পনজি স্কিম, আমাদের যা জানা জরুরি

আবু সায়েম দোসরঃ সাধারণত ব্যবসায় মুনাফা অর্জিত হয় কোন পণ্য বা সেবা ক্রেতাকে বুঝিয়ে দেয়ার পর তার মূল্য পরিশোধিত হলে তা থেকে। পুরো প্রক্রিয়ায় পণ্য এবং বাজারজাতকরণের উপর নির্ভর করে সফলতা বা ব্যর্থতা। এখানে পারিপার্শ্বিক অনেক ব্যাপার বিবেচনা করে লাভ ক্ষতি নির্ধারিত হয়।

কিন্তু একটা বিশেষ ধরণের ব্যবসা আছে যা এই আদর্শ প্রক্রিয়া মেনে চলে না। মূলত সেখানে পূর্ববর্তী বিনিয়োগকারী মুনাফা বুঝে পান পরবর্তী বিনিয়োগকারীর টাকা থেকে। এখানে পণ্য কেনা বেচা মূখ্য নয়, বরং নতুন কত সংখ্যক বিনিয়োগকারী কত বেশি পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করলো তাই মূখ্য। সেখান থেকেই পূর্ববর্তীদের মুনাফা কিংবা আসল বুঝিয়ে দেয়া হয়। এই পদ্ধতিকে বলে পনজি স্কিম। এটি পিরামিড স্কিম, নেটওয়ার্ক মার্কেটিং, মাল্টি লেভেল মার্কেটিং (এম. এল. এম.) এসবের সাথে খুবই সাদৃশ্যপূর্ণ।

১৯১৯ সালে ইতালিয়ান নাগরিক চার্লস পনজি প্রথম এমন স্কিমের ধারণা দেন। পরবর্তীতে অবশ্য তিনি বিভিন্ন দেশে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত হন, সাজাপ্রাপ্তও হন। পনজি স্কিম মূলত বড় সংখ্যক গ্রাহক বা ভোক্তার কাছ থেকে বড় অংকের টাকা নিয়ে কিছু গ্রাহকদের সেবা/পণ্য বুঝিয়ে দিয়ে বাকিটা কুক্ষিগত করাকে বোঝায়। এর সাথে মানি লন্ডারিং এর সম্পর্ক আছে বলে ধারণা করা হয়।

ছবি- চার্লস পনজি, পনজি স্কিমের জনক। (উইকি)

বাংলাদেশ পূর্বে অনেক এম. এল. এম. ব্যবসার ধোঁকাবাজির দেখা পেয়েছে। পথে বসেছে হাজার হাজার বিনিয়োগকারী। পুঁজি খুইয়েছেন বহু মানুষ। ডেসটিনি ২০০০ ছিল তেমন একটি প্রকল্প। পণ্যের ব্যাপারে তেমন গুরুত্ব না দিয়ে শুধু বিভিন্ন পর্যায়ে বিনিয়োগকারী বাড়িয়ে সে অনুসারে মুনাফা ভাগ করে দেয়া হত তার উপরের পর্যায়ের বিনিয়োগকারীদের। এতে করে কিছু পর্যায় পর্যন্ত অনেকে মুনাফা কিংবা আসলও পেয়েছেন। তবে একেবারে নিচের পর্যায়ের বিনিয়োগকারীরা খুইয়েছে অর্থ-সম্পদ ও সময়। বাংলাদেশ সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তড়িৎ ব্যবস্থায় হয়ত অপরাধীদের ধরা সম্ভব হয়েছে, কিন্তু হারানো পুঁজি ফেরত পাওয়া যায়নি।

এরপর বাংলাদেশ আরও অনেক ছোটখাটো এম.এল.এম কিংবা নেটওয়ার্ক মার্কেটিং প্রকল্পের দেখা পেয়েছে। কিছু কিছু সফলও হয়েছে। তবে অধিকাংশই জনগণের সচেতনতা এবং প্রশাসনের তৎপরতায় সফলতার মুখ দেখেনি, বেঁচে গেছে অনেক পরিবার।

সম্প্রতি অনলাইন কেনাবেচায় পনজি স্কিমের শিকার হচ্ছেন ভোক্তারা এমনটা ধারণা করা হচ্ছে। ইভ্যালি, আলেশামার্ট, ধামাকা, আলাদিনের প্রদীপ সহ বেশ কিছু জনপ্রিয় ই-কমার্স মাধ্যমে ভোক্তারা পণ্য অর্ডার করেও সময়মত বুঝে না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অনেক সময় নির্ধারিত সময়ের চার-পাঁচ গুণ সময় পর্যন্ত অপেক্ষার পর টাকা ফিরিয়ে দেয়া হয়, অনেকের ক্ষেত্রে সেটাও হয়না। ভোক্তাদের এ ব্যাপারে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অভিযোগের অন্ত নেই।

