্ছেন না।
শিক্ষার্থীরা মনে করছেন করোনাকে সাথে নিয়েই তাদের পথ চলতে হবে। জীবন গড়তে হবে। গড়তে হবে ভবিষ্যত ।
তাহলে উপায় কি? করোনাকাল যদি দীর্ঘায়িত হয়, পরিস্থিতি যদি আগের অবস্থায় ফিরে না আসে তাহলে কি হবে? একদিন না একদিন তো প্রতিষ্ঠান খুলতে হবে। করোনা বা অন্যান্য মহামারীর কথা মাথায় রেখে আমরা কি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে সেভাবে প্রস্তুত করছি বা করতে পারছি? আমরা কি শিক্ষা ব্যবস্থায় পরিবর্তনের কথা ভাবছি? এসব প্রশ্ন এখন অনেকের মনে।
এসব বিষয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে কোর্সে পরিবর্তন আনা বা কমানো, সেমিস্টারের পরিবর্তন, অনলাইন ও অফলাইন ক্লাস ও পরীক্ষা চালু রাখা, মূল্যায়ন পদ্ধতির পরিবর্তন সহ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। সর্বোপরী শিক্ষার্থীদের সার্টিফিকেট প্রদান অব্যাহত রাখতে হবে ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সকলে মিলে কাজ করতে হবে। উচ্চশিক্ষাকে সীমিত করে কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষার্থীদের মনোনিবেশ করতে জোরালো উদ্যোগ নিতে হবে। আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টিতে তরুন প্রজন্মকে উজ্জীবিত করতে হবে।
শিক্ষার্থীদের অভ্যাসগত পরিবর্তনের খারাপ দিকগুলো কতটুকু খারাপ করছে তা আমাদের এখনই ভাবতে হবে। করোনায় মানসিক স্বাস্থ্য ও মনস্তাত্ত্বিক বিষয়ে ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রক্ষা পেতে পজিটিভ পরিবর্তনগুলোকে আমরা কাজে লাগাতে পারি। একজন শিক্ষার্থী কিভাবে এগুলো মোকাবিলা করবে এবং কিভাবে সে সোশাল মিডিয়া থেকে নিজেকে দুরে রাখতে পারে এ বিষয়ে পরিবার ও প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ করতে পারে। করোনা আমাদের পরিবার ও সমাজের সাথে যে একটা রিলেসন ডিভলোপ করার সুযোগ করে দিয়েছে তা কাজে লাগাতে হবে। পরিবারের কাছে থেকে পরিবারের কাজগুলো করা যেতে পারে। প্র্যাতহিক রুটিন করে সময়গুলোকে কাজে লাগানো যেতে পারে। নিয়মিত ঘূম থেকে উঠা, নিয়মিত কাজগুলো করা, দৈনদিন রুটিন অনুযায়ী ব্যায়াম বা শারীরিক পরিচর্যা শিক্ষার্থীদের মাঝে মানসিক যে একটা চাপ তা থেকে কিন্তু তারা কিছুটা হলেও প্রশান্তি পেতে পারে। সোশাল মিডিয়াতে কতটুকু সময় দিবে এটাও তাদের নিয়মের উপর পড়বে। এগুলো সব তাদের নিজের ইচ্ছার উপর বহাল থাকবে। পাশাপাশি সময় মত খাবার খাওয়া, পড়াশুনা করা এগুলো শিক্ষার্থীদের মাঝে মানসিক অবসাদ গড়ে তুলবে বলে মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন।
শিক্ষার্থীদের মাঝে যখন দুশ্চিন্তা গ্রাস করে তখন সেই শিক্ষার্থী যেগুলো দুচিন্তা বাড়াতে পারে সেগুলো থেকে যথাসম্ভব বিরত থাকা উচিত বলে মনে করেন মনোবিজ্ঞানীরা। যেমন- সোশাল মিডিয়াতে বেশি সময় ব্যয় করার ফলে কোভিড-১৯ ও তার পরবর্তী বিরুপ ও বিভ্রান্তিকর অনেক তথ্য পেয়ে থাকে শিক্ষার্থীরা । এতে করে তাদের মানসিক চাপ বেড়ে যাচ্ছে, তারা ভয়ে দুশ্চিন্তা গ্রস্থ হচ্ছে।
শিক্ষার্থীদের মতে তারা বই পড়া, নাটক ও মুভি দেখা, ব্যায়াম করা সহ নানানভাবে তাদের মনকে শান্ত রাখার চেষ্টা করেন। সবকিছু করার পরও তার মানসিক যে একটা ক্রিয়া সেটা রয়ে যায়। তাদের দুচিন্তা একটাই- ক্যারিয়ার বা ভবিষ্যৎ ।
এই করোনায় সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে বলে মনে করছেন শেষ বর্ষের শিক্ষার্থীরা। ইতিমধ্যেই তারা গ্রাজুয়েশন শেষ করে চাকুরী জীবনে প্রবেশ করা সুযোগ পেত, কিন্তু সেই সুযোগটি করোনার কারনে হচ্ছে না। বিশ্ববিদ্যালয় ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে অনুধাবন করবেন। যে কোন ভাবে, যে কোন সিস্টেমে তাদেরকে মূল্যায়ন করে সাটিফিকেট দেয়ার ব্যবস্থা করলে অন্ততপক্ষে তাদের যে মানসিক চাপ সেটি হয়তো কেটে যাবে।
সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে জীবন চলার পথ আবারও সুন্দর হবে এই প্রত্যাশা আমাদের সকলের।
প্রফেসর ড. মোঃ সহিদুজ্জামান
লেখক ও গবেষক

