স্মার্টফোনের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার ও শিশুকিশোরদের ওপর এর বিরূপ প্রভাব

মো. এম. এন. আজিম (সাম্য)

বর্তমানে আমরা বিশ্বায়নের এমন এক যুগে অবস্থান করছি যা সম্পূর্ণ প্রযুক্তি নির্ভর। একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম একটি প্রযুক্তি হলো স্মার্টফোন। মূলত অ্যান্ড্রয়েড অপারেটিং সিস্টেম মোবাইল ফোনকে নিয়ে গেছে অন্য এক উচ্চতায়।

একসময় মোবাইল ফোন ছিল শুধু যোগাযোগের মাধ্যম । কিন্তু বর্তমানে শুধু যোগাযোগই নয়, মানুষের লেখাপড়া, অফিশিয়াল কাজ, বিনোদন, সামাজিক যোগাযোগ রক্ষা, ব্যবসা বাণিজ্য, চিকিৎসা, সংবাদের জন্য মোবাইল ফোন একটি অপরিহার্য মাধ্যম।

করোনা মহামারিকালীন স্মার্টফোন আরও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে সকলের মাঝে। সবাই তাদের অলস সময়ে মোবাইল ফোনকে সঙ্গী বানিয়ে ফেলছেন।

করোনা পরিস্থিতিতে দেশের শিক্ষা কার্যক্রমকে এগিয়ে নিতে শুরু হয়েছে অনলাইন ক্লাস। ফলে অনেক বাবা মা বাধ্য হয়ে তাদের শিশুদের হাতে মোবাইল তুলে দিয়েছেন। কিন্তু মোবাইল ফোন সম্পর্কে সঠিক ধারণা না থাকায় অনেক শিশুকিশোর এর অপব্যবহারের দিকে ঝুঁকে পড়ছে।

টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী করোনা মহামারিকালীন স্মার্টফোনের বিক্রি বেড়েছে প্রায় ১৩ শতাংশ। বেড়েছে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা। সেইসঙ্গে তাল মিলিয়ে বেড়েছে সাইবার ক্রাইম।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের জগতে হিতাহিতজ্ঞান হারিয়ে শিশুকিশোররা লিপ্ত হয়েছে অসুস্থ প্রতিযোগিতায়। কে কার থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এগিয়ে থাকবে, পপুলার হবে সেই দৌড়ে সকলে ব্যস্ত। স্কুল কলেজ বন্ধ থাকায় যেমন তারা লেখাপড়ার দিকে অমনোযোগী হয়েছে তেমনি বেড়েছে তাদের অপরাধপ্রবণতা।

স্মার্টফোনের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার শিশুকিশোরদের মধ্যে সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ, চারিত্রিক ও নীতি নৈতিকতার পরিবর্তন ঘটিয়েছে। পাশ্চাত্য ও ভারতীয় সাংস্কৃতির দিকে ঝুঁকে পড়ছে তারা। টিকটক, লাইকির মত অ্যাপগুলোতে নিজেদের বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা যেন তাদের নেশা হয়ে দাড়িয়েছে। এসবের প্রভাবে ঘটছে তাদের সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়।

আধুনিকতা ভেবে পাশ্চাত্য সংস্কৃতি আঁকড়ে ধরে তারা দেশীয় সংস্কৃতি ও মার্জিত ব্যবহার ভুলতে বসেছে। বেড়েছে পর্নোগ্রাফি আসক্তি। তাছাড়া অশালীন ওয়েব সিরিজ গুলো মানুষের চারিত্রিক ও মানসিকতার বিরূপতার সৃষ্টি করছে। রাত জেগে মোবাইল ফোনের ব্যবহার তাদের শারীরিক ও মানসিক ভারসাম্যের ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে। ফলে দেখা যাচ্ছে ইনসমনিয়া ও চোখের বিভিন্ন রোগ। বাড়ছে পুরুষত্বহীনতা ও বন্ধ্যত্ব। বিভিন্ন ডেটিং সাইটগুলো তাদের অনৈতিক সম্পর্কের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ফলে বাড়ছে তাদের জীবনের হতাশা। অনৈতিক সম্পর্কের জেরে অনেকে বেছে নিচ্ছেন আত্মহত্যার পথ।

Admission

ধর্ষণ ইভটিজিং এর মত অপরাধগুলো বাড়ছে। পরিবেশগত কারণে অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের পার্কে নিয়ে যেতে পারেন না । শিশুকিশোররা খেলাধুলার সুযোগ না পাওয়ায় তাদের পূর্নাঙ্গ মানসিক বিকাশ ঘটছে না।

বেড়েছে অনলাইন গেমিং আসক্তি। এমনকি দুই বন্ধু পাশাপাশি বসে গল্প না করে গেমিং এ নিজেদের ডুবিয়ে রাখছেন। এভাবে চলতে থাকলে পঙ্গু হয়ে যাবে আমাদের সমাজব্যবস্থা।

চলতি পথে মোবাইল ফেনের ব্যবহার বিশেষ করে দুই কানে এয়ার ফোন লাগিয়ে কথা বলা বা গান শোনায় প্রায়শই দূর্ঘটনার শিকার হতে হচ্ছে অনেকের।

এজন্য সচেতন হতে হবে অভিভাবকদের। সন্তানদের সুষ্ঠু মানসিক বিকাশে তাদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সকল অভিভাবকের উচিত তাদের সন্তানের গতিবিধির দিকে নজর রাখা। শিশুকিশোরদের বিভিন্ন ধরণের শারীরিক পরিশ্রম ও খেলাধুলার প্রতি আগ্রহী করে তুলতে হবে। মোবাইল গেমিং এ আসক্ত না হয়ে কি করে প্রোগ্রামিং করা যায় সে বিষয়ে তাদের উৎসাহি করে তুলতে হবে।

আমাদের সকালে উচিত বিভিন্ন সাইবার ক্রাইম বিষয়ে সচেতন হওয়া। সকল ক্ষতিকর ওয়েবসাইট গুলো বন্ধ করে দেওয়া। মোবাইল ফোন কিভাবে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে সঠিক কাজে ব্যবহার করা যায় সে বিষয়ে সেমিনার আয়োজন করে সকলকে এর সঠিক ব্যবহার শেখানো। তাহলেই প্রযুক্তির অপব্যবহার হতে উত্তরণ পেতে পারে আমাদের দেশ ও জাতি। সর্বোপরি অভিভাবকের সাথে সন্তানের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কই পারে সন্তানকে যেকোনো অপরাধ থেকে দূরে রাখতে।

 

মো. এম. এন. আজিম (সাম্য)
ভেটেরিনারি অনুষদ
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ

  •  
  •  
  •  
  •  

Tags: