রাজশাহীর মতিহার থেকে আমেরিকার বল স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়

ড. রহমতউল্লাহ ইমন:
২০০৭ সালের অক্টোবরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লিয়েন ছুটিতে আমি মালয়েশিয়ার পুত্র (পুত্রা) বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রফেসর পদে যোগদান করি। ওরা আমাকে নিয়োগ দিয়েছিলেন ৩ বছরের জন্য, যা ভবিষ্যতে নবায়নযোগ্য। মাস তিনেক কাজ করেছি। ডিসেম্বরে সেমিস্টার ব্রেক। ৩১ এর রাতে আমার পুত্র অদ্রি বায়না ধরল থার্টি ফার্স্ট নাইট দেখতে পুত্রজায়াতে যাবে।
ওখানে নাকি খুব ধুমধাম করে ইংরেজি নতুন বছরকে স্বাগত জানানো হয়। আয়োজিত হয় সুন্দর কার্নিভাল আর নয়নাভিরাম ফায়ার ওয়ার্কস। আমি যেতে চাইলামনা, আমার এক উজবেক সহকর্মী আর তার বাচ্চাদের সাথে অদ্রি গেল পুত্রজায়াতে। কিন্তু ও না ফেরা অবধি তো রাতে ঘুমাতে পারছি না। কম্পিউটার অন করে বসলাম, সময় কাটাতে হবে। তখনো ফেসবুকের স্বাদ পাইনি। কী করে সময় কাটাই? এটা ওটা করতে করতে একবার ঢু মারলাম আমেরিকার বল স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবপেজে যেখানে ২০০৪-০৫ আমি ভিজিটিং প্রফেসর পদে কর্মরত ছিলাম। এমনি দেখার জন্য কে কোথায় কেমন আছে? হঠাৎ করেই চোখে পড়ল গাণিতিক বিজ্ঞান বিভাগে পরিসংখ্যান শাখায় সহকারী/সহযোগী অধ্যাপক পদে বিজ্ঞপ্তি হয়েছে, আর ৩১ ডিসেম্বরই ছিল আবেদন পাঠানোর শেষ দিন।
ডেডলাইন পেরিয়ে গেছে দেখে মনটা একটু খারাপ তো হলো অবশ্যই। আর সময় থাকলেও যে আবেদন করতাম এমন তো নয়-মনকে প্রবোধ দিলাম। আমেরিকায় থেকে সেখানে পিএইচডি করেই কতজন ফ্যাকাল্টি পদে চাকরি পাচ্ছেন না। আর আমি তো বাংলাদেশের এক মফস্বলের মাস্টার।
নতুন বছরের শুরু হলো আতশবাজির ঝলকানির ভেতর দিয়ে। বারান্দায় দাঁড়িয়ে সেই মনোরম দৃশ্য অবলোকন করতে করতেই হঠাৎ মনের মাঝে খেলে গেল আরে এখানে নতুন বছর শুরু হলেও আমেরিকা তো অনেক পিছিয়ে-সেখানে তো এখনো ৩১ ডিসেম্বর শেষ হয়নি। কী যে মনে হলো-তৎক্ষণাৎ মেইল করলাম সার্চ কমিটির সভাপতি প্রফেসর ডেল আমবাককে।
সেই এক বছর ভিজিটিং প্রোগ্রামের সুবাদে ডেলের সাথে একটা হৃদ্যতা হয়েছিল। উনি খুব স্নেহ করতেন আমাকে। মেইল পেয়েই জবাব দিলেন তোমার হাতে মাত্র একঘণ্টা সময় আছে আবেদন করার। আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ সব কাগজের স্ক্যান কপি ছিলই। সেগুলো দিয়ে মেইল করে দিলাম আর উনাকে জানিয়ে দিলাম যে, আমি কালকেই DHL এর মাধ্যমে হার্ডকপিগুলো পাঠিয়ে দিচ্ছি। এভাবেই বলা যায় একেবারেই দৈবচক্রে বল স্টেটে আমার আবেদন করা। কোন আশা নেই-ভরসা বলতে সেখানে ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে এক বছর কাজ করার অভিজ্ঞতা।
