উত্তরবঙ্গের উন্নয়নের মাধ্যমে দেশের সার্বিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব

মোঃ ফারুক আহমেদঃ

উন্নয়ন সংক্রান্ত আমার প্রাতিষ্ঠানিক কোন পড়াশোনা নেই। তবু অর্থনীতি সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে পড়াশোনা, একজন উত্তরবঙ্গের বাসিন্দা হিসেবে ও অভিজ্ঞতার আলোকে আমার মতে উত্তরবঙ্গের উন্নয়নের জন্য কিছু সুদুরপ্রসারী দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়ন পরিকল্পনা ও উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। উত্তরবঙ্গের উন্নয়নের মাধ্যমে দেশের সার্বিক উন্নয়ন নিশ্চিত হবে।

উত্তরবঙ্গের উন্নয়নে যে সকল দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা ও কার্যক্রম গ্রহণ করা প্রয়োজন সেগুলো হলো-

উত্তরবঙ্গের সাথে সমগ্র দেশের বিশেষ করে রাজধানী ও সমুদ্র বন্দরের সাথে উন্নত ও বহুমুখী যোগাযোগ স্থাপন করা প্রয়োজন। সড়ক, রেল, আকাশ ও পানি পথে যোগাযোগ ব্যবস্থা স্থাপন করা প্রয়োজন।ইতোমধ্যে রংপুরের সাথে ঢাকার চার লেন মহাসড়ক নির্মাণ হচ্ছে। তবে রংপুরের সাথে ঢাকার রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা খুবই করুণ। বিদ্যমান রেল যোগাযোগ ব্যবস্থায় রংপুর থেকে ঢাকা যেতে হলে বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জের হয়ে সরাসরি কোন রেল লাইন না থাকায় বগুড়া থেকে সান্তাহর, নাটোর, রাজশাহী, পাবনা ঘুরে ৮০ কিলোমিটার অতিরিক্ত ভ্রমণ করে সিরাজগঞ্জ যেতে হয়। এতে যেমন যাত্রীদের মূল্যবান সময়, কর্মঘণ্টা ও উৎপাদনশীলতা নষ্ট হচ্ছে একইসাথে রেলের অতিরিক্ত জ্বালানী ও ইঞ্জিনের আয়ুস্কাল হ্রাস পাচ্ছে। ফলশ্রূতিতে জাতীয় অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

সেতু বিভাগ সূত্রে জানা যায়, গাইবান্ধা জেলার বালাশীঘাট ও জামালপুর জেলার দেওয়ানগঞ্জঘাট নৌ-রুট বরাবর টানেলটি নির্মিত হবে। ১৩ কিলোমিটার প্রশস্ত যমুনা নদী দিয়ে গড়ে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় সাড়ে উনিশ হাজার ঘনমিটার পানি প্রবাহিত হয়। একই সময়ে প্রায় ছয়শ’ টন পলিও বহন করে থাকে যমুনা, যা বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। পলি জমার বিষয়টি বিবেচনায় সেতুর পরিবর্তে টানেল নির্মাণ সুবিধাজনক।

সরকারের অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেশের দ্বিতীয় টানেলটির নির্মাণ শুরু হতে যাচ্ছে যমুনা নদীর গভীরে। এটি অনেক ব্যয়বহুল। এমনভাবে টানেল নির্মিত হবে, যেন সড়ক ও রেলপথ তৈরি হয়। কারণ, যমুনার উভয় পাশেই এক সময় সড়ক ও রেলঘাট ছিলো। এক্ষেত্রে জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সির (জাইকা) ঋণ পাওয়ারও আশা করছে সেতু বিভাগ।

টানেল প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে উত্তরবঙ্গের রাজশাহী, রংপুর, দিনাজপুর, গাইবান্ধা, বগুড়া, নীলফামারী ও ঠাকুরগাঁওসহ ১৩ জেলা এবং বৃহত্তর ময়মনসিংহের জামালপুর, শেরপুর ও ময়মনসিংহ সদরসহ পাঁচ জেলার সঙ্গে ঢাকার সরাসরি সড়ক-রেল যোগাযোগ স্থাপিত হবে। টানেলের মাধ্যমে যাত্রীবাহী যানবাহন ও রেল সার্ভিস চালু করা যাবে। দুই ঘাট দিয়ে প্রতিদিন কয়েক লাখ মানুষ (রেলযাত্রী) এবং লাখ লাখ মেট্রিক টন মালামাল পারাপার করা যাবে।

তবে উত্তরবঙ্গের সাথে রাজধানী ও সমুদ্র বন্দরের দূরত্ব কমানোর জন্য সবচেয়ে সুবিধাজনক ও কার্যকর হবে গাইবান্ধার বালাসী ও জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ এর মধ্যে দ্রুততম সময়ে নতুন সেতু বা সরকারের পরিকল্পিত টানেল নির্মাণ করা। যা অতীব জরুরী। যেখানে সড়ক যোগাযোগের পাশাপাশি রেল যোগাযোগ ব্যবস্থাও প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এর ফলে উত্তরবঙ্গের শিল্প স্থাপন ও শিল্প পণ্য পরিবহন সহজলভ্য হবে। ফলশ্রুতিতে বিনিয়োগকারীরা উত্তরবঙ্গে শিল্প স্থাপনের মাধ্যমে মানুষের টেকসই কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে পারবে। ফলে উত্তরবঙ্গের সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব হবে।

উত্তরবঙ্গের দরিদ্র মানুষের টেকসই কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার জন্য বিভিন্ন জেলায় মাঝারি শিল্প স্থাপন, কৃষিপণ্য ও কৃষি পণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ সংশ্লিষ্ট শিল্প স্থাপন করা প্রয়োজন। এর ফলে উত্তরবঙ্গের সাধারণ মানুষ তাদের নিজ বাড়ি থেকে টেকসই কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবে। এর ফলে দেশের অন্যান্য স্থানে যেমন গাজীপুর বা নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানে চাকরিকালীন তাদের বাসা ভাড়া ও খাওয়া দাওয়ার জন্য যে অতিরিক্ত খরচ হয় সেটি হবে না। ফলশ্রুতিতে তাদের মাসিক আয় বৃদ্ধি পাবে। একই সাথে বাড়ি থেকে নিকটবর্তী স্থানে কর্মসংস্থানের ফলে তারা তাদের নিজস্ব কৃষিজ উৎপাদন বাড়াতে পারবে। পুষ্টিকর খাবার সহজলভ্য হবে ও তাদের স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটবে। নিজ বাড়িতে অবস্থান ও মাসিক আয় বাড়ার ফলে তারা ছেলেমেয়েদের ভালোভাবে পড়াশোনা করাতে পারবে। এভাবে শিক্ষার হার বাড়বে, জনচেতনতা বাড়বে এবং বাল্যবিবাহ হ্রাস পাবে। ফলশ্রুতিতে সাধারণ মানুষের সার্বিক উন্নয়ন নিশ্চিত হবে।

সাধারণ মানুষের টেকসই কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার জন্য প্রতিটি জেলায় এলাকা ও পেশা উপযোগী ইপিজেড প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে। শিক্ষিত ও কম্পিউটার ও প্রযুক্তি জ্ঞান সম্পন্ন তরুণদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার জন্য পর্যাপ্ত সংখ্যক হাইটেক পার্ক স্থাপন করতে হবে।

নদী ভাঙ্গন রোধে নদীগুলোর শাসন ও প্রতিটি নদীর তীর দিয়ে ট্যুরিজম ফ্রেন্ডলি সুপ্রশস্ত ও দৃষ্টিনন্দন রাস্তা তৈরি করা প্রয়োজন।

দক্ষ মানব সম্পদ গড়ার লক্ষ্যে প্রতিটি উপজেলায় প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলা প্রয়োজন। যারা শিক্ষিত বেকার ও সাধারণ শ্রমিকদের দেশে ও বিদেশে বিভিন্ন কার্যক্রম সংশ্লিষ্ট কর্মক্ষেত্রে কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার লক্ষ্যে তাদেরকে প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ জনবল হিসেবে গড়ে তুলবে।

দক্ষ ও নিরাপদ ড্রাইভার তৈরীর লক্ষ্যে প্রতিটি জেলায় ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ সেন্টার প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। যেখানে শিক্ষিত, আধা শিক্ষিত ও বেকারগণ প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে নিজেদের দক্ষ ড্রাইভার হিসেবে গড়ে তোলে দেশে ও বিদেশে তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবে।

জমি ও এলাকা ভিত্তিক উন্নত জাতের ফসল ও প্রযুক্তি সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন। একই সাথে উৎপাদিত পণ্যের বাজারজাতকরণ, সংরক্ষণ ও ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করার জন্য সরকারকে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

লেখকঃ
সহকারী পুলিশ সুপার (অপস্ এন্ড মিডিয়া)
৮ এপিবিএন
উখিয়া, কক্সবাজার

  •  
  •  
  •  
  •  
ad0.3