বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষা ও বেকারত্ব

আবু সায়েম দোসরঃ দেশে বেকারত্বের হার দিন দিন বাড়ছে। এই বেকারদের মধ্যে শিক্ষিতদের বেকারত্ব সবচেয়ে বেশি। উচ্চশিক্ষিত কিন্তু বেকার এই বাক্যটি এখন প্রবাদে পরিণত হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে উচ্চশিক্ষার কলেবরও বৃদ্ধি পাচ্ছে। দেশের আনাচে কানাচে গড়ে উঠছে সরকারী ও বেসরকারী উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। খোলা হচ্ছে নতুন নতুন বিভাগ।

দেশের গ্র্যাজুয়েট সংখ্যার চাইতে গ্র্যাজুয়েটদের জন্য ন্যূনতম যে চাকুরির সুযোগ তা প্রায় নগণ্য। যার দরুণ গ্র্যাজুয়েটদের চাকুরির সময় প্রতিষ্ঠানগুলো খুবই নিম্নমানের বেতন নির্ধারণ করে। এর ফলে সেই গ্র্যাজুয়েটদের সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে একপ্রকার হীনমন্যতার সম্মুখীন হতে হয়। পারিবারিক ভাবে চোখ রাঙানি তো থাকেই, কেন পড়াশুনা করিয়ে স্নাতক-স্নাতকোত্তর করার পরেও এত কম বেতনে চাকুরি করতে হয়! তাদের চোখের ভাষা গ্র্যাজুয়েটদের স্পষ্ট বুঝিয়ে দেয় যে এর চেয়ে সবজি বিক্রি করে, অটোরিকশা চালিয়ে কিংবা বিদেশে শ্রমিক হিসেবে গায়ে গতরে খাটলে বেশি লাভ হত। কথা খুব একটা মিথ্যা না। চাকরি না পাওয়ার ফলে নিজেদের পরিবারের গলগ্রহ ভাবতে ভাবতে তাঁদের মনে যে হতাশা ও গ্লানি জমে ওঠে, তা দুঃসহ। হতাশা তাঁদের মা-বাবাকেও ছাড়ে না। বিশেষ করে উচ্চশিক্ষিত ছেলের বেকারত্ব মা-বাবার সব স্বপ্ন ভেঙে চুরমার করে দেয়।

গ্র্যাজুয়েট হওয়ার সাথে সাথে আমাদের মনোজগতে আমূল পরিবর্তন আসে। আমরা সহসাই নিজেদেরকে একটু মহান গোছের কেউ ভাবতে শুরু করি, একটু ‘এলিট’ শ্রেণির ভাবতে শুরু করি এবং এর ফলে ছোট কাজে আমাদের অনীহা চলে আসে। আমরা নিজেরাই ছোট কাজ – বড় কাজ, নিচু কাজ – উঁচু কাজের শ্রেণি বানিয়ে নিয়েছি। তখন নিজেকে এমন ভাবি, আমি গ্র্যাজুয়েট হয়ে কেন নিচু চাকুরি বা কাজে জড়াবো! এমনকি ব্যবসা বা উদ্যোক্তা হওয়াকেও নিচু চোখে দেখি এর ফলে একটা বড়সড় মেধাবী জনগোষ্ঠী কেবল ক্ষুদ্র সংখ্যার চাকুরির প্রতি দৌড় শুরু করি। স্বভাবতই এই দৌড়ে সবাই জিতবেনা, যারা হেরে যাবে তাদের মধ্যে হতাশা ও বিস্বাদ আক্রমণ করে, নিজেদের তখন তারা ব্যর্থ মনে করা শুরু করে। এরপর সে যে কাজই করুক না কেন, নিজেকে নিতান্তই নির্বোধ ব্যতীত কিছু মনে করতে পারেনা।

আমাদের উদ্যোক্তা হওয়াকে ছোট করে দেখার পেছনেও যথেষ্ট কারণ আছে। দেশে উদ্যোক্তা হওয়ার চেষ্টাকারীর সংখ্যার তুলনায় সফল হওয়া কিংবা অন্তত পেট চালিয়ে নেয়ার মত সফলতার দেখা পাওয়া উদ্যোক্তার সংখ্যা নগণ্য। নিজেদের নেই যথেষ্ট জ্ঞান, নেই তীব্র ইচ্ছা, নেই পুঁজি; সফল হওয়ার কথাও নয়। উদ্যোক্তা হওয়া বলতেই আমরা কেবল হাঁস-মুরগির খামার করা কিংবা অনলাইনে কিছু জিনিসপত্র বিক্রিকে বুঝি। এসবে আমাদের নিজস্ব প্ল্যান, জ্ঞান, পুঁজি এসব না থাকায় বরাবরের মত শোচনীয়ভাবেই ব্যর্থ হই। তাই সমাজও একে ছোট করে দেখে। এমনকি সরকারি-বেসরকারি সাহায্য, উপদেশ, ব্যাংক থেকে ঋণ খুব একটা পাওয়া যায়না যা নিয়ে আমরা সত্যিই মাঠে নামতে পারতাম। বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে উদ্যোক্তা হওয়াটা এক প্রকার বিলাসিতাই। বাবার অঢেল টাকা ও নিজের পরিবার সামলানোর তাড়া না থাকলে উদ্যোক্তা হওয়ার পথে পা বাড়ানো প্রচন্ড সাহসিকতা অথবা নিতান্তই বোকামি।

গ্র্যাজুয়েটদের এই দুর্দশার জন্য কারা দায়ী এ প্রশ্ন অনেকের মনে।। এত এত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে স্নাতক-স্নাতকোত্তর দেওয়ার ফলে ঠিক কতটা মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব হল তা নিয়ে টকশো কিংবা পত্রিকার কলামে প্রায়ই প্রশ্ন রাখেন শিক্ষাবিদেরা; যথার্থ প্রশ্ন। তার উপর আবার আমাদের কারিকুলাম অনেক ক্ষেত্রেই যুগপোযুগী না হওয়ায় এবং মাঠ পযায়ের সাথে সমন্বয় না থাকায় গ্রাজুয়েটদের চাকরি ক্ষেত্রে সমস্যায় পড়তে হয়।মানসম্মত গ্রাজুয়েট যে তৈরি হচ্ছে না এ নিয়ে কারো মাথা ব্যাথা নেই। আলবাত চাহিদা বেশি, চাকুরির যোগান কম বলে প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক ক্ষেত্রে সুযোগ পেলেই হুটহাট ছাটাই, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মানসিক চাপ, বিনা পারিশ্রমিকে অতিরিক্ত সময় কাজ করানো এসব বাজে কাজ হরহামেশাই তারা করে থাকে, অথচ এদিক থেকে বলার কিছু থাকেনা।

অধিকাংশ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়োগ প্রক্রিয়া এতটাই অস্বচ্ছ যে সেখানে কি হয় তা কেবল ভেতরের লোক ছাড়া কেউ জানে না। তবুও তো যেতে হবে, দায় তো বেকার গ্র্যাজুয়েটদেরই!

আশেপাশে এমন প্রবল অর্থনৈতিক, সামাজিক ও শারীরিক চাপে পিষ্ট হতে দেখে নব্য গ্র্যাজুয়েটরা তাই ধীরে ধীরে সরকারি চাকুরির দিকে ঝুঁকেছে। তাদের এই ঝুঁকে যাওয়া প্রাথমিক দৃষ্টিতে খুবই অনুচিত মনে হলেও, এমনকি বাস্তবিকভাবে দেশের জন্য সত্যিই অনুচিত হলেও তাদের পক্ষে এটা ছাড়া আর পথ খোলা নাই। কে’ই বা না চাইবে একটা স্থায়ী চাকুরির ব্যবস্থা হোক। পাশাপাশি অনেক ক্ষেত্রেই সরকারি চাকুরিতে বাড়তি সুযোগ-সুবিধা ও শক্তি প্রদর্শনের সুযোগ থাকে। বাড়তি সুযোগ-সুবিধা ও শক্তি প্রদর্শন কোন সত্যিকারের মাদকের চেয়ে কম মাদকতা তৈরি করে বলে আমি বিশ্বাস করিনা। এদিকে, আমাদের পরিবার ও সমাজ অর্থ ও শক্তিকে পূজো করে বলে সরকারি চাকুরেদের দেবতার আসনে বসিয়ে রেখেছে। হাজার হোক, সবার চেয়ে একটু এগিয়ে থাকতে কে না চায়?