বল স্টেটে আবেদনের পর কেটে গেল বেশ কিছুদিন। আমি একথা প্রায় ভুলতেই বসেছিলাম। এর মাঝে হঠাৎ করেই প্রফেসর আমবাকের ফোন এল। আমি নাকি শর্ট লিস্টেড হয়েছি, সার্চ কমিটি টেলিফোনে আমার ইন্টারভিউ নেবে। সপ্তাহ খানেকের মাঝে ইন্টারভিউ হয়ে গেল। এরপরে বিভাগের সভাপতি প্রফেসর জন এমার্ট ফোনে সাক্ষাৎকার নিলেন। সাক্ষাৎকার নিলেন কলা, বিজ্ঞান ও মানবিক অনুষদের ডীন প্রফেসর মাইকেল ম্যাজিয়েটো। সপ্তাহখানেক বাদে সভাপতি মহোদয়ের ফোন এল-আমাকে বিভাগের সহযোগী অধ্যাপকের স্থায়ী পদের জন্য নির্বাচন করা হয়েছে।
আমি সেই আমন্ত্রণ গ্রহণ করছি কি না? সেই সাথে তিনি আরও জানতে চাইলেন বছরে আমি কত বেতন প্রত্যাশা করি? আমি তো ভীষণ অবাক। সারাজীবন চাকরি করেছি যেখানে ‘বিধি মোতাবেক’ বেতন দেওয়া হয়। বেতন আবার চেয়ে নেওয়া যায় নাকি? নিয়োগের খবর পেয়ে যদিও খুশি হয়েছিলাম, তবুও একটু ভাব নিয়ে বললাম আমি কী একদিন পরে আমার সিদ্ধান্ত জানাতে পারি? সভাপতি রাজি হলেন।
এবার পরিচিত মহলে খোঁজ লাগালাম। গুগল করে দেখলাম বল স্টেটে বেতন কড়ি কেমন? পরদিন সভাপতি মহোদয় আবার ফোন দিলেন। আমি বেতনের ব্যাপারে একটি সংখ্যা ভেবে রেখেছিলাম। কিন্তু তা বলতে যেয়েও কী মনে করে তাকে বললাম দেখুন, আমাদের সংস্কৃতিতে বেতন চেয়ে নেওয়ার রেওয়াজ নেই। আমাদের যোগ্যতা অনুযায়ী নিয়োগকর্তা বেতন ঠিক করে থাকেন। এটা আপনিই বলুন। উনি রাজি হলেন না। এবার আমি বললাম, ধরুন আমার জায়গায় আপনি থাকলে কত বেতন প্রত্যাশা করতেন? জন এমার্ট এবার হেসে ফেললেন। বললেন, ইমন, তুমি আমাকেই বিপদে ফেলে দিলে? তারপর বেশ ভেবেচিন্তে বললেন, আমি এর ওপরে উঠতে পারব না। তিনি যে সংখ্যাটি বললেন আমি নিজে চাইলে হয়তো তার থেকে অন্তত ১০ হাজার ডলার কম চাইতাম। যাকে বলে হ্যাপি এন্ডিং-মধুরেণ সমাপয়েৎ।
এত গেল চাকরি পাওয়ার কাহিনী। কিন্তু ঠিক কী কারণে ওরা আমাকে মনোনীত করেছিল, তা জেনেছিলাম কাজে যোগদানের পর। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছিল আমার প্রকাশনা আর এক বছর বল স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিজিটিং প্রফেসর হিসাবে কাজ করার অভিজ্ঞতা। বল স্টেটে যোগদানের আগে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জার্নালে আমার প্রকাশনার সংখ্যা ছিল ৫৫। অনেকের দৃষ্টিতেই এই সংখ্যা খুবই নগণ্য।
মালয়েশিয়াতে দেখছি অনেক প্রফেসর মাত্র ১ বছরেই শতাধিক প্রকাশনা করছেন। তবে আমি যে বিষয় নিয়ে কাজ করতাম এবং আমার যা যোগ্যতা তাতে আমি এই সংখ্যায় এবং কাজের মান নিয়ে সন্তুষ্ট ছিলাম। বল স্টেটে আমার ভিজিটিং প্রোগ্রামকে আমি খুব গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করেছিলাম। এটা আমার কাছে নিছক বেড়াতে আসা বা নতুন একটা দেশ দেখতে আসা ছিল না, ছিল একটি বছর উন্নত একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে যতটা সম্ভব শিক্ষা নিয়ে নিজেকে ঋদ্ধ করার। আমার কাছে এটা ছিল একটা মিশন।
আমেরিকায় ওই দশমাস আমি যা পরিশ্রম করেছি একমাত্র পিএইচডির সময় ছাড়া জীবনে আমি আর এমন পরিশ্রম করিনি। দুই সেমিস্টারে আমাকে ৬টি কোর্স পড়াতে হয়েছে। এর মধ্যে কেবলমাত্র রিগ্রেসন কোর্সটিই আমি দেশে পড়িয়েছি-তার আবার অর্ধেক টাইম সিরিজ যা কখনো পড়াইনি। এ ছাড়া পড়াতে হয়েছে ডিজাইন, স্যামপ্লিং, রিসার্চ মেথডস এবং ক্যালকুলাস ১ ও ২। এই ৫টি কোর্সের কোনটিই আমি দেশে থাকতে পড়াইনি।
এখানে পড়ানোর ধরনটাও একদম আলাদা। দেশে বড় বড় থিওরি আর তার প্রমাণ করেই আমরা ক্লাসের সিংহভাগ সময় অতিবাহিত করেছি, কিন্তু এখানে ক্লাস শুরু হয় বাস্তব উদাহরণ দিয়ে। বাস্তবজগতের অনেকগুলো উদাহরণ টেনে তার সমাধানের পদ্ধতিগুলো জেনারালাইজ করে থিওরি দাঁড় করানো হয়। আর এই কারণে এ দেশের ছেলেমেয়েরা মুখস্ত বিদ্যায় আমাদের দেশের ছেলেমেয়েদের তুলনায় দুর্বল হলেও প্রবলেম সল্ভার হিসেবে অনেক ভালো। এরা খুব সহজে তত্ত্বের সাথে বাস্তবতার সংযোগ ঘটাতে পারে, যা আমাদের দেশে অনেকটাই অনুপস্থিত।
দেশে আমি যথেষ্ট খেটে পিটেই পড়াতাম, তবে কখনো লেকচার নোট তৈরি করে ছাত্রদের দেইনি। এখানে দেখলাম প্রায় শিক্ষকই ক্লাসে যা পড়াবেন তার নোট আগাম ছাত্রছাত্রীদের দিয়ে দেন। এ দেশের শিক্ষকেরা কীভাবে পড়ান সেটা বোঝার জন্য আমি যখন যার ক্লাস পেতাম, সেখানেই বসে যেতাম। গড়ে প্রতিদিন ৩ থেকে ৪টি ক্লাসে বসতাম। বলতে কোনো সংকোচ নেই, এসব ক্লাস থেকে আমি অনেক কিছু শিখেছি। বাসায় কম্পিউটার ছিল না। তাই সকাল ৭টায় বিভাগে আসতাম আর ফিরতাম রাত ৮টা-৯টার দিকে। শনি রবি ছুটি-কিন্তু আমি এই দুইদিনও বিভাগে আসতাম।
আমি থাকতাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসনেই, যা মূল ক্যাম্পাস থেকে ৩ কিলোমিটারের একটু বেশি দূরে। আমাদের গাড়ি ছিল না। যাতায়াত করতাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শাটল বাসে। শনি রবি সহ ছুটির দিন শাটল বাস বন্ধ। রবিবারে ওই রুটের সিটিবাসও বন্ধ। কিন্তু আমাকে বিভাগে যেতেই হবে। সুতরাং শ্রীচরণ ভরসা।
৬ কিলোমিটার হাঁটা এমন কোনো বড় ব্যাপার নয়-কিন্তু যারা আমার শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে অবগত তারা বুঝতে পারছেন আমার জন্য এটা কতটা কঠিন ছিল। শীতের সময় হিমাংকের ১০ বা ১৫ ডিগ্রি নিচের তাপমাত্রায় ভারি জ্যাকেট গায়ে এক হাটু বরফ পেরিয়ে পেঙ্গুইনের মতো থপ থপ করে পথ পাড়ি দিতে হতো। তুষারপাতের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো এই যে বরফের নিচের গভীরতা সবসময় আন্দাজ করা যেত না। কখনো কখনো বিপজ্জনকভাবে বরফের গর্তে পড়েও গিয়েছি। কিন্তু বিভাগে যেতেই হবে।
