মিয়াওয়াকি ফরেস্টঃ বৈশ্বিক উষ্ণতা মোকাবেলার নতুন হাতিয়ার?

রাগীব হাসান বর্ষণঃ

মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার সাথে সাথে পৃথিবীতে কমছে বনভূমি আর অন্যান্য প্রাণিদের আবাসস্থল, বিশেষকরে শহরাঞ্চলে গাছের সংখ্যা দেখা পাওয়াও একটা ভাগ্যের ব্যাপার আর শহরে যান্ত্রিকতা বেশি যার ফলে দূষণও অনেক বেশি। এই সব দূষণ আর অধিক তাপমাত্রা সহনীয় পর্যায়ে থাকতো যদি আমরা সঠিকভাবে গাছপালা লাগাতে পারতাম কিন্তু সেটিও সম্ভব না বর্তমানে। এমতাবস্থায় অনেকদিন থেকেই অনেক রকম পদ্ধতি প্রয়োগ করা হচ্ছে এই উভয়মুখী সমস্যা সমাধানের জন্য কিন্তু সাফল্যের দেখা এতদিন না পাওয়া গেলেও এইবার আশার আলো দেখা যাচ্ছে এই সমস্যা সমাধানের।

২০১৯ সালে ইউনিভার্সিটি অব উইসকনসিন এক গবেষণা করে যার ফলাফলে বলা হয় আমেরিকার শহরগুলো থেকে দূষণকে সহনীয় মাত্রায় রাখতে শহরের আয়তনের ৪০ শতাংশ বনভূমির প্রয়োজন কারণ গাছ তার প্রস্বেদন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পরিবেশ ঠান্ডা রাখে, অনেক দূষণীয় পদার্থকে বাতাস থেকে ট্র‍্যাপ করে, ছায়া প্রদান করে, কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্যাস শোষণ করে বাতাসকে পরিষ্কার রাখে, এইসব উপকার গাছ একাই করে। গাছের থেকে এইসব উপকার পাওয়া যাবে যদি পরিমিত মাত্রায় গাছ লাগানো হয় কিন্তু সেটাই ছিলো মূল সমস্যা, শহরাঞ্চলে বনায়নের জন্য জায়গা পাওয়া প্রায় অসম্ভব ব্যাপার।

ড. মিউয়াওয়াকি আকিরা, প্লান্ট ইকোলজিস্ট, ইয়োকোহামা ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে তার কর্মজীবন শুরু করেন ১৯৫০ সালে, শুরু থেকেই তিনি এই বিষয় নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। ১৯৯৩ সালে তিনি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর নেয়ার পরে আরো জোরেশোরