বাবা আমার আদর্শ, পথচলার অনুপ্রেরণা!
অলিউল ইসলাম অলি:
বাবা সম্পর্কে আমার গুরুত্বপূর্ণ নির্দিষ্ট কোন ঘটনা নেই। বাবার সাথে সব ঘটনাই আমার কাছে বিশেষ মনে হয়। তারপরেও দু’ একটা ঘটনা মনে পড়লে কখনও প্রফুল্ল হয়ে উঠি আবার কখনও স্মৃতি কাতর হয়ে পড়ি।
একটা বয়সে বাবা নামটাকে বেশ ভয় পেতাম, মনে হতো বাবা নামের কাঠগড়া থেকে কবে যে মুক্তি পাবো! বাবার প্রতি ভালোবাসার চেয়ে বাবার শাসন থেকে মুক্তি পাওয়াটাই একটা সময়ে মূখ্য বিষয় ছিলো। বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় ছেলেদের পছন্দ মাকে আর মেয়েরা পছন্দ করে বাবাকে। আমার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে, মা যথেষ্ট আদর করতো ছাড় দিতো যেটা বাবার কাছে আশা করা অসম্ভব ছিলো।
আষাঢ় মাস, চারদিকে পুকুরগুলো পানিতে টৈটম্বুর সুযোগ পেলেই পুকুরে ছুট দিতাম। ঘন্টা তিন কি চারেক টানা পানিতে ডুব দিয়ে চোখ লাল করে যখন বাড়ি ফিরতাম তখন বাবার চোখ এড়িয়ে বাড়ির পিছনের দরজা দিয়ে মা বাড়িতে ঢুকাতো তারপর গোসল করিয়ে খাওয়া করিয়ে শুয়ে দিতো। গ্রীষ্মের দিন, প্রখর রোদ বাইরে যাওয়া নিষেধ। তারউপর পাড়ার ছেলেদের ক্রিকেট খেলা সেখানে যাওয়া চাইই চাই। বাবা একটু ঘুমিয়ে পড়লে পা টিপেটিপে বাইরে বের হয়ে খেলার মাঠে দৌড় দিতাম। খেলা যখন মাঝ পর্যায়ে তখন বাবাকে খেলার মাঠের পাশে আবিষ্কার করতাম, বলা চলে দর্শক হিসেবেই।
আমি পাড়ায় বেশ ভালোই ক্রিকেট খেলতাম যখন বাবা দর্শক তখনতো আরেকটু ভালো খেলাই যায়, মনে মনে ভাবতাম বাবা হয়তো আমার খেলা দেখে খুশি হয়েছে। সন্ধ্যার আগে যখন বাড়ি ফিরতাম তখন বাড়ির গেটে ঢুকার আগেই শুনতাম বাবা বাড়িতে রাগারাগি করছে মায়ের সাথে, আমি কেনো রোদের মধ্যে খেলতে গেলাম। তখন কপালে খারাপি আছে ভেবে আর বাড়িতে ঢুকতাম না, বাবা হাটের উদ্দেশ্যে বেড়িয়ে গেলে তারপর বাড়িতে ঢুকতাম এবং বাবা আসার আগেই ঘুমিয়ে পড়তাম আর যদি বাবা তাড়াতাড়ি চলে আসতো তখন বই নিয়ে বসে থাকতাম যতক্ষন না বাবা ঘুমিয়ে পড়ে। কারণ এটা জানতাম যে বই পড়ার সময় বাবা কিছু বলবেনা।
আমার পাড়া গাঁয়ে একটা দোকান ছিলো সেখানে সারাদিন সিডিতে সিনেমা চলতো, গ্রামের ছেলেরা বাজিতে ক্যারাম খেলতো আর অনেকে সিগারেটও ফুঁকতো। সেই দোকানের আসেপাশে যাওয়াটা আমার জন্য পুরোপুরি নিষিদ্ধ ছিলো। তখন আমার ইন্টার ফার্স্ট ইয়ারের ফাইনাল পরীক্ষার সময়, কি মনে করে সেই দোকানে ঢুকে ক্যারাম খেলছিলাম। কোথাথেকে বাবা এসে আমার হাত ধরে টেনে বাড়িতে