প্রতিটা মুহূর্তই ছিল আমার কাছে ভীষণ মূল্যবান। আমাকে সুনামের সাথে পড়াতেই হবে। এর সাথে শুধু ব্যক্তি আমার নয়-দেশের মান সম্মান জড়িত। মীর মাসুম আলী স্যার বড় মুখ করে একদম অপরিচিত আমাকে এই সুযোগ করে দিয়েছিলেন- আমার কারণে তাঁর মাথা যেন হেঁট না হয়ে যায়।
আমি যেহেতু ভিজিটিং প্রোগ্রামে গিয়েছিলাম, চাইলেই আমি ছাত্রদের ক্লাস মূল্যায়নের থেকে রেহাই পেতে পারতাম-আমার জন্য এটা ছিল ঐচ্ছিক। কিন্তু আমি স্বেচ্ছায় এই চ্যালেঞ্জকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম। যদিও বেইজ্জতির সমূহ আশঙ্কা ছিল। কিন্তু আমি আমার দুর্বলতাগুলো জানতে খুবই আগ্রহী ছিলাম। আমাকে সৌভাগ্যবান বলতেই হবে, কেননা ওই ৬টি কোর্সের প্রত্যেকটিতে আমার মূল্যায়ন স্কোর ছিল খুবই উচু স্তরে এবং ছাত্রছাত্রীরা অনেক সুন্দর সুন্দর মন্তব্য করেছিল আমার ক্লাস সম্পর্কে।
তৎকালীন বিভাগীয় সভাপতি প্রফেসর আমবাককে আমিই আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম দুইবার আমার ক্লাস পরিদর্শনের জন্য। এ সংক্রান্ত একটি রিপোর্ট প্রফেসর আমবাক দিয়েছিলেন, যেখানে তিনি আমার ক্লাস সম্পর্কে ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন। এই দুই সেমিস্টারে আমি বিভাগে দুটি সেমিনার দিয়েছিলাম যাও বেশ প্রসংশিত হয়েছিল। ডীন ম্যাজিয়েটো ফোনে আমাকে বলেছিলেন যে মাত্র এক বছর ভিজিটিং প্রোগ্রামে থাকার সময় ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে আমি যে ধরনের উচ্চ মূল্যায়ন লাভ করেছিলাম, তা দেখে উনি বিস্মিত হয়েছেন। আমার নিয়োগের পেছনে এটা একটা বড় ভূমিকা রেখেছে।
ফোন সাক্ষাৎকারে সার্চ কমিটির একজন সদস্য আমার সেমিনারের স্মৃতিচারণ করে বলেছিলেন, সেটা তাঁর দেখা পরিসংখ্যানের অন্যতম সেরা সেমিনার। আমার প্রকাশনার পাশাপাশি এসব কিছুই বল স্টেটে আমার নিয়োগ পেতে সাহায্য করেছিল। লাখো শোকর পরম করুণাময়ের-রুজি ও সম্মানের মালিক যিনি। তারপর আলী স্যার যিনি আমাকে ভিজিটিং প্রোগ্রামে এখানে নিয়ে এসেছিলেন। অন্যথায় আমি কখনোই নিজেকে এভাবে প্রমাণ করার সুযোগ পেতাম না। আর তারপর অবশ্যই আমার ওই সব ছাত্রছাত্রীরা-যাদের ভালোবাসা আমাকে এতদূর আসার পথে রসদ যুগিয়েছে।
________________________________________
ড. রহমতউল্লাহ ইমন
প্রফেসর, গাণিতিক বিজ্ঞান বিভাগ, 
বল স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়, মানসী, ইন্ডিয়ানা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।
  •  
  •  
  •  
  •  

Tags: