শিশু শ্রমের অবসান হোক -বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবসের প্রত্যাশা

হালিমা তুজ সাদিয়াঃ

ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা সব শিশুরই অন্তরে। আজকের শিশুই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। শিশুরা দেশ এবং জাতির ভবিষ্যতের আশা, আকাঙ্খা এবং স্বপ্নের পথিকৃৎ। প্রতিটি শিশুর অন্তরেই রয়েছে অন্তর্নিহিত সূর্য শক্তি। আজকের শিশুই আগামী দিনের জাতির কর্ণধার।

বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৪৫ শতাংশই শিশু। কিন্তু দারিদ্র্যের নির্মম কষাঘাতে জর্জরিত হয়ে হারিয়ে যাচ্ছে অনেক শিশুর  দুরন্ত শৈশব এবং উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ যার মূলে রয়েছে শিশুশ্রম।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা ও জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদে শিশুশ্রম প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, যখন কোনো শ্রম বা কর্মপরিবেশ শিশুর দৈহিক, মানসিক, আত্মিক, নৈতিক ও সামাজিক বিকাশের ক্ষেত্রে বিপজ্জনক ও ক্ষতিকারক হয়ে দাঁড়ায়, তখন তা শিশুশ্রম হিসেবে গণ্য হবে। ইউনিসেফ শিশুশ্রম সংজ্ঞায়িত করেছে, যে ধরনের কাজ শিশুর স্বাস্থ্য ও শিক্ষাকে ব্যাহত করে তাই শিশুশ্রম।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে শিশুশ্রম একটি ভয়াবহ সমস্যা। যে বয়সে একটি শিশু বই হাতে নিয়ে বিদ্যালয়ে দুরন্ত শৈশব অতিবাহিত করার কথা সে বয়সে তাকে বিভিন্ন ধরনের কল-কারখানা, গার্মেন্টস, ইট-ভাটায় ঘন্টার পর ঘন্টা কাজ করতে দেখা যায় যা অত্যন্ত নির্মম এবং অমানবিক।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে শিশুশ্রমের প্রথম ও প্রধান কারণ হলো ‘অর্থনৈতিক দুরবস্থা’। দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত হয়ে দুমুঠো খাবারের লক্ষ্যে শিশুরা ঝুঁকিপূর্ণ কাজে জরিয়ে যাচ্ছে। বিশেষকরে করোনা মহামারিতে এ অবস্থা দিন দিন বাড়ছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

শিশুদের অধিকার রক্ষা এবং ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম নিরসনে ২০০২ সাল থেকে জাতিসংঘের অঙ্গসংগঠন আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা ১২ ই জুন কে ” বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস ” হিসেবে পালন করে আসছে। প্রতিবছর বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৮০টি দেশে দিবসটি পালন করা হয়।

শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) এবং ইউনিসেফসহ বেশ কিছু বেসরকারি সংস্থা যৌথভাবে দিবসটি উপলক্ষে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।

২০১৯ সালে জাতিসংঘ ২০২১ সালকে ‘আন্তর্জাতিক শিশু শ্রম নিরসন বর্ষ’ হিসেবে ঘোষণা করে। এ বছরের দিবসটির মূল প্রতিপাদ্য- ‘মুজিববর্ষের আহ্বান, শিশু শ্রমের অবসান’।

শিশু শ্রমের অবসান ঘটাতে হলে সেই লক্ষ্যে কাজ করতে হবে। যেহেতু শিশুশ্রমের মূলে রয়েছে দারিদ্র্যতা তাই শিশুশ্রম বন্ধ করতে হলে প্রথমে দারিদ্রতাকে নিরসন করতে হবে। মানসিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে হবে, অন্যের শিশুকে নিজের সন্তানের মতো মনে করতে হবে। শিশুশ্রম বন্ধে গ্রাম ও শহরভিত্তিক পুনর্বাসন প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে। অভাবগ্রস্থ শিশুদের শিশুভাতা প্রদান করতে হবে। শিশুশ্রম নিরসনে যেসব আইন রয়েছে তা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে যথাযথ পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। সবার সমন্বিত উদ্যোগেই শিশুশ্রম নিরসন সম্ভব এজন্য গণমাধ্যমে বেশি বেশি প্রচার করতে হবে। শিশুদের দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ এবং শিশুদের উপর অমানবিক আচরণ প্রদর্শ করলে মালিকদের বিরুদ্ধে শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।

মনে রাখতে হবে আজকে শিশুরাই আগামী দিনের দেশ, জাতি ও রাষ্ট্র পরিচালনার সুমহান দায়িত্ব গ্রহণ করবে। এজন্য শিশুদের যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা অত্যাবশ্যক। তাদের শারীরিক, মানসিক ও মেধার বিকাশের জন্য নানা ধরনের পরিচর্যা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। শিশুদের শ্রম থেকে মুক্তি দিয়ে শিক্ষার আলোয় আলোকিত করতে হবে। জাতির ভবিষ্যৎ অনেকাংশেই নির্ভর করছে শিশুর যথোপযুক্ত বিকাশের উপর। তাই উন্নত ও সমৃদ্ধ জাতি গঠন করতে হলে শিশুর সার্বিক কল্যাণ নিশ্চিত করে তাদের সুযোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই। এজন্যই বাধ্যতামূলক শিক্ষা প্রদানের মাধ্যমে শিশুর যথাযথ বিকাশ নিশ্চিত করতে হবে।

  •  
  •  
  •  
  •  
ad0.3

Tags: ,