নিয়ে গেলো, তারপর কতোকগুলো কাঁচা কঞ্চির বারি সহ্য করতে হয়েছিলো। বাবার অনেকগুনের মধ্যে একটা ভালো দিক হলো বাবা কখনওই লোকজনের সামনে শাসন করতেন না। সেদিন খুব রাগ হয়েছিলো, আমি এতো বড় হয়েছি এটা কি মার খাওয়ার বয়স! একটা দিনেইতো গিয়েছিলাম ক্যারাম খেলতে। কিন্তু এখন সেই ক্যারাম খেলা আর সিগারেট ফুঁকা ছেলে গুলোকে দেখলে মনে হয় বাবাই ঠিক ছিলেন। এবং এটাও স্পষ্ট যে বাবা কেনো শাসন করতো।
আমাদের কৃষি প্রধান পরিবার, অনেক লোকজন কাজ করে। বাবা কাজের লোকদের সাথে মিশতে বলতেন এবং তাদের সাথে কাজে সহযোগিতা করাটাও আমাদের দুই ভাইয়ের রুটিনের মধ্যে পড়তো। প্রায় সময়ই বাবা আমাদের হাতে ধরে বিভিন্ন রকমের কাজ শেখাতেন,কিভাবে ধান রোপণ করতে হয়, ধান মাড়াই, ক্ষেত নীরানি, বাঁশের তৈরী বেড়াতে কিভাবে গিট দিতে হয়, কোদালের হাতল কিভাবে লাগাতে হয়, পাট দিয়ে কিভাবে দড়ি বানাতে হয় এসব কিছুই খুব ছোট বয়সেই শিখে ফেলেছিলাম।
একদিনের কথা মনে পড়ে তখন সবে ক্লাস এইটে পড়ি। আমাদের ক্ষেতের কয়েক মণ বেগুন তোলা হয়েছে। হাঠে বিক্রি করার জন্য বাবাই যেতো। সেদিন বাবা কি মনে করে আমাকে বিক্রি করতে যেতে বলল। আমি রিতিমতো হতবাক হয়ে গেলাম,আমি বাজারে কখনওই যাইনি হুট করে গিয়ে কই যাবো কিভাবে বিক্রি করবো। শুনেছি কাঁচাবাজারের হাট অনেক বড়। আমি বাবার কাছে গো ধরলাম যে আমি যেতে পারবোনা। বাবা কোন মতেই রাজি হলেন না, শেষমেশ একটা ভ্যান ডেকে বাবা বেগুনের বস্তা আর আমাকে পাঠিয়ে দিলেন বাজারে। সাড়া রাস্তায় আমার কতো কৌতুহল, কতোটাকা মণ চাইবো কতোটাকা হলে বিক্রি করবো বাজারের কোন জায়গাটায় গিয়ে বিক্রি করবো এসবের কিছুই বলেনি বাবা।
বাজারে পৌছে দেখলাম আমাদের গ্রামের অনেক লোক সেখানে, তাদের সহযোগিতায় কয়েকমণ বিক্রি করলেও একমণ বেগুন কিছুতেই বিক্রি হচ্ছিলো না। এদিকে সন্ধ্যা হয়ে গেছে বাড়ি ফিরতে হবে, শেষে বাকি বেগুন বিক্রি করতে না পেরে সেগুলো বাজারে রেখেই বাড়ি চলে আসি। বাড়ি ফিরতেই বাবা আমাকে বলে ‘আব্বা বিক্রি করতে পেরেছেন? আমি বাবাকে কিভাবে বলি যে, বাবা একমণ বেগুন আমি ফেলে দিয়ে এসেছি। কতো কষ্ট করে চাষ করা ফসল ওগুলো। আমরা ভাই বোনেরা কেউই বাবার সামনে মিথ্যা বলতে পারতাম না এখনও পারিনা। কতোবার ভেবেছি সেমিস্টার ফি বেশী করে নিবো কিন্তু এখন পর্যন্ত কৃতকার্য হতে পারিনি। আমি টাকাগুলো বাবাকে দিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বললাম, বাবা একমণ বেগুন বিক্রি করতে না পেরে ফেলে দিয়ে এসেছি। এই কথা শুনে বাবা হাসতে থাকে মাকে ডেকে টাকাগুলো মায়ের হাতে দিয়ে বলে ‘এতে কাঁদার কি আছে আব্বা, আমরাতো প্রায়ই হাটে কাঁচা শাকসবজি ফেলে দিয়ে আসি আর আমি নাথাকলে তোমাদের সব কিছু দেখতে হবেনা তাই হাটে পাঠিয়েছিলাম সবকিছু একটু শিখে আসলেন শেখা থাকলো সবকিছু। আর কখনও যেতে হবেনা আপনাকে।
বাবার প্রতি ছোট্ট ছোট্ট রাগ অভিমানগুলো ভালোবাসা আর শ্রদ্ধায় রুপ নিতে থাকলো ইন্টার পাশ করার পর। বাবা কখনওই বলতোনা যে আমাকে ডাক্তার হতে হবে কিংবা ইঞ্জিনিয়ার হতে হবে। ইন্টার পাশ করার পর নিজের ইচ্ছাতে ভার্সিটি কোচিং করার সিদ্ধান্ত নিলাম বাবা আমার সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দিলেন। যদিও ভাই বোনেরা চাইতো মেডিকেল কোচিং করি। ভার্সিটিতে চান্স পেলাম ভর্তি হলাম। যেদিন বাড়ি থেকে ভার্সিটির উদ্দেশ্যে রওনা দিবো সেদিন বাবা ডেকে বাবার পাশে বসিয়ে খুব যত্ন করে খাওয়ালেন তার আগে কখনই বাবার পাশে বসে তেমন খাওয়া হতোনা। বাবা সবসময় একাই খেতে বসতেন। সেদিন বাবা নিজের হাতে তুলে তুলে খাওয়ালেন।
খাওয়া শেষে বললেন, ‘আব্বা আমি চাই আপনি ভালোভাবে পড়াশোনা শেষ করেন আমি যেন বুক ফুলিয়ে বলতে পারি যে আমার ছেলেরা শিক্ষিত এবং সৎ, ওসব চাকরীর হিসেব করতে হবেনা কারণ আমি জানি আমি আমার ছেলেদের যা শিখিয়েছি তাতে করে তাদের পথ চলতে কিংবা পেট চালাতে তারা নিজেরাই যথেষ্ট। একজন গ্রামের সাধারণ বাবার ভাবনা কতোটা উঁচু হলে এমন কথা বলতে পারে সেটা আমার বাবাকে দেখে অবাক হয়েছিলাম এবং আজও প্রতিনিয়ত হই। আমি কতো বড় হতে পারবো সেটা জানিনা তবে আমার বাবা যা শিখিয়েছেন তা একজন সন্তানের বড় হওয়ার জন্য যথেষ্ট।
বাবা জানেনা যে, বাবা দিবস নামে একটা বিশেষ দিন আছে বাবা জানে তাঁর একটা ছেলে বাড়ির বাহিরে থাকে তাইতো সময় অসময়ে খোঁজ রাখে। আমি জানি বাবা দিবস নামে একটা দিন আছে এবং আমার একজন বাবা আছে যাকে আমি আদর্শ ভাবি, পথচলার অনুপ্রেরণা ভাবি, যিনি হোচট খাওয়া সন্তানকে কখনও হাত ধরে তুলেনি বরং তার চেয়ে বড় পন্থা হোচট খেয়ে কিভাবে নিজেই দাঁড়াতে হয় সেটা শিখেয়েছেন। তবুও মুখে বলা হয়না তেমন কিছুই, অন্তরের শ্রদ্ধা টান আর সন্মানের কাছে মুখের দুটি কথা যেন শঙ্কীর্ণ হয়ে যায়। ভালো থাকো বাবা। ভালো থাকুক সন্তানের অন্তরে জিয়ে থাকা প্রতিটি বাবা।
ছবি: প্রতিকী
_______________________________
অলিউল ইসলাম অলি
শিক্ষার্থী, পশু পালন অনুষদ,
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ-২২০২।

