প্লাস্টিকের পাত্রে গরম খাবার রাখা বা খাদ্য সংরক্ষন কতটা স্বাস্থ্যসম্মত?

এস এম আবু সামা আল ফারুকীঃ

প্লাস্টিক পুরো বিশ্বেই বহুল ব্যবহৃত একটি সামগ্রী। গামলা, বালতি, চায়ের কাপ, স্ট্র, পানির বোতল, কোমল পানীয়ের পাত্র,  রান্নাঘরের কোণ থেকে শুরু করে ঘর-গৃহস্থালির সব জায়গাতেই প্লাস্টিক ব্যবহার করা হয়। এমনকি জুস কিংবা চা সরবরাহের জন্য হোটেলগুলোতে প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি ওয়ান টাইম কাপ ব্যবহৃত হয়। অনেকেই বাসাবাড়িতে বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্য রাখা বা গরম করার ক্ষেত্রে প্লাস্টিকের পণ্য ব্যবহার করে থাকেন। অপেক্ষাকৃত সস্তা ও সহজলভ্য হওয়ায় প্রতিদিন আমরা নানাভাবে প্লাস্টিকের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছি। রাস্তার পাশে চা-কফি মানেই এখন প্লাস্টিকের কাপের ব্যবহার। দামে সস্তা হওয়ায় সহজেই হাতের নাগালে পাওয়া যায় এমন গ্লাস। কিন্তু এসব প্লাস্টিক পণ্যের ব্যবহার কতটুকু নিরাপদ সে বিষয়টি সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা হচ্ছে। বিশেষ করে ওয়ান-টাইম ইউজ প্লাস্টিক (বোতল, কাপ, প্লেট, বক্স, চামচ, স্ট্র) দ্রব্যের ব্যবহার ক্রমশই বাড়ছে। শুধু শহরেই নয়, গ্রামগঞ্জেও এ অবস্থা দৃশ্যমান।

প্লাস্টিকের পাত্রে খাওয়া বা কোনো কিছু গরম করার মারাত্মক ক্ষতিকর দিক রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, প্লাস্টিকের পাত্রে কিছু গরম করা এবং প্লাস্টিকের বোতলে গরম পান করা ক্যান্সারের কারণ হতে পারে। প্লাস্টিকের বোতলে থাকা রাসায়নিক পদার্থ খাবারের সঙ্গে মিশে, খাবার থেকে শরীরের ভেতর প্রবেশ করে স্ব্যাস্থ্যঝুকির কারণ হচ্ছে। শুধু তাই নয়, প্লাস্টিকের পাত্রে খাবার গরম করলেও ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান খাবারের মধ্যে প্রবেশ করে। যার ফলে ক্রমাগত বাড়ছে ক্যান্সার, অ্যাজমা, অটিজম, হরমোনজনিত সমস্যা, গর্ভপাতসহ নানা জটিল রোগ।

পানি ফুটিয়ে গরম অবস্থায় শিশুর ফিডার বা বোতলে রাখা, প্লাস্টিকের পাত্রের খাবার মাইক্রোওয়েভ ওভেনে গরম করা, প্লাস্টিক পাত্রে গরমকিছুর ব্যবহার ডেকে আনছে নানা ধরণের জটিল রোগ। খাবার পার্সেল মানেই এখন প্লাস্টিকের প‌্যাকেটের ব্যবহার। সহজলভ‌্য ও ব‌্যবহারিক সুবিধালাভে এই উপায়ে অভ‌্যস্ত হলেও এর বিপদ অত্যন্ত মারাত্মক। রাস্তার ধারে দোকানের পাশে দাঁড়িয়ে প্লাস্টিকের পাত্রে  চা খাওয়াকে চিকিৎসকরা মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুকির কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।  চিকিৎসকরা বলছেন এই প্লাস্টিকের সামগ্রীতে গরম তরল খাবার খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।

প্লাস্টিক একটি বৃহৎ গঠন যা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অনুর (মনোমার) সমন্বয়ে গঠিত। বিভিন্ন রকমের প্লাস্টিক যেমন পিভিসি, পলিপ্রোপাইলিন,পলিকার্বোনেট ইত্যাদি তৈরী হয় বিভিন্ন অনুপাতে মনোমার বা ক্ষুদ্র অনুর সংযোজনে। কিন্তু দেখা গেছে অনেক প্লাস্টিক বা পলিমার নিজেরা বিষাক্ত না হলেও সেগুলি যে মনোমারের সংযোজনে তৈরি হয় তা খুবই বিষাক্ত হয়। প্লাস্টিক পুরনো হলে বা  শক্ত প্লাস্টিকের পাত্রে ঘষা লাগলে ও সস্তা প্লাস্টিক প্যাকেটে বা পাত্রে গরম খাদ্য রাখলে এই বিষাক্ত মনোমারগুলি প্লাস্টিক থেকে বেরিয়ে খাবারে মিশে যায়। আমাদের অজান্তেই সুস্বাদু খাবার বিষাক্ত হয়ে যায়। এ ধরনের ক্ষতিকারক উপাদানের মধ্যে রয়েছে বিসফেনল এ (বিপিএ), স্টাইরিন, ফ‌্যালেটস, ইত্যাদি।

বিসফেনল এ (বিপিএ) একটি কৃত্রিম ইস্ট্রোজেন হরমোন, যা শরীরে প্রবেশ করলে শরীরে উপস্থিত ইস্ট্রোজেন হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করে। যাকে হরমোন ডিসরাপ্টার বলে। ফলে মহিলাদের স্তন ক্যানসার হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। এছাড়া বিপিএ গর্ভবতীর ভ্রূণের মস্তিষ্কের উন্নতির উপরও প্রভাব ফেলে। ২০১০ সালে একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছে, যে গর্ভবতী মহিলাদের প্রস্রাবে বিপিএ-র মাত্রা বেশি তাদের মধ্যে যারা কন্যাসন্তান প্রসব করেছেন সেই শিশুরা ৩ বছর বয়স থেকে হাইপার অ‌্যাকটিভিটি, দুশ্চিন্তা এবং অবসাদে আক্রান্ত হয়। এছাড়াও বিসফেনলের কারণে পুরুষদের শুক্রাণু কমে যেতে পারে, হার্ট, কিডনি, স্তন ক্যান্সার, লিভার, মস্তিষ্কের ক্ষমতা কমে যাওয়া, ফুসফুস এবং ত্বকও মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

রেস্তোরাঁয় যে ধরনের পাত্র পার্সেলের জন‌্য ব‌্যবহার করে সেটি স্টাইরিন নামক মনোমার দিয়ে গঠিত। এই মনোমার আমাদের স্নায়ুতন্ত্রের সেন্ট্রাল নার্ভাস সিস্টেমকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। যার ফলে মাথাব্যথা, দুর্বলতা, অবসন্নতা, অবসাদ, বধিরতা ও পেরিফেরাল নিউরোপ্যাথি ইত্যাদি লক্ষণ প্রকাশ পায়। এছাড়া এই মনোমারে কিডনি, গলার ক্যান্সার এবং বন্ধ্যত্বের সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়। সম্প্রতি অন্ধ্রপ্রদেশের কিং জর্জ সরকারি হাসপাতালে এই তিনটি সমস্যায় আক্রান্ত রোগীর সংখ‌্যা বৃদ্ধির পিছনে প্লাস্টিকের পাত্রে গরম খাবার খাওয়ার অভ্যেসটাই মূল কারণ হিসেবে চিহ্ণিত করেন চিকিৎসকরা।

খুব গরম খাবার রাখলে যখন প্লাস্টিক একটু গলতে শুরু করে তখন ডাইঅক্সিন নামক এক প্রকার রাসায়নিক বেরোয় এবং এটা শরীরের স্নায়ুতন্ত্র, হরমোনাল সিস্টেমকে বিনষ্ট করে। শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমায় ও প্রজনন তন্ত্রের ক্ষতি করে।

অনেক দেশে রেজিন আইডেন্টিফিকেশন কোড নামে একটি শ্রেণীবদ্ধ পদ্ধতি রয়েছে, যা একটি পাত্র বা বোতল তৈরি করার জন্য ব্যবহৃত প্লাস্টিকের রেজিনের বর্ণনা দেয়। এর মাধ্যমে প্লাস্টিকের গুণগতমান সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। এক থেকে সাত পর্যন্ত সংখ্যা দ্বারা একে প্রকাশ করা হয় যা প্লাস্টিক দ্রব্যটিকে কতবার ব্যবহার করা যাবে সেই তথ্যও প্রকাশ করে। তবে আমাদের দেশে এই পদ্ধতির ব্যবহার নেই বললেই চলে। ফলে যত্রতত্র নিম্নমানের প্লাস্টিক ব্যবহার করা হচ্ছে।

প্লাস্টিকের পাত্র ব্যবহারের ক্ষেত্রে তাই এখনই সচেতন হওয়া প্রয়োজন। প্লাস্টিকের বিকল্প অন্য পদার্থ ব্যবহার করতে হবে যা স্ব্যাস্থসম্মত হবে এবং প্লাস্টিক ব্যবহারে কোডিং এর ব্যবহার জনপ্রিয় করে তুলতে হবে।

এস এম আবু সামা আল ফারুকী
ভেটেরিনারি সাইন্স অনুষদ
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

  •  
  •  
  •  
  •