এমন পরিস্থিতিতে দেশের বিভিন্ন প্রথমসারির ব্যাংক তাদের সেবা ব্যবহার করে সেসব ই-কমার্স সাইট থেকে কেনাকাটা করতে বিরত থাকতে নির্দেশ দিয়েছেন। বাংলাদেশ ব্যাংক সহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কড়া নজরদারিতে রেখেছে সেসব সাইটকে। জনপ্রিয় ই-কমার্স সাইট ইভ্যালির ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করার নির্দেশও দেয়া হয়েছিল কিছুদিন আগে, পরবর্তীতে অবশ্য তা উঠিয়েও নেয়া হয়। কিন্তু গ্রাহকদের ভোগান্তির শেষ হয়নি।

সম্প্রতি নজর কেড়েছে বিভিন্ন জনপ্রিয় ব্র্যান্ডগুলোর ইভ্যালির গিফট ভাউচার ব্যবহার করতে দেয়া বাতিল করায়। অভিযোগ পাওয়া গেছে ইভ্যালি গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে গিফট ভাউচার বিতরণ করে। কিন্তু ব্র্যান্ডগুলোকে মূল্য পরিশোধ করেনা। এ কারণেই তারা বাধ্য হয়ে এ সেবা বন্ধ করে দেয়। এতে করে নিজের বিনিয়োগ নিয়ে আশংকায় আছেন হাজার হাজার গ্রাহক। সরকার ইভ্যালি সহ এসব ই-কমার্স সাইটের মনিটরিং করার জন্য এজেন্ট নিয়োগ দেবার কথা ভাবছে।

ইভ্যালি দিকে সন্দেহের তীর যাচ্ছে পনজি স্কিম ব্যবহারের। এর কারণ হিসেবে মনে করা হচ্ছে তারা প্রত্যেকটি পণ্য ৫০ থেকে ৬০ কিংবা ৭০% ছাড়ে ক্রেতাদের দেয়ার প্রতিজ্ঞা করে। অথবা প্রায় দেড়গুণ-দ্বিগুণ ক্যাশব্যাক ধরণের মুখরোচক অফার করে তারা ক্রেতাদের আকৃষ্ট করে। অগ্রিম টাকাও গ্রহণ করে। কিন্তু পণ্য পেতে ঘটনা ভেদে ছয় থেকে সাত মাস পর্যন্ত সময় তারা নেয়। আবার বিক্রেতা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকেও টাকা বুঝিয়ে দিতে গড়িমসি করে। সাধারণ ব্যবসা প্রক্রিয়ায় প্রত্যেকটি ধাপে খুব স্বল্প মুনাফা করা সম্ভব। ইভ্যালি সেখানে এত কমে কিভাবে পণ্য দিচ্ছে সেটি নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি থেকে যায়। যদিও তারা বলছে যে উৎপাদকের কাছ থেকে অনেক কম মূল্যে অধিক পরিমাণে পণ্য কিনে এনে তারা খুচরা বিক্রয় করে। কিন্তু এরপরও প্রশ্ন থেকে যায় এত বড় মূল্য ছাড় ও দীর্ঘসূত্রিতা নিয়ে।

গ্রাহক বা ভোক্তা হিসেবে সাধারণ মানুষের যা জানা প্রয়োজন তা হলো এমন পনজি স্কিম, পিরামিড স্কিম, নেটওয়ার্ক মার্কেটিং কিংবা মাল্টি লেভেল মার্কেটিং কোন স্থায়ী ব্যবসা পদ্ধতি না। এসবের উদ্দেশ্য মূলত বিরাট অংকের অর্থ হাতিয়ে নেয়া। এভাবেই বড় সংখ্যক বিনিয়োগকারী পথে বসে যান। ভোক্তাদের মনে রাখতে হবে একেবারেই ঝুঁকি ছাড়া বড় অংকের মুনাফার আশ্বাস যদি কেউ দেয় তবে তা কোন কনভেনশনাল বিজনেস স্ট্র্যাটেজি থেকে লব্ধ হতে পারেনা। সেখানে অবশ্যই বড় কোন ঝুঁকি রয়েছে যা ইচ্ছাকৃতই ভোক্তার নজরের বাইরে রাখা হচ্ছে। আজ অথবা কাল সে ঝুঁকি অবশ্যই বিপদ হয়ে দাঁড়াবে।

দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে এখন পর্যন্ত খুব তড়িৎ সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং চেষ্টা করছে এ ব্যাপারে সবাইকে সাবধান করতে। তবে জনগণের মধ্যেও এসব ব্যবসা পদ্ধতি নিয়ে সচেতনতা আসা জরুরি, নচেৎ বড় ক্ষতি থেকে বাঁচানো যাবেনা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এবং ভোক্তাদের।

  •  
  •  
  •  
  •  
ad0.3

Tags: ,