সরকারি চাকুরির দিকে গ্র্যাজুয়েটদের ঝুঁকে যাওয়ার অনেকগুলো খারাপ প্রতিক্রিয়া আছে। প্রথমত, একটা অসুস্থ্য প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে এর ফলে। হবেই বা না কেন? কয়েক হাজার চাকুরির বিপরীতে যদি কয়েক লাখ প্রতিযোগী থাকে তখন প্রতিযোগিতাটা আর সুস্থ্য থাকার কোন সম্ভাবনাই থাকেনা। এই অসুস্থ প্রতিযোগিতায় নিজেদের ভাগ্য নিশ্চিত করতে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েই একাডেমিক পড়াশোনার বাইরে গিয়ে সম্পূর্ণ আলাদা কিছু জিনিস মস্তিষ্কে ধারণ করার অসাধ্য সাধন করতে লেগে যায় এবং গ্রাজুয়েশন শেষ করার পর চাকরির বয়সের শেষ সময়টুকু পযন্ত চেষ্টা করে যায়। এই অসুস্থ এবং অস্বাভাবিক বিষয়টি যে কোন শিক্ষার্থী ক্ষেত্রে সত্যিই বেদনাদায়ক ও আতংকের বটে। উচ্চমাধ্যমিকের পরে স্নাতক-স্নাতকোত্তরের পাশাপাশি একটা শিক্ষার্থীর জীবনের সবচেয়ে উৎপাদনশীল ও সক্রিয় সময়ের বড় অংশই শুধুমাত্র অনিশ্চয়তাকে সামনে নিয়ে অন্ধের মত পড়াশুনা করে যেতে হয় একটা চাকুরি নিশ্চিত করার জন্য। এর চেয়ে হতাশার আর কী হতে পারে!

বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া এই মেধাবী শিক্ষার্থীদের অনেকেই নিজ বিষয়ের বাইরে গিয়ে তার মেধার অপচয় করে। নিজ বিষয়ের উপর আগ্রহ হারিয়ে যে কোন চাকরির যোগ্যতা অর্জনের বাস্তবতায় নিজেকে উৎসর্গ করে। এর ফলে বঞ্চিত হয় বিশ্ববিদ্যালয়, দেশ ও জাতি।নিজ বিষয় নিয়ে লেখাপড়া করে নিজ পেশায় যদি মূল্যায়ন ও সুযোগ-সুবিধা পেত তাহলে জনগনের অর্থে তৈরি গ্রাজুয়েট ব্যয় সার্থক হত, দেশ ও জাতি উপকৃত হত, সমৃদ্ধ হত প্রতিটি সেক্টর যা টেকসই উন্নয়নের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও যে খুব ভাল ভুমিকা রাখছে তা বলা যাবেনা। বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে আমরা এখনও পারিনি। শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতি, ছাত্র-রাজনীতি, শিক্ষক-রাজনীতি, জবাবদিহিতার অভাব, নীতিমালা প্রণয়নে বিভিন্ন ভুলের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কেবল গ্র্যাজুয়েটই তৈরি করছে, জ্ঞান নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা চৌর্যবৃত্তি করার খবরও পত্রপত্রিকায় পাওয়া যায়। লেজুরবৃত্তিক রাজনীতি ও ক্ষমতা প্রদর্শনের সুযোগ থাকায় রাজনৈতিক শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের অনেকেই সৃজনশীল কাজে যুক্ত হওয়া দূরে থাক, জ্ঞান-বিজ্ঞান থেকে দূরে সরে এসে ক্ষমতার মোহে পড়ে যায়।

