সাদা পলিশ করা চাল পুষ্টিকর নয়

হালিমা তুজ সাদিয়াঃ

সময় যত এগিয়েছে, বদলেছে মানুষের জীবনযাত্রা, সেই সাথে পরিবর্তন এসেছে খাদ্যাভ্যাসেও। আধুনিকতার ছোঁয়ায় মানুষ বেছে নিয়েছে স্বচ্ছতা। যত বেশি স্বচ্ছ তত বেশি আকর্ষণীয়। কিন্তু এই স্বচ্ছতার পিছু ছুটেই কতকিছু জীবন থেকে অজান্তেই হারিয়ে যাচ্ছে। এক সময় গ্রাম বাংলার মানুষ ঢেঁকি ছাঁটা চালের উপর নির্ভরশীল ছিলো কিন্তু বর্তমানে প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের কবলে পরে মানুষ খাদ্য তালিকায় বেছে নিয়েছি স্বচ্ছ পলিশ করা চাল। যার দরুণ বাড়েছে রোগ, কমছে মানুষের গড় আয়ু।

বাংলাদেশে বর্তমানে ৩.৫ কোটি টন ধান উৎপাদন হয়, যার ৫৬ শতাংশ হচ্ছে ব্রিধান-২৮ ও ব্রিধান-২৯। গ্রামের মানুষের খাদ্য তালিকায় এই দুটি ধান সরাসরি ব্যবহার হয়। আর শহরের মানুষের জন্য ব্রি-২৮ এবং ব্রি-২৯ ধানের মোটা চালকে অতি আকর্ষণীয় করার জন্য অটোরাইস মিলে ছাঁটাই করে চিকন এবং সাদা চাল তৈরি করা হয়।

ধান কলে ভাঙানো হয় এবং পলিশ করার ফলে প্রাকৃতিক স্বাদ ও চেহারা পরিবর্তিত হয়ে সাদা রং ধারণ কটে। মোটা চালের ২৫ থেকে ৩০ ভাগ ওভার পলিশিং করে বানানো হচ্ছে চিকন সাদা চাল। এভাবে ছেঁটে ফেলার কারণে চাল ধবধবে সাদা হয়। আর এভাবে মেশিনে বানানো চিকন চালের বাজার জাতকরণের জন্য নাম দেওয়া হচ্ছে মিনিকেট, নাজিরশাইল, জিরাশাইল অথবা কাটারিভোগ। সাদা ও চিকন হওয়ার কারণে ক্রেতারা চাল কিনছেন এবং প্রতিনিয়ত চাল থেকে প্রয়োজনীয় কিছু পুষ্টি উপাদান থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন- এই চাল প্রক্রিয়াজাতের কারণে এতে থাকা লৌহ, ভিটামিন, দস্তা, ম্যাগনেসিয়াম-সহ অন্যান্য পুষ্টি উপাদানের অধিকাংশই নষ্ট হয়ে যায়।

পুষ্টিবিদ’দের মতে , “প্রক্রিয়াজাত এই চালের ‘গ্লাইসেমিক ইনডেক্স’ এর মাত্রা বেশি হওয়ায় এটি শরীরের শর্করার পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়। গ্লাইসেমিক ইনডেক্স (GI) দ্বারা বোঝা যায়, কোন খাদ্য কত দ্রুত শর্করা অংশ পরিপাকের পরে গ্লুকোজ হিসেবে রক্তে প্রবেশ করে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের শস্যমান ও পুষ্টি বিভাগের গবেষণায় ব্রি-২৮ এর জিআই ৭০.৫ ও ব্রি-২৯ এর জিআই ৭৬.৩ , যা মাত্রানুযায়ী বেশি। এ নির্ধারক অনুযায়ী জিআই ৫০-এর কম হলে সহনশীল মাত্রা বলে ধরে নেয়া হয়। উচ্চমাত্রায় গ্লাইসেমিক ইনডেক্স (জিআই) ব্লাড সুগারের মাত্রা বাড়িয়ে দেয় যা ডেকে আনছে জটিল সব ব্যাধি।

অন্যদিকে লাল চাল বা বাদামী চাল অ্যান্টি-অক্সিডেন্টে ভরপুর। এই চালে প্রচুর পরিমানে অ্যানথোসায়ানিন থাকে। এই অ্যান্টি–অক্সিডেন্ট লাল রঙের ফলমূল ও শাকসবজিতেও পাওয়া যায়। লাল চাল কে এতো প্রক্রিয়াজাতকরণ বা পলিশ করার দরকার হয় না যার দরুন এতে রাইস ব্রান সহ পুষ্টিমান ঠিক থাকে। লাল চালে খাদ্য আঁশের পরিমান অনেক বেশি থাকে। আর যেকোনো খাবারে আঁশ থাকলে তা স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। লাল বা বাদামী চাল ব্যবহারের দ্বারা ডায়াবেটিস, হাড়ের সমস্যা, হৃদরোগ অনেকাংশেই প্রতিরোধ করা যায়। এটি হজম সহায়ক, ওজন এবং কোলোস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রনে সহায়তা করে।

তবে লাল চাল যদি আর্সেনিকপ্রবণ এলাকায় উৎপাদিত হয় তাহলে ধানগাছ খুব সহজেই মাটি ও পানি থেকে আর্সেনিক শুষে নেয়। এই আর্সেনিক ধানের খোসা কুঁড়াতে বেশি থাকে। ধান থেকে খোসা ছাড়ানোর পর তৈরি লাল চালে আর্সেনিক–দূষণের আশঙ্কা বেশি। চাল সাদা করার সময় লাল চালের কয়েক পরত আবরণ উঠে যায়। ফলে আর্সেনিকের মাত্রা সাদা চালে কম।
তবে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষকদের মতে, ‘এ দেশের চালে আর্সেনিক খুব কম থাকে, যা স্বাস্থ্যের জন্য হুমকি নয়। ধানগাছের শিকড় আর্সেনিককে শস্যদানা পর্যন্ত যেতে বাধা দেয়।’ তাই অনায়সেই লাল চাল বা বাদামী চাল গ্রহন করা যাবে। সবকিছু বিবেচনা করে সাদা চালের দিকে ঝুঁকে না পরে লাল চালের দিকে জনসাধারণকে উদ্ভুদ্ধ করতে হবে কেননা সাদা চালের ভাতের চেয়ে বাদামী চাল বা লাল চালের ভাত অনেক বেশি পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ। যা একাধিক গবেষণায় পরীক্ষামূলকভাবে প্রমানিত।

  •  
  •  
  •  
  •  
ad0.3

Tags: , , , , ,