পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের উপর প্লাস্টিকের প্রভাব

মৌরি তানিয়া: বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ছোঁয়ায় সভ্যতাকে আধুনিক করতে প্রযুক্তির যে উপাদানগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে তার মধ্যে অন্যতম হল প্লাস্টিক। সকালের শুরু থেকে ঘুমাতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত আমরা যা কিছু ব্যবহার করি, তার সিংহভাগ জায়গা দখল করে আছে প্লাস্টিক৷ প্লাস্টিক নিত্যদিনে এতো প্রয়োজনীয় হওয়া সত্বেও এটা পরিবেশ, মানুষ, প্রাণিকুল, বাস্তুতন্ত্রের জন্য একটি ধ্বংসাত্মক উপাদান।

প্লাস্টিক কীঃ
প্লাস্টিক হলো এমন এক ধরনের সিন্থেটিক ম্যাটারিয়াল যেটি পলিভিনাইল ক্লোরাইড (পিভিসি), নাইলন, পলিথিন হতে তৈরি হয়। এটিকে বিভিন্ন আকার দেওয়া যায়। ওজনে অনেক হালকা তাই সহজে বহনযোগ্য এবং তাপ ও বিদুৎ অপরিবাহী। এই বিশেষ বৈশিষ্ট্য গুলোই প্লাস্টিকের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি করেছে সারা পৃথিবী জুড়ে।

কেন প্লাস্টিক পরিবেশের জন্য একটি সমস্যাঃ
প্লাস্টিকের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো, এটা অপচনশীল একটি দ্রব্য। পরিবেশে একটি প্লাস্টিক রেখে দিলে, সেটা প্রায় ১০০ বছর পৃথিবীতে থেকে যায়, যা বাস্তুতন্ত্রকে দূষিত করে।

মানবস্বাস্থ্যের উপর প্লাস্টিকের প্রভাবঃ
পরিবেশে যে প্লাস্টিক জমা হচ্ছে, তা ফুড সাইকেল এর মাধ্যমে মানবদেহে অনুপ্রবেশ করছে। যা মানবদেহের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে বিরূপ প্রভাব ফেলছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সমস্যাগুলো হলো – শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, মাথাব্যথা, চোখের দৃষ্টিশক্তি হ্রাস পাওয়া, ফুসফুস,লিভার বিকল হয়ে যাওয়া, চর্মরোগ, ডায়রিয়া,টাইফয়েড, বমিবমি ভাব, বন্ধাত্ব,হরমোনাল রোগ প্রভৃতি।

ব্যবহার শেষে যে প্লাস্টিক বর্জ্য আমরা পরিবেশে ফেলে দেই,তা মাটি দূষণের প্রধান নিয়ামক। আর এসব পলিথিন, প্লাস্টিক অবিকৃত অবস্থায় মাটির গভীরে যখন প্রবেশ করে, তখন গাছের শিকড়ের বৃদ্ধিরোধ করে।

আমরা বর্জ্য নিরসনের জন্য অনেক সময় প্লাস্টিক পুড়িয়ে ফেলি। যা বাতাসে গ্রীনহাউজ গ্যাস নিঃসরণ করে যেমনঃ সালফার ডাই অক্সাইড, কার্বন ডাই-অক্সাইড, নাইট্রাস অক্সাইড প্রভৃতি।

আর এই প্লাস্টিক শুধু পানিদূষণই ঘটাচ্ছে না, নদী-সাগরের বাস্তুতন্ত্রকেও বিনষ্ট করে দিচ্ছে। আর মাইক্রোপ্লাস্টিক( micro-plastics) এর জন্য অনেকাংশেই দায়ী।

মাইক্রোপ্লাস্টিক (micro-plastics):
যেসব প্লাস্টিকের আকার ১-৫ মিমি, এদের মাইক্রোপ্লাস্টিক বলে। এগুলো অনেক ক্ষুদ্র, তাই বাতাসে উড়তে পারে। আর পানিতে মিশে জলজ বাস্তুতন্ত্রের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় ব্যাঘাত ঘটায়। সাগরের বিভিন্ন স্তরে প্লাস্টিকের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গিয়েছে। যা জলজ প্রাণীর স্বাভাবিক প্রজনন, খাদ্যসংস্থানে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে।

তাই দূষণমুক্ত পৃথিবী নিয়ে ভাবতে চাইলে, প্লাস্টিক নিয়ে বিজ্ঞানসম্মত পরিকল্পনা করতে হবে। পরিবেশ বিজ্ঞানীরা প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে আবিষ্কার করেছেন বায়োপ্লাস্টিক (Bioplastics).

কৃষিজ শস্য যেমনঃ যব,ভুট্টা প্রভৃতি থেকে রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় নির্যাস তৈরি করা হয়। এরপর এই নির্যাস ছাঁচে দিয়ে বায়োপ্লাস্টিক তৈরি করা হয়। ব্যবহার শেষে এই প্লাস্টিক পরিবেশে গেলে, তা প্রায় ৮০ দিনের মধ্যে নষ্ট হয়ে যায়। এটা পরিবেশ বান্ধব।

পাইরোলাইসিস (pyrolysis):
এটা এমন একটা প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে ফেলে দেওয়া প্লাস্টিক থেকে রাসায়নিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জ্বালানি তেল প্রস্তুত করা হয়।

প্লাস্টিক দূষক ব্যবস্থাপনার জন্য সবচেয়ে কার্যকরী পদক্ষেপ হলো, প্লাস্টিক রিসাইকেল করা৷ আর বায়োপ্লাস্টিকের ব্যবহার বৃদ্ধি করা। তাহলে প্লাস্টিক পরবর্তী প্রজন্মের জন্য আর অভিশাপ না হয়ে আশীর্বাদ হবে।

  •  
  •  
  •  
  •  
ad0.3