উম্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে কৃষিতে স্নাতক চালু নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ

সম্প্রতি বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাউবি) স্কুল অব এগ্রিকালচার এন্ড রুরাল ডেভেলপমেন্ট’ পরিচালিত ৪ বছর মেয়াদি ‘ব্যাচেলর অব সায়েন্স ইন এগ্রিকালচার (বিএসসিএজি)’ কোর্সে শিক্ষার্থী ভর্তির জন্যে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এসএসসি ও এইচএসসি বিজ্ঞান/সমমান পর্যায়ে ন্যূনতম জিপিএ-৩সহ মোট জিপিএ-৭ থাকলেই যে কোনো শিক্ষার্থী ওই কোর্সে ভর্তির জন্যে আবেদন করতে পারবেন বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়। তবে বিজ্ঞপ্তিটি প্রকাশের পরপরই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ নিয়ে দেখা দেয় মিশ্র প্রতিক্রিয়া।

প্রতিক্রিয়ায় দেখা যায়, একপক্ষ বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান ও পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলে সেখানে কৃষিশিক্ষায় উচ্চতর ডিগ্রী প্রদানের বিষয়টিকে উদ্বেগের সাথে দেখছেন। আবার যেখানে কৃষিগুচ্ছতে এবার এসএসসি ও এইচএসসি পর্যায়ে মোট জিপিএ- ৮.৫ নির্ধারণ করা হয়েছে সেখানে জিপিএ ৭ এর বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে । এছাড়া, একজন শিক্ষক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, কৃষি একটি টেকনিক্যাল বিষয়। প্রকৌশলী আর চিকিৎসকদের পাশাপাশি এই শিক্ষার পেশার মর্যাদা রক্ষায় আমাদের দীর্ঘ সংগ্রাম আর ত্যাগ করতে হয়েছে। এখন এই ডিগ্রি যদি উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় হতে দেয়া শুরু হয় তবে এই পেশার মর্যাদা ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হবে। অচিরেই ভেটেরিনারি, ফিসারিজ, অ্যানিম্যাল হাজবেন্ড্রি নামেও ডিগ্রি চালু হবে। বাংলাদেশ ভরে যাবে নানা রকমের কৃষিবিদে। এ নিয়ে ফেজবুকে সমালোচনা ও উদ্বেগের পাশাপাশি, কৃষিসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সমিতি ও সংগঠনকে লিখিত প্রতিবাদ জানাতে দেখা গেছে। আবার অনেকেই বলছেন, এত কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থাকতে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়কে কৃষিতে ডিগ্রী চালু করতে হবে কেন?

বর্তমানে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্য়ালয়, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা কৃষি বিশ্ববিদালয় এবং হবিগঞ্জ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়সহ কয়েকটি বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় হতে কৃষিতে স্নাতক ডিগ্রী দেয়া হচ্ছে। এছাড়া রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় অধিভূক্ত বেশ কয়েকটি কলেজেও কৃষিতে স্নাতক ডিগ্রী প্রদান করা হচ্ছে। সম্প্রতি কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে উপাচার্য। কৃষি দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হওয়ায় সরকার মনে করছে কৃষিপ্রধান এই দেশের জনসংখ্যা বিবেচনায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে কৃষিতে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সুযোগ এখনও সীমিত। তাই নতুন নতুন কৃষি শিক্ষাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান তৈরি করে যাচ্ছে। প্রতি বছর উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগ হতে উত্তীর্ণ অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী কৃষিতে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণে আগ্রহ থাকলেও সে সুযোগ পাচ্ছে না।

উম্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় সুত্রে জানা যায়, কৃষি প্রধান বাংলাদেশে কৃষি শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের গুরুত্ব উপলব্ধি করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আইনের ২৩(১) ধারা অনুযায়ী ১৯৯৬ সালে বাউবিতে কৃষি ও পল্লী উন্নয়ন স্কুল স্থাপন করে। বর্তমানে বাউবিতে কৃষি ও পল্লী উন্নয়ন স্কুলে (ফ্যাকাল্টি) Agronomy, Entomology, Irrigation and Water Management, Aquaculture, Poultry Science, Soil Science বিষয়ে মাষ্টার্স  প্রোগ্রামে শিক্ষার্থী ভর্তির সুযোগ রয়েছে। এছাড়া স্কুলের শিক্ষকদের সরাসরি তত্ত্বাবধানে বাউবির BAgEd ডিগ্রিধারীদের জন্য ২ বছর মেয়াদি Master in Sustainable Agriculture and Rural Livelihood (MSARL) প্রোগ্রাম ২০১৯ সাল হতে পরিচালিত হচ্ছে। শিক্ষা, মানবিক, ভাষা, বাণিজ্য ও বিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতোকোত্তর (Mphil, PhD) প্রোগ্রাম ইতোমধ্যে ঢাকা ও গাজীপুর ক্যাম্পাসে সংশ্লিষ্ট স্কুলের তত্ত্বাবধানে শুরু হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় কৃষি ও পল্লী উন্নয়ন স্কুল ২০১৮ সালে MS ও ২০১৯ সালে MSARL প্রোগ্রাম চালু করেছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কৃষি শিক্ষার গুরুত্ব বিবেচনা করে ২০১৫ সালে ক্যাম্পাসে ল্যাব ও মাঠ গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন করে। এসব প্রোগ্রাম থেকে শিক্ষা ও সনদপ্রাপ্ত হয়ে অনেক গ্রাজুয়েট যেখানে সুনামের সাথে কর্মক্ষেত্রে অবদান রাখছেন সেখানে কৃষিতে স্নাতক খোলা নিয়ে সমালোচনা কতটুকু যৌক্তিক তা নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন। কৃষি সংশ্লিষ্ট এসব প্রোগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়টির কৃষিতে উচ্চতর শিক্ষা ও গবেষনায় সক্ষমতাকে প্রমান করে। তাছাড়া বাউবি আইনে কৃষি বিষয়ক শিক্ষাদানের সুযোগ তৈরির বাধ্যবাধকতা থেকে এটি করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

বর্তমানে কৃষি ও পল্লী উন্নয়ন স্কুলে কৃষি, কৃষি প্রকৌশল, মাৎস্য ও প্রাণিসম্পদ বিষয়ের ৭ জন অধ্যাপক ও ৪ জন সহযোগী অধ্যাপক কর্মরত রয়েছেন। সকলেরই সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পিএইচডি ডিগ্রি এবং দেশে-বিদেশে উচ্চতর প্রশিক্ষণ ও গবেষণার অভিজ্ঞতা রয়েছে। কৃষি বিষয়ক নতুন শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়াধীন থাকায় এবং গবেষণা ল্যাব উন্নয়নের জন্য বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

বিশ্ববিদ্যালয় সুত্রে জানা যায়, কৃষি ও পল্লী উন্নয়ন স্কুলের চলমান প্রোগ্রামসমূহের কোর্স কারিকুলাম ও সিলেবাস এবং কোর্সবই বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য কৃষি সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞ শিক্ষকদের সমন্বয়ে প্রণয়ন করা হয়েছে। চলমান প্রোগ্রামসমূহের কারিকুলাম, পরীক্ষাসহ অন্যান্য কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করে প্রোগ্রাম পরিচালনায় যথাযথ অবদান রাখছেন। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ও বর্তমান অধ্যাপকবৃন্দ চ্যান্সেলর কর্তৃক বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিলের সদস্য হিসেবে মনোনীত হয়ে দীর্ঘদিন যাবৎ বাউবি’র শিক্ষা কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন।

