হাইব্রিড আমের রঙিন জাত উদ্ভাবন করলেন ড. জমির

চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি:
আম, সুস্বাদু ও রসালো ফল। দেশ-বিদেশে আমের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। এ চাহিদার কথা মাথায় রেখে আমের মান বৃদ্ধি ও জাত উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছেন ফল গবেষকরা। বিদেশে আম রপ্তানির ক্ষেত্রে আমটি আকর্ষণীয় ও রঙিন হতে হয়, সে বিষয়টি চিন্তা করেই দীর্ঘ গবেষণায় হাইব্রিড আমের রঙিন জাত উদ্ভাবনে সফল হয়েছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা. ড. মো. জমির উদ্দিন।

উদ্ভাবিত তিনটি রঙিন হাইব্রীড ০৩৪, হাইব্রিড ০৫৮, হাইব্রিড ০৫৯ ছাড়াও দেশি-দুইটি উন্নত আমের জাত, বারি আম ৩ ও লাংড়া জাতের সংমিশ্রণে হাইব্রীড ০৬৭ নামে নতুন আরো একটি জাত গবেষণা মাঠে ভাল ফল দিচ্ছে। জাতটি রঙিন না হলেও এটি খেতে খুবই সুস্বাদু হওয়ায় এটিও হাইব্রিড আমের জগতে নতুন একটি সংযোজন হবে বলে আশাবাদী এ গবেষক ড. মো. জমির উদ্দিন।

গবেষণার বিষয়ে বলতে গিয়ে ড. মো. জমির উদ্দিন বলেন, ভিন্ন বৈশিষ্টের দুটি আমের জাতের মধ্যে মিলন ঘটিয়ে নতুন জাত উদ্ভাবনের প্রক্রিয়াটিকে হাইব্রিডাইজেশন বলে। আর এ প্রক্রিয়ায় নতুন উদ্ভাবিত জাতটিকে হাইব্রিড আম বলা হয়।

তিনি বলেন আমরা একটা লক্ষ্য নিয়ে একটি জাতের সাথে অন্য জাতের ক্রস করে (মিলন ঘটিয়ে) থাকি। যেমন অনেক আমের জাত একবছর ভালো ফলন দিলে পরের বছর ভালো ফলন দেয় না, কোনটা আবার রংয়ের দিক থেকে আকর্ষণীয় নয় এসব বিষয় চিন্তা করেই অর্থাৎ রঙিন জাতের সাথে রঙবিহীন জাতের এবং নিয়মিত জাতের সাথে অনিয়মিত জাতের মিলন ঘটিয়ে আমরা নতুন জাত উদ্ভাবন করে থাকি।

নতুন হাইব্রি আমের জাত যেমন বাড়াবে আমের উৎপাদন তেমনি রঙিন হওয়ায় আকৃষ্ট হবেন বিদেশি ক্রেতারা এমনটায় মনে করেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ আঞ্চলিক উদ্যানতত্ব গবেষণা কেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. হামিম রেজা।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের মাটি ও জলবায়ু আম চাষের জন্য অত্যান্ত উপযোগী, আমাদের দেশে যে বাণিজ্যিক জাত রয়েছে তা খুবই গুণগতমানে ভালো, কিন্তু এর রং না থাকায় এবং রোগ-পোকার প্রতি সংবেদনশীল হওয়ায় বিদেশের বাজারে এর চাহিদা খুবই কম, তবে ক্রসের মাধ্যমে সমস্যাগুলো দূর করে জাত উন্নয়ন সম্ভব। এরইমধ্যেই চাঁপাইনবাবগঞ্জ আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রে হাইব্রিড আমের রঙিন জাত উদ্ভাবনে গবেষণা চলছে। আমাদের তিনটি হাইব্রিড রঙিন জাত মুক্তায়নের অপেক্ষায় আছে, অচিরেই সেগুলো রিলিজ করতে আমরা সক্ষম হব। আরো নতুন নতুন জাত উদ্ভাবনে আমাদের গবেষণা অব্যাহত আছে।