আমাদের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় মানসম্মত কারিকুলাম ও সিলেবাস অনুসরণ করেনা। অধিকাংশ বেসরকারি এবং কিছু সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নামে মাত্র পড়াশুনায় গ্র্যাজুয়েট তৈরি করে, সেখানে মান নিয়ন্ত্রণের কোন বালাই নেই। আমরা গবেষণায় যথেষ্ট বরাদ্দ রাখিনা। অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়েই স্নাতক সময় থেকে গবেষণায় জড়িত হওয়ার সুযোগ নাই, যদিওবা পাওয়া যায় তা দু-একজন মহান শিক্ষকদের দয়ায়। তাছাড়া, গবেষণা, বাইরে পড়াশুনার জন্য চলে যাওয়া এসব তো অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। এত ঝামেলা করে কে’ই বা অনিশ্চিত দিকে হাঁটা শুরু করবে। তাই চাকুরির নিরাপত্তার জন্য নিজ বিষয় ছেড়ে সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক পড়াশুনা করে সরকারি চাকুরির প্রতি অনেকেই আমরা দৌড়াই। মান সম্মত গ্র্যাজুয়েটও তৈরি হলে বিসিএস না হলেও দেশ বিদেশে ভাল কিছু করার সুযোগ পেত।

শিক্ষিত বেকারত্বের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ খুবই জরুরী। বিশেষ করে করোনা অতিমারীতে বেকারত্বের হার বেড়ে যাওয়ার আশংকা থেকে এখনই সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। প্রতি উপজেলায় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্ভুক্ত সরকারি ডিগ্রি/স্নাতক কলেজগুলোর বদলে ভোকেশনাল ও টেকনিক্যাল কলেজ তৈরি করলে তা কর্মসংস্থানে বেশি কাজে আসতো।

পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা কমিয়ে সেখানে প্রবেশ করাটা আরও কঠিন করলে শুধুমাত্র সেরারাই সুযোগ পেতো। সেরাদের সেরারা গ্র্যাজুয়েট হলে অন্তত তাদের চাহিদার অভাব থাকতো না, মান নিয়ন্ত্রণ সহজ হত। সকলের স্নাতক-স্নাতকোত্তরের পথ কঠিন করে দেয়ার এই প্রস্তাবনা অনেকে স্বাগত নাও জানাতে পারেন। তবে আমি মনে করি, দক্ষ মেধাবী গ্র্যাজুয়েট তৈরি না হলে শুধুমাত্র সংখ্যা বৃদ্ধির জন্য সবাইকে সুযোগ দেয়াটা ভুল সিদ্ধান্ত। দেশের সেরা প্রথম-সারির বিশ্ববিদ্যালয়গুলোই এখনও বিশ্বের মানদণ্ডে বহু পিছিয়ে আছে, সেখানে উপজেলায় উপজেলায় কলেজগুলো আরনতুন নতুন সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মান নিয়ন্ত্রণ কঠিন।

সামগ্রিক সমস্যাটা যেহেতু বহুমূখী, তাই দায় আমরা কেউই এড়াতে পারিনা। আমরাই প্রত্যেকে কোন না কোন স্টেকহোল্ডার। আর এই জটিল অবস্থাটা একদিনেও তৈরি হয়নি, এক দিনে বের হয়ে আসাও সম্ভব না। যে ভুলগুলো ইতোমধ্যে করা হয়ে গেছে তার ক্ষতিপূরণ করতে আমাদের আরও বহুবছর লাগবে।

তবে অন্তত নতুন করে ভুল করার সময় এটা না। একই ভুলগুলো চলতে থাকলে ভবিষ্যত প্রজন্ম আমাদের দুষবে প্রতিনিয়ত।

লেখক-
আবু সায়েম দোসর
স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী
কৃষি সম্প্রসারণ শিক্ষা বিভাগ
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

[প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। সবুজবাংলাদেশ24.কম লেখকের মতাদর্শ ও লেখার প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত মতামতের সঙ্গে সবুজবাংলাদেশ24.কম-এর সম্পাদকীয় নীতির মিল নাও থাকতে পারে।]

  •  
  •  
  •  
  •  
ad0.3

Tags: , ,