এ প্রসঙ্গে বাউবির শিক্ষকরা বলেন, কৃষি শিক্ষার যথাযথ মান নিশ্চিত করতে শিক্ষাকার্যক্রম ও গবেষণার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা করেই ক্যাম্পাসে এ ডিগ্রি চালুর উদ্দ্যোগ নিয়েছে বাউবি প্রশাসন। তারা বলেন, দেশে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া এ ডিগ্রি প্রদানকারী বিশ্ববিদ্যালয় এটিই প্রথম নয়। দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি, অনেক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়েও এ ডিগ্রি প্রদান করা হচ্ছে। দেখা যায়, কিছু সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও বিশেষায়িত ডিগ্রী দেওয়া হচ্ছে, আবার বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়েও সাধারণ বিষয় খোলা হচ্ছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন শিক্ষক ও গবেষক তাদের অভিক্ষতা থেকে বলেন, হয়তবা উম্মুত বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠদান পদ্ধতি ও কিছু কিছু ক্ষেত্রে শিক্ষার মান নিয়ে এ শংকা তৈরি হয়েছে। তবে এ শংকা শুধু উম্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে কেন? নতুন নতুন কৃষিভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং কিছু বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান নিয়ে শংকা থাকতে পারে। নতুন নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যেখানে ভাড়া অবকাঠামো নিয়ে কোনভাবে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। যেখানে নিজস্ব জায়গা নেই, প্রয়োজনীয় জনবল নেই, মাঠ নেই, গবেষনাগার নেই, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি নেই, কেমিক্যাল নেই, কোন কোন ক্ষেত্রে এক বা একাধিক গবেষণাগারে সববিষয়ে নামমাত্র ব্যবহারিক শিক্ষা প্রদান করতে হচ্ছে সেখানে প্রতিষ্ঠিত একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছু সীমাবদ্ধতা থাকলেও তা কাটিয়ে উঠে শিক্ষার মান উন্নত করা জঠিল কিছু নয়।

দেশের কৃষিভিত্তিক বিশ্বদ্যিালয়গুলো গুচ্ছপদ্ধতিতে ভর্তির ক্ষেত্রে যেখানে এবার ৮.৫ র্নিধারণ করেছে সেখানে বাউবিতে ৭ নির্ধারন করায় অনেকে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জানা যায়, এবছর কৃষিতে সিলেকশন বাতিল করায় তা গতবারের ৮ থেকে বাড়িয়ে ৮.৫ করা হয়েছে যাতে বেশী শির্ক্ষাথী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে না পারেন। তবে এটিও ঠিক যে গুচ্ছে থাকা নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বারবার অপেক্ষমান তালিকা থেকে ভর্তি করিয়েও আসন ফাঁকা থাকতে দেখা গেছে। কিছু কৃষিভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয়কে গুচ্ছতে আসার আগে তাদের ভর্তিতে কখনও ৬ বা ৭ জিপিএ নির্ধারণ করতে দেখা গেছে। এছাড়া একটি পুরাতন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভূক্ত বেশকিছু কলেজে কৃষিতে স্নাতক (সম্মান) ডিগ্রী প্রদান করা হচ্ছে যেখানে জিপিএ ৭.৫ নির্ধারণ করার পাশাপাশি কৃষি ডিপ্লোমাধারীদের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। ভর্তিচ্ছু অনেকেই বলছেন, যেখানে অনেক শিক্ষার্ধী মেধা যাচাইয়ের সুযোগ পাচ্ছেন না সেখানে উম্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় জিপিএ কিছুটা কমিয়ে অধিক শিক্ষার্থীদের ভর্তিতে অংশগ্রহনের সুযোগ দিয়ে প্রতিযোগিতামূলক বাছাইয়ের মধ্য দিয়ে সীমিত আসন পুরণ করবে তা সত্যিই প্রশংসনীয়। তবে কৃষির মত গুরুত্বপূর্ণ টেকনিক্যাল শিক্ষায় অপেক্ষাকৃত মেধাবীদের বেছে নিতে সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ অনেকের।

  •  
  •  
  •  
  •  
ad0.3