নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরনে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ

sir

ড. মোঃ সহিদুজ্জামান

আজ ৭ জুন বিশ্ব খাদ্য নিরাপত্তা দিবস। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণে সচেতনা বৃদ্ধিতে দিবসটি মূলত পালন করা হয়ে থাকে। এছাড়া স্বাস্থ্যসুরক্ষায় খাদ্যজনিত রোগ ও ঝুঁকি সনাক্তকরণ ও প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে সংশ্লিষ্টদের অনুপ্রেরণা যোগাতে দিবসটির তাৎপর্য রয়েছে।

নিরাপদ খাদ্যের কথা বললে প্রথমেই যে প্রশ্নটি আসে সেটি হল নিরাপদ খাদ্য কি? যে খাদ্য শরীরের জন্য নিরাপদ ও গ্রহণযোগ্য তাকেই সাধারণত নিরাপদ খাদ্য বলা হয়ে থাকে। অর্থ্যাৎ জীবাণু ও ক্ষতিকর পদার্থ মুক্ত স্বাস্থ্যঝুঁকিহীন খাদ্যকে নিরাপদ খাদ্য বলা যেতে পারে।

তবে খাদ্য নিরাপত্তা বলতে উৎপাদিত খাদ্য যাতে অনিরাপদ না হয় সে বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অর্থ্যাৎ খাদ্য নিরাপত্তা একটি কৌশলগত ব্যবস্থাপনা যেখানে খাদ্যজনিত অসুস্থতা রোধ করতে নিরাপদ বা স্বাস্থ্যস্মত উপায়ে খাদ্য উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ বা প্রস্তুতকরণ, সংরক্ষণ এবং বাজারজাতকরণ সম্পর্কে বলা হচ্ছে।

খাদ্য বিভিন্নভাবে অনিরাপদ হতে পারে। উৎপাদন থেকে শুরু করে খাবার টেবিলে আসা পর্যন্ত খাদ্য নানা পর্যায়ে দূষিত হয়।এর মূল কারণ অসচেতনতা ও অনৈতিকতা। কৃষক বাজারজাত করার সময় খাদ্য দূষিত করতে পারে। বিক্রেতা ভালো পণ্যের সঙ্গে ভেজাল পণ্যে অথবা বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ মেশাতে পারে ফলে এসব খাবারে পুষ্টিগুণ নষ্ট হয়ে হয়ে উঠতে পারে বিষাক্ত।

আমেরিকার এক প্রতিবেদনের তথ্য মতে সেখানে প্রতি ৬ জনে একজন দূুষিত খাবার গ্রহণের মাধ্যমে অসুস্থ হচ্ছে। সেগুলোর মধ্যে কাচা বা অপাস্তুুরিত দুধ,অল্পসিদ্ধ বা অসিদ্ধ মাছ,মাংস ও ডিম; কাচা শাকসবজি উল্লেখযোগ্য।

উৎপাদনের পরিবেশ খাদ্যের মানকে প্রভাবিত করে। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাদ্য উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ খাদ্যকে অনিরাপদ করে তুলতে পারে। যেমন অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে গরু, ছাগল, ভেড়া জবাই করা; পশুপাখির মল-মুত্র, লালা, রক্ত, নাড়ি-ভুড়িতে বিদ্যমান জীবানু প্রস্তুতকৃত মাংসে ছড়িয়ে যেতে পারে। কৃষক শাক-সবজি ক্ষেত থেকে তুলে নোংরা বা দুষিত পানি দিয়ে ধৌত করলে এসব খাদ্যে জীবাণু ও দুষিত পদার্থ মিশে যেতে পারে। আবার ক্রেতা মাছ, মাংস, শাক-সবজিসহ সবকিছু এক ব্যাগে করে বাজার করলে সেখানে জীবাণু মিশে যেতে পারে।

বাজারের তাজা মাছ কোন পরিবেশে বড় হয়েছে, সেটি কিন্তু মাছের গুণগত মান নির্ধারণে ভূমিকা রাখে। মাছ যে পরিবেশে বড় হচ্ছে এবং মাছকে যে খাবার দেওয়া হয় তা যদি দুষিত হয় তা থেকেও মানুষের শরীরে জীবাণু প্রবেশ করতে পারে। এ জন্য উৎপাদনের পরিবেশকে স্বাস্থ্যকর করতে হবে নতুবা ক্ষতির আশঙ্কা থেকে যাবে।

প্লাস্টিক আমাদের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে ওঠেছে। কাঁচ ও সিরামিকের বিকল্প হয়ে উঠছে প্লাস্টিক পণ্য। রাস্তার পাশে চা-কফি মানেই অনেক সময়ই প্লাস্টিকের কাপের ব্যবহার। দামে সস্তা হওয়ায় সহজেই হাতের নাগালে পাওয়া যায় এমন কাপ। দোকান বা রেস্তোরাঁ থেকে গরম খাবার প্লাস্টিকের ব্যাগে পার্সেল করে বিক্রি করা হয়। কিন্তু এসব প্লাস্টিকের পণ্যের ব্যবহার কতটা নিরাপদ?

জানা অজানা বিভিন্ন কোম্পানির খাবারে বাজার এখন ছয়লাপ। শহরের তুলনায় গ্রামে দোকান পাটে যেসব রঙ-বেরঙের প্যাকেটজাত খাবার ও পানীয় পাওয়া যায় এগুলোর গুনগত মান নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। গ্রামে গঞ্জে ভ্রামমান আদালত বা মনিটরিং না থাকায় এবং গ্রামের অশিক্ষিত ও অসচেতন মানূষকে প্রতারণার সুযোগ নিয়ে হয়তবা অসাধু ব্যবসায়ীরা এসব খাবার বাজারজাত করছে।

এছাড়া যে বিষয়টিতে আমরা এখন গুরুত্ব দিতে পারিনি সেটি হল প্রকৃতির স্বাস্থ্য সুরক্ষা। শিল্প ও কল-কারখানার বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য, গাড়ির পোড়া মবিল, হাসপাতাল ও ক্লিনিকের ময়লা-আবর্জনা, পয়নিষ্কাশন সহ অসংখ্য উৎস থেকে বিভিন্ন ক্ষতিকর পদার্থ যে প্রতিনিয়ত আমাদের পরিবেশকে দূষিত করছে তা আমাদের গভীরভাবে ভাবতে হবে। ফসলে কীটনাশক, মাছ চাষে এন্টিবায়োটিক বা ক্ষতিকর পদার্থ ব্যবহৃত হলে সেখান থেকেও পানি ও মাটি দুষিত হতে পারে। দূষিত বা জীবাণযুক্ত পানিতে বেড়ে উঠা মাছ স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। আবার জৈব বা অর্গানিকের নামে আমরা যেসব অশোধিত পশুপাখির মল ও বিষ্টা ব্যবহার করছি তা থেকে জীবাণু ও ক্ষতিকর পদার্থ খাবার ও পানির মাধ্যমে মানুষে সংক্রমিত হতে পারে। তাই প্রকৃতি সুরক্ষা করতে এখনই আমাদের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন।

ব্যক্তিগত সুরক্ষা (পার্সোনাল হাইজিন) ও অভ্যাস খাদ্যকে নিরাপদ করতে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখতে পারে। তাই খাদ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে টেবিল পর্যন্ত যারা জড়িত তাদের সচেতনতা খুবই জরুরী।
শুধু খাবার আগে ও পড়ে এবং মল-মুত্র ত্যাগ করার পরে হাত ধোয়া শেখালে চলবে না। মাটি, পানি ও খাদ্য কিভাবে মানুষ ও প্রাণি দ্বারা দূষিত হয় এবং এই দুষিত পরিবেশ থেকে কিভাবে জীবানু ও ক্ষতিকারক পদার্থ খাবারকে অনিরাপদ করে সে বিষয়েও সচেতনা ও বিনোদনমূলক শিক্ষা প্রদান করা যেতে পারে। ক্ষতিকারক বিভিন্ন পদার্থ ও রোগের জীবাণুর পরিচিতি, জীবনচক্র, খাবারে ও মানুষে সংক্রমনের উপায় ও প্রতিকার সম্পর্কে মানুষকে জ্ঞান দান করা উচিত।

যখন কৃষক তাঁর যথার্থ পারিশ্রমিক পান না, তখন তিনি নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। অনিরাপদ খাদ্য কৃষক, ব্যবসায়ী, ভোক্তা সবার জন্যই ক্ষতিকর।তাই কৃষক ও উৎপাদকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা আমাদের প্রয়োজন। প্রয়োজন হলে মানসম্পন্ন পণ্য একটু বেশি দাম দিয়ে হলেও ক্রয় করা।

মানুষের সুস্থ জীবনের জন্য নিরাপদ খাদ্যের কোনো বিকল্প নেই। খাদ্যকে স্বাভাবিক এবং ভেজাল ও দূষণমুক্ত সরবরাহ এখন একটি বৈশ্বিক সমস্যা। খাদ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে ভোক্তার দ্বার পর্যন্ত খাদ্যের গুণগত মান নিশ্চিত রাখা আমাদের সকলের দায়িত্ব। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে সচেতনতা বৃদ্ধি ও নৈতিক পরিবেশ সৃষ্টির কোন বিকল্প নেই। এজন্য শুধু আইন প্রণয়ন নয়, চাই কার্যকর প্রয়োগ।

লেখক ও গবেষক, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

  •  
  •  
  •  
  •  
ad0.3