গত ২০০২ সালে বারি আম-১ এর সাথে দেশীয় বাণিজ্যক জাত গোপাল ভোগের ক্রস করে ( মিলন ঘটিয়ে) হাইব্রিড ৩৪ নামের নতুন হাইব্রিড জাতটি পাওয়া যায়। এর ৫ বছরের মাথায় গাছটি প্রথম ফুল ও ফল দেয়, ধারাবাহিকভাবে গাছটি প্রতিবছরই আশানুরুপ ফল ও ফুল আসছে। প্রতিটি আমের ওজন হয় ৩৯০ গ্রাম আর এই আমের টিএসএস (মিষ্টতা) শতকরা ১৭ ভাগ ও এর ভক্ষণযোগ্য অংশ শতকতা ৭২ ভাগ। রঙিন এ আমটি মধ্য জুনে পাকে। নতুন এ আমটি সম্পর্কে বলতে গিয়ে ড. জমির উদ্দীন জানান, আমাদের দেশে জ্যাম জেলি, জুস তৈরির উপযোগী আমের জাত নেয় বলতেই চলে, সেক্ষেত্রে আমের প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে নতুন এ জাতটি অনেক বেশি সম্ভাবনাময়।

২০০৫ সালে বারি আম ৩ এর সাথে আমেরিকার ফ্লোরিডার পালমার জাতের আমের সংমিশ্রণ ঘটিয়ে এ জাতটি উদ্বোবন করা হয়। জাতটি প্রতিবছরই ফল দেয়, প্রতিটি আমের ওজন হয় ২৫০ গ্রাম। আমটি খাওয়ার উপযোগী অংশ শতকরা ৮০ ভাগ, এর টিএসএস (মিষ্টতা) শতকরা ২৩.৫০ ভাগ। রঙিন এ জাতটি মধ্য জুলাইয়ে ফল সংগ্রহের উপযোগী হয়।

Cpmango4

২০০৫ সালে আরো একটি জাত হাইব্রিডাইজেশনের মাধ্যমে উদ্ভাবনে সাফল্য পান ড. জমির। গবেষণা মাঠে হাইব্রিড ৫৯ নামের এ জাতটি বারি আম ৩ এর সাথে আমেরিকার ফ্লোরিডার পালমার এর সংমিশ্রণে পাওয়া যায়। নতুন এ জাতের আমের, প্রতিটির ওজন ২৮০ গ্রাম, এর ভক্ষণযোগ্য অংশ শতকরা ৭৬ ভাগ। এর টিএসএস (মিষ্টতা) শতকরা ২২ ভাগ। এটিও মধ্য জুলাইয়ে ফল সংগ্রহের উপযোগী হয়। পরের বছরই ২০০৬ সালে বারি আম ৩ এর সাথে ল্যাংড়া আমের সংমিশ্রণে আরো একটি হাইব্রিড জাত উদ্ভাবন করেন এ গুণী বিজ্ঞানী।

গবেষণা মাঠে হাইব্রিড ৬৭ নামের জাতটি সম্পর্কে বলতে গিয়ে ড. জমির জানান, নতুন এ জাতটি প্রতিবছরই ফল দেয়, আমটি মধ্য জুনে পাকে, পাকলে আমের রং হলুদ বর্ণ ধারণ করে, এ আমের ওজন প্রতিটি ৩২৫ গ্রাম। আর এ আমের খাওয়ার উপযোগী অংশ শতকরা ৮০ ভাগ এবং এর টিএসএস (মিষ্টতা) শতকরা ২৫ ভাগ।

প্রসঙ্গত দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে ড. মো. জমির উদ্দিন হাইব্রিড আমের জাত উদ্ভাবনে কাজ করে যাচ্ছেন, তার হাত ধরেই উদ্ভাবিত হয়েছে বাংলাদেশে প্রথম হাইব্রিড আমের জাত ‘বারি আম-৪’। ২০০৩ সাথে এটি মুক্তায়িত হওয়ায় পর কৃষক পর্যায়ে ব্যাপক বিস্তার লাভ করেছে।

তিনিই প্রথম হাইব্রিড আমের ওপর গবেষণা করে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ থেকে ২০১৩ সাথে সন্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন।

গুণী এ বিজ্ঞানী অসময়ে আমের নতুন একটি জাত উদ্ভাবনে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন, জাতটি এইমধ্যে অসময়ে ফল দিয়েছে। গবেষণা মাঠে এসওএম-১০৪৮ নামে নতুন এ জাতটি আরো দু-এক বছর গবেষণার পর মুক্তায়িত হবে বলে আশাবাদী এ গবেষক। আমের আঁটি থেকে প্রাপ্ত (চান্সসিডিং) সুমিষ্ট আমের নতুন একটি জাত এরইমধ্যে মুল্যায়ন শেষ হয়ছে। এখন মুক্তায়নের অপেক্ষায় আছে ও বর্তমানে তিনি অসময়ে কাঁঠালের একটি জার্মপ্লাজম নিয়ে গবেষণা করছেন।

  •  
  •  
  •  
  •  

Tags: