বিশ্ব শরণার্থী দিবস আজ

হালিমা তুজ সাদিয়া:

আজ বিশ্ব শরণার্থী দিবস। প্রতিবছর এই দিনে অর্থাৎ ২০ জুন বিশ্বে ‘বিশ্ব শরণার্থী দিবস’ পালিত হয়। এ দিবসটি পালন মূল উদ্দেশ্য হলো- শরণার্থীদের অবস্থা সম্পর্কে বিশ্বের প্রতিটি দেশের জনসাধারণের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করার পাশাপাশি তাদের সহায়তা প্রদান করা। অর্থাৎ বিশ্বব্যাপী শরণার্থীদের অমানবিক অবস্থার প্রতি বিশ্ব নেতৃবৃন্দের দৃষ্টি আকর্ষণ করা। জাতিসংঘ ২০০১ সাল থেকে প্রতিবছর ২০ জুন বিশ্ব শরণার্থী দিবস হিসেবে উদযাপন করে আসছে।

বাংলাদেশের মতো পৃথিবীর প্রায় সব দেশ-ই এই দিবসটি  উদযাপন করে থাকে। নানা আয়োজনে অনুষ্ঠিত দিবসটিতে জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট অঙ্গ সংস্থা, সরকার ও সরকারি কর্মচারী, নাগরিকসমাজ, রাজনৈতিক সংগঠন, মানবতাবাদী গ্রুপ, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বসহ সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ অংশগ্রহণ করে থাকে। এ বছরের দিবসটির প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে,
“Together we heal, learn and shine. No one is safe till everyone is safe.”
করোনা মহামারীর বিরুদ্ধে সবাইকে একযোগে লড়াইয়ের বিষয়টিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে যাতে এই কঠিন সময়ে শরণার্থীরা নিজেদের একা না মনে করে। সবাইকে সাথে নিয়েই করোনার মোকাবিলায় সোচ্চার হতে হবে।

শরণার্থী হয়ে জীবন যাপন করা অত্যন্ত বেদনার। শরণার্থীরা  সাধারণত খুব-ই অরক্ষিত থাকে, বিশেষ করে মানসিক ও অর্থনৈতিকভাবে। তাদের ঘিরে থাকে যুদ্ধ, সহিংসতা, দাঙ্গা, ক্ষুধা, রোগ, হতাশা ও মানসিক যন্ত্রণার বিভীষিকাময় স্মৃতি আর কাহিনি। বাধ্য হয়ে জন্মভূমি ত্যাগ করা যে কতটা কষ্টের সেটা বাংলাদেশের মানুষের অজানা থাকার কথা নয়। একসময় এদেশের মানুষদেরও দেশ ছেড়ে প্রতিবেশী ভারতে শরণার্থী হয়ে আশ্রয় নিতে হয়েছিল। সেই লাখ লাখ শরণার্থীর জীবনের অমানবিক দুঃখ-কষ্ট আর বেদনার ইতিহাস এদেশের মানুষদের অতি সহজেই বিশ্বের সব শরণার্থীর জীবনকে উপলব্ধি করতে সাহায্য করে। এদেশের মানুষ তবুও নিজ ভূমিতে ফিরে আসতে পেরেছিলো যুদ্ধে জয় লাভের মাধ্যমে কিন্তু যেসব শরণার্থীদের জীবনে নিজ ভূমিতে ফিরে যাওয়ার সামান্য আশার আলো দেখতে পাওয়া যায় না, তাদের  চরম হতাশা আর যন্ত্রণা দিন দিন কুরে কুরে খায়।

জাতিসংঘ শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনের (ইউএনএইচসিআর) উপাত্ত থেকে জানা যায় যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা এখনই সবচেয়ে বেশি। বিশ্বে ৬৮ দশমিক ৫ মিলিয়ন বাস্তুহারার মধ্যে ২৫ দশমিক ৪ মিলিয়ন শরণার্থী রয়েছে। শরণার্থী ছাড়াও বিশ্বজুড়ে ৪০ মিলিয়ন বাস্তুহারা মানুষ এবং তিন মিলিয়নের বেশি শরণার্থী রয়েছে। বাংলাদেশে ১০ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে তাদেরকে শরণার্থী হিসেবে সংজ্ঞায়িত না করলেও মূলত তারা শরণার্থীদের মতোই এ দেশে রয়েছে। তারা নির্যাতনের শিকার হয়ে জীবন বাঁচাতে ভিটেমাটি ছেড়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। সর্বোপরি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে নিয়ে বর্তমান বাংলাদেশ সরকার রোহিঙ্গাদের তাদের নিজের ভিটেমাটিতে নিরাপদ ও সম্মানজনক পুনর্বাসনের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে যা বাংলাদেশর জন্য একটা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তাই যেসব দেশ আশ্রয়প্রার্থীদের আশ্রয় দিয়েছে তাদের ওপর সৃষ্ট চাপ কমানোর জন্য বিশ্ব সম্প্রদায়কে সহায়তা সম্প্রসারিত করতে হবে। একই সঙ্গে সবাইকে আশ্রয়প্রার্থীদের পুনর্বাসন করার উপায় সংবলিত প্রস্তাব নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। কারণ এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তা না করতে পারলে ভবিষ্যতে যেমন কোনো দেশই শরণার্থীদের আশ্রয় দিতে উৎসাহিত হবে না, তেমনি শরণার্থীদের ন্যায্য অধিকার থেকে তারা বঞ্চিত হবে, অর্থাৎ তাদের নিজস্ব ভূমিতে ফিরে যাওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।

যুদ্ধ, বিরোধ বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার হয়ে যেসব মানুষ তাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে এসে উদ্বাস্তুদের খাতায় নাম লিখিয়েছে, তাদের দুঃখ-কষ্ট আর দুর্দশাকে  অনুভব করতে হবে এবং তাদের বেঁচে থাকার প্রয়াসে সাধ্যাতীত সাহায্য-সহযোগিতা নিয়ে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।

  •  
  •  
  •  
  •