মহামারির বিরুদ্ধে বিজ্ঞানীদের যাত্রা

হালিমা তুজ্জ সাদিয়া:

পৃথিবীতে প্রাণের জন্মের পর থেকে বড় বড় পাঁচটি ‘মহা বিলোপ’ বা ম্যাস এক্সটিঙ্কশনের ঘটনা ঘটেছে যা পৃথিবীর সমস্ত জীবকুলকে প্রায় ধ্বংস করে ফেলেছিল। প্রায় সাড়ে চারশো মিলিয়ন বছর আগে শুরু হওয়া অর্ডোভিশিয়ান থেকে শুরু করে ডায়নোসরের বিলুপ্ত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। মানব জন্মের পর থেকে বিশ্বে তেমনি নানান রোগ, বিভিন্ন সময়ে মহামারী বা বিশ্বমারীর আকার নিয়ে মানবগোষ্ঠীর অস্তিত্বকে প্রায় বিপন্ন করে তুলেছে যার ইতিহাসও অনেক পুরানো। প্রাচীনকাল থেকে এখন পর্যন্তও মানবজাতিকে মহামারির বিরুদ্ধে লড়াই করতে হচ্ছে। আর রোগ সংক্রমণের জন্য যেসব জীবাণু দ্বায়ী সেসব জীবানু সম্পর্কে মানুষের আজকের ধারণাটিতে পৌঁছাতে সময় এবং শ্রম দিতে হয়েছে নাম না জানা অনেক বিজ্ঞানীর।

একসময় মানুষের জীবানু সম্পর্কে কোনো স্পষ্ট ধারণাই ছিলোনা। উদ্ভিদ বিজ্ঞানের জনক থিওফ্রাস্টাসের সময়কালে মানুষ এরুপ বিশ্বাস করতো যে, সৃষ্টিকর্তা যখন কারো উপর অসন্তুষ্ট হয় তখন তার শাস্তিস্বরুপ রোগ বালাই দেয়- সেটা হোক গাছে কিংবা মানুষের মধ্যে। পরবর্তীতে বিভিন্ন বিজ্ঞানীরা তাদের অক্লান্ত পরিশ্রম এবং গবেষণালব্ধ ফলাফলের দরুণ সফলতা প্রদর্শনে মাধ্যমে- মানবজাতি আজকে অনেকটা সাহস নিয়ে, সুনিশ্চিত ভাবে বেঁচে থাকার আশা রাখতে পারছে এবং যেকোনো রোগ বালাইয়ের বিরুদ্ধে মোকাবিলা করার সাহস করতে পারছে।

বিজ্ঞানীদের মধ্যে- এডওয়ার্ড জেনার, যিনি গুটিবসন্ত রোগের ভ্যাকসিন আবিস্কার করেছিলেন আর এটিই ছিলো এই পৃথিবীর প্রথম ভ্যাকসিন। জেনারকে প্রায়শ রোগ-প্রতিরোধ বিদ্যার জনক বলা হয়, এবং এটিও বলা হয় তিনি অন্য যে কার থেকে বেশি মানুষের প্রাণ রক্ষা করেছেন। জেনারের সময় ব্রিটিশ জনসংখ্যার ১০% গুটিবসন্তে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছিল, জেনার তার হাইপোথিসিস সর্বপ্রথম তার মালির আট বছরের ছেলে জেমস ফিলিপ এর ওপর পরীক্ষা করেন।

পরবর্তীতে লুই পাস্তুর, ১৮৪৬ সাল থেকে মৃত্যু পর্যন্ত তিনি মানবসভ্যতা রক্ষার জন্য অনেক কিছুই আবিষ্কার করে গিয়েছেন। তৎকালীন সময়ে, মানুষ ধারণা করতো যে- অনুজীব নির্জীব বস্তু থেকে আপনা আপনি সৃষ্টি হয়। যেটা Theory of Sponteneous generation নামে পরিচিত। এটা নিয়ে বিজ্ঞানসম্মত কোনো প্রমাণ না থাকায়- লুই পাস্তুর তার পরীক্ষার মাধ্যমে দেখান যে, নির্জীব বস্তু থেকে কোনো অনুজীব সৃষ্টি হতে পারেনা। পাস্তুর প্রমান করেন, বাতাস ও অন্যান্য মাধ্যম থেকে ব্যাক্টেরিয়া আসে এবং সেখান থেকে তারা তাদের সংখ্যাবৃদ্ধি করতে পারে। জীবাণুমুক্ত নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে, কোনো প্রাণ আপনা আপনি কোনো প্রাণের জন্ম দিতে পারেনা। তিনি ফারমেন্টেশনের মাধ্যমে দেখিয়েছেন, কিভাবে জীবাণু বেড়ে উঠে এবং এদের দমন করা যায় কিভাবে। এসময় তিনি অ্যারোবিক ব্যাকটেরিয়ার সন্ধান পেয়েছিলেন। আজকের পাস্তুরাইজেশন প্রক্রিয়ার অবদান তার হাতেই ঘটেছিলো। তিনি ওয়াইন শিল্পকে রক্ষা করেছিলেন, ওয়াইনে থাকা ইস্ট, ফলের জুসকে অ্যালকোহল, পরবর্তীতে অ্যালকোহল থেকে জৈব এসিডে পরিনত করতো যার ফলে জুস টক হয়ে যেতো। তখন তিনি পরামর্শ দিয়েছিলেন, তাপ দিয়ে ওয়াইন থেকে ইস্ট মেরে ফেলতে। তিনি রেশম শিল্পকে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন সঠিক নির্দেশনা দিয়ে, জীবানুমুক্ত বীজ উৎপাদন করে। আবার জলীয়বাষ্পের সাহায্যে জীবাণুনাশক পদ্ধতি কিভাবে কার্যকর করতে হয় সেটিও দেখিয়েছিলেন। লুই পাস্তুর এনথ্রাক্স রোগের ভ্যাক্সিণ আবিষ্কার করেছিলেন, যদিও এই রোগের ব্যাকটেরিয়া শনাক্ত করেছিলেন রবার্ট কক্।

লুই পাস্তুর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটা কাজ করেছিলেন সেটি হচ্ছে জলতাঙ্ক রোগের টিকা আবিষ্কার। অ্যানথ্রাক্সের ভ্যাক্সিন আবিস্কারের পর পাস্তুর অন্যান্য রোগের প্রতিরোধের জন্য গবেষণা শুরু করেন। তিনি জলাতঙ্ক নিয়ে কাজ করে এবং দেখেন এটি নার্ভাস সিস্টেমের একটি রোগ এবং আক্রান্ত পশুর স্পাইনাল কর্ডের নির্যাস দ্বারা অন্য প্রাণিকে জলাতঙ্কে আক্রান্ত করা যায়। এই পদ্ধতিতে তিনি রোগ প্রতিরোধে অক্ষম জলাতঙ্ক ভাইরাস উৎপাদন করেন, যা জলাতঙ্কের টিকা হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব। ১৮৮৫ সালে পাস্তুর প্রথম এক শিশু বালকের উপর এই টিকা প্রয়োগ করেন। কারণ- বালকটিকে, জলাতঙ্কে আক্রান্ত কুকুর কামড়েছিল।

পরবর্তীতে রবার্ট কক্, যিনি ‘জার্ম থিওরি’ কে উন্নত রুপ দিয়েছিলেন যদিও জার্ম থিওরি টি প্রথমে তুলে ধরেছিলেন লুই পাস্তুর।
পাস্তুরের মতবাদ ছিলো- অনুজীব থেকেই অনুজীবের সৃষ্টি এবং বেশিরভাগ রোগের কারণ হলো জার্ম। পরবর্তীতে রবার্ট কক্ বলেছিলেন-
” প্রতিটি রোগের জন্য সুনির্দিষ্ট অনুজীব দ্বায়ী, আর এই অনুজীবের জন্যই রোগের সৃষ্টি হয়। ”

কক্ সর্বপ্রথম কিছু ব্যাকটেরিয়া চিহ্নিত করেছিলেন (Anthrax bacillus, Bacillus anthracis) যা মানুষ এবং প্রাণীতে রোগ সৃষ্টি করতে পারে। এজন্য তাকে ব্যাকটেরিয়া বিজ্ঞানের জনক বলা হয়। অতঃপর তিনি অ্যানথ্রাক্স, যক্ষ্মা ও কলেরার মত রোগ সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়াগুলিকে শনাক্ত করেন এবং বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ রোগের বাহকপ্রাণীদের আবিষ্কার করেন।

বিজ্ঞানী লুই পাস্তুরের প্রস্তাবিত ধারণার উপর ভিত্তি করে, বিজ্ঞানী রবার্ট কক্ ব্যাকটেরিয়ার বিশুদ্ধ কালচারের কৌশল বের করে নিখুঁত ভাবে উপস্থাপন করেন।
একজন গবেষক কিভাবে এই অণুজীব নিয়ে কাজ করবে, কিভাবে অনুজীবগুলোকে সংক্রমিত প্রাণীদেহ থেকে সংগ্রহ করবে, কিভাবে অণুজীবগুলোকে কৃত্রিমভাবে গবেষণাগারে কালচার করবে এবং কিভাবে ধ্বংস করবেন, এ ব্যাপারে রবার্ট কক্ স্পষ্ট নির্দেশনা প্রদান করেছিলেন। তিনি চারটি স্বতঃসিদ্ধ দিয়েছিলেন যা কক্ পস্টুলেটস্ নামে পরিচিত। স্বতঃসিদ্ধ চারটি হলো-

১) রোগসৃষ্টিকারী জীবাণু সর্বদা অসুস্থ প্রাণীতে পাওয়া যাবে, সুস্থ প্রাণীদেহে নয়।

২) জীবাণুটিকে অসুস্থ প্রাণী থেকে আলাদা করা যাবে এবং আলাদা করা জীবাণুটিকে গবেষণাগারে কালচার করে পুনরুৎপাদন করা যাবে।

৩) জীবাণুটিকে যদি একটি সুস্থ প্রাণীদেহে প্রবেশ করানো হয়, তাহলে সুস্থ প্রাণীটিও অসুস্থ হয়ে পড়বে।

৪) নতুন অসুস্থ প্রাণীর দেহ থেকে রোগ-সৃষ্টিকারী জীবাণুকে পৃথক করে আবার বিশুদ্ধ ভাবে কালচার করলে একই ধরনের জীবাণু পাওয়া যাবে।

এই স্বতঃসিদ্ধগুলি আজও মৌলিক ভিত্তিস্বরূপ কেননা- কোনও নির্দিষ্ট রোগ কোনো নির্দিষ্ট জীবাণু দ্বারা সংঘটিত হয়েছে কি না- তা প্রমাণ করার
জন্য এই স্বতঃসিদ্ধগুলি আজও মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

  •  
  •  
  •  
  •  
ad0.3