কোভিড-১৯: খাস জমি, কৃষির রুপান্তর ও শোভন বাংলাদেশ

ড. মতিউর রহমান ও শিশির রেজা

অতি সম্প্রতি গণমানুষের অর্থনীতিবিদ আবুল বারকাত তার প্রকাশিত “বড় পর্দায় সমাজ-অর্থনীতি-রাষ্ট্রঃ ভাইরাসের মহাবিপর্যয় থেকে শোভন বাংলাদেশের সন্ধানে” শীর্ষক গ্রন্থে কৃষির রাজনৈতিক অর্থনীতি নিয়ে অনেক তথ্য দিয়েছেন। গ্রন্থকার মনে করেন, কৃষির রাজনৈতিক অর্থনীতির অন্যতম বিষয় খাস জমি-জলা। দেশে বর্তমানে চিহ্নিত খাস জমি-জলার মধ্যে কৃষি খাস জমি ১২ লক্ষ একর, অকৃষি খাস জমি ২৬ লক্ষ একর, এবং জলাভূমি ১২ লক্ষ একর।

গবেষণায় দেখা গেছে, ৫৪ শতাংশ সুফলভোগী বিভিন্ন কারণে জমির ওপর তাদের অধিকার টিকিয়ে রাখতে ব্যর্থ হয়েছেন। অন্য কথায় বলতে গেলে, ভূমিহীন গরিব জনগণের যে ক্ষুদ্র অংশটি খাস জমি পেয়েছে তাদেরও প্রতি ২ জনে ১ জন খাস জমি বণ্টনের ন্যূনতম সুবিধাটুকুও পায়নি।

অর্থনীতিবিদ আবুল বারকাত মনে করেন, বর্তমান আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক কাঠামোতে খাস জলা-জমি দরিদ্র মানুষের জন্য আশীর্বাদ না-কি অভিশাপ– প্রশ্নটি অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত। দরিদ্র জনগোষ্ঠী একখন্ড খাস জমি প্রাপ্তির আশুসুবিধা অর্জনে দীর্ঘ মেয়াদের সুযোগ হাতছাড়া করতে পারে। বিগত ৫০ বছরে বাংলাদেশের কৃষিতে প্রযুক্তিগত রূপান্তর ঘটেছে। কৃষিতে ভূমিহীনতা বাড়া, জমি-জলা-জঙ্গল জবরদখল বাড়া, আর কৃষির সাথে শিল্প খাতের বিনিময় হার কৃষির বিপক্ষে থাকলেও খাদ্য-শস্য উৎপাদনে আমরা এখন পৃথিবীর ১০ম সর্বোচ্চ উৎপাদনকারী দেশ। ‘সবুজ বিপ্লব’ (উচ্চ ফলনশীল ফসল), ‘সাদা বিপ্লব’ (ডিম, দুধ), রুপালী বিপ্লব (মাছ) হচ্ছে। এসব বিপ্লবের ভিত্তিমূলে আছে রাসায়নিক দ্রব্য ও অতিরিক্ত পানি উত্তোলন– উভয়ই প্রকৃতিবিরুদ্ধ।

আবুল বারকাত বলেন, কৃষির বাণিজ্যিকীকরণ বেড়েছে ফলে খামারের কাঠামোতে পরিবর্তন হয়েছে: খামারের সংখ্যা বেড়েছে, কিন্তু আবাদি জমি হ্রাস পেয়েছে; প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকের সংখ্যা বেড়েছে; জমির খন্ডায়ন ও বিভাজন বেড়েছে, আবার পাশাপাশি কৃষিজমির মালিকানা কিছু মানুষের হাতেও পুঞ্জীভূত হয়েছে; কৃষিজ উৎপাদন উপকরণের দাম বাড়ার ফলে প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকেরা ছিটকে পড়ছেন; ভূমিহীন খানার সংখ্যা কয়েকগুণ বেড়েছে যাদের বড় অংশ এখন কৃষির পাশাপাশি গ্রামীণ অকৃষি খাতে নিয়োজিত; কেনা শ্রমের ওপর নির্ভরশীল কৃষকের অবস্থা খারাপ হয়েছে; সনাতনী ভাগচাষের বদলে এসেছে ‘বিপ্রতীপ বর্গা’, বেড়েছে বছর চুক্তিতে বা নগদ অর্থে বর্গা প্রথার প্রচলন এবং বেড়েছে উন্নত প্রযুক্তির সহায়তায় অর্থকরী ফসল-ফল-মাছ চাষ; এসবের পাশাপশি কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহারও বেড়েছে (যেমন যন্ত্রচালিত লাঙ্গল, সেচের যন্ত্রপাতি, উচ্চ ফলনশীল জাতের বীজ ব্যবহার, শস্য বহুমুখীকরণ কর্মকা- ইত্যাদি), যা ভবিষ্যতে আরো বাড়বে; আর পাশাপাশি নতুন বিষয় হিসেবে এসেছে “গৃহাঙ্গনে খাদ্য উৎপাদনব্যবস্থা”, যা হতে পারে পারিবারিক পুষ্টি চাহিদা মিটিয়ে আয় বাড়নোর সহায়ক পদ্ধতি।

গবেষক বারকাত বলছেন, উন্নয়নের জন্য প্রচলিত-সনাতনী ভাবনা ছেড়ে আমাদের নতুন ভাবনা ভাবতে হবে। গণমুখী সমবায় একদিকে যেমন হতে পারে কৃষি সংস্কারের অনুষঙ্গ. আর অন্যদিকে তা হতে পারে দারিদ্র্য-বৈষম্য দূর করার সংগঠিত শক্তিশালী বাহক। সমবায় হতে পারে বিভিন্ন ধরনের, যেমন কৃষি ও শিল্পভিত্তিক উৎপাদনী সমবায়, ব্যবসা-বাণিজ্যকেন্দ্রিক সমবায়, বিপণন সমবায়, উৎপাদনী উপকরণ ক্রয়-বিক্রয় সমবায়, ভোক্তা সমবায়, সমজাতীয় পেশাভিত্তিক সমবায় (কৃষক, শ্রমিক, কামার, কুমোর, জেলে, তাঁতী ইত্যাদি), নারী সমবায়, যুব সমবায়, প্রতিবন্ধী মানুষের সমবায়। আবার কৃষিভিত্তিক সমবায় হতে পারে শস্য-কৃষিজ সমবায়, মৎস্যজীবী সমবায়, বনায়ন সংশ্লিষ্ট সমবায়। সব সমবায়ের মূল লক্ষ্য‒ সম্পদের উৎপাদন-পুনরুৎপাদন-বিনিময় সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম সমবায়ীদের জীবনসমৃদ্ধির লক্ষ্যে যৌথভাবে সংগঠিত ও পরিচালন করা।

দারিদ্র্য-পীড়িত ভৌগোলিক এলাকা (চর-হাওর-বাওর) এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ এলাকার ভূমিহীন ও প্রান্তিক কৃষকদের মধ্যে কৃষিজ উপকরণ ক্রয়ে সুদবিহীন স্বল্পমেয়াদি (ছয় মাস) ঋণ প্রদান একই সাথে দারিদ্য দূরীকরণ ও বৈষম্য হ্রাসে অন্যতম পন্থা হিসেবে ইতিমধ্যে প্রমাণিত হয়েছে। আর গত ২১ মে ঘূর্ণিঝড় আম্ফানে দেশের ২৬ জেলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে‒ ১ লক্ষ ৭৬ হাজার হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে; ২ লক্ষ ২০ হাজার ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়েছে; পশু ও মৎস্য সম্পদ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত; কয়েক লক্ষ গাছপালা উপড়ে গেছে; কমপক্ষে ২০০ ব্রিজ-কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে; শতাধিক গ্রাম সম্পূর্ণ পানির তলায় তলিয়ে গেছে; কমপক্ষে ১৫০ কিলোমিটার বাঁধ ভেঙে গেছে; ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কমপক্ষে ১০ লক্ষ মানুষ। সাইক্লোন আম্ফানে এই যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে, তা পূরণের জন্য আসন্ন বাজেটে বরাদ্দ রাখতে হবে।

আবুল বারকাত বলেন, দরিদ্র-প্রান্তিক কৃষকদের জন্য সুদবিহীন ঋণ, হাওর অঞ্চলের উন্নয়ন, এবং আম্ফানের ক্ষয়ক্ষতি পূরণের বিষয়াদি আসন্ন বাজেটে বিবেচিত হওয়া ন্যায়সঙ্গত। এই তিন উপখাতে আসন্ন বাজেটে ৫ হাজার কোটি টাকার বরাদ্দ প্রদান করা উচিত। ভূমিহীন ও প্রান্তিক কৃষকদের জন্য “শস্য বীমা”, “কৃষি বীমা”, “জীবিকা বীমা”, “প্রাকৃতিক দুর্যোগ বীমা”, “গবাদিপশু বীমা” ইত্যাদি পরীক্ষামূলকভাবে চালু করার পথনির্দেশসহ ব্যয়-বরাদ্দ আসন্ন বাজেটে উল্লেখ থাকা প্রয়োজন।

কোভিড-১৯-উদ্ভূত পরিস্থিতিতে এ কথা অনস্বীকার্য যে, কৃষি ও কৃষক না থাকলে দেশে অর্থনৈতিক-সামাজিক বিপর্যয়মাত্রা অনেক গুণ বৃদ্ধি পেত।

কোভিড-১৯-এর লকডাউনে প্রমাণ হয়েছে যে দেশের সকল অর্থনৈতিক খাত-ক্ষেত্রের মধ্যে কৃষিখাতের ‘রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা’। রপ্তানিমুখী শিল্প খাতসহ বৃহৎ ঋণগ্রহীতারা যেসব সুযোগ/প্রণোদনা পান কৃষক-কৃষি তা পায় না। বিনা সুদে ঋণ অন্তত সামনে তিন বছর (মাইক্রো ক্রেডিট সংস্থাদের জন্যও তা করার নির্দেশনা দিতে হবে), বিনা মূল্যে মৌলিক কৃষি উপকরণ (অন্তত সামনের তিন বছর) যেমন বীজ, সার, সেচ, কীটনাশক।

_______________________
ড. মতিউর রহমান, গবেষণা পরামর্শক, হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট রির্সাচ সেন্টার (এইচডিআরসি), ঢাকা।
শিশির রেজা, সহযোগী সদস্য, বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি।

 

[প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। সবুজবাংলাদেশ24.কম লেখকের মতাদর্শ ও লেখার প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত মতামতের সঙ্গে সবুজবাংলাদেশ24.কম-এর সম্পাদকীয় নীতির মিল নাও থাকতে পারে।]

  •  
  •  
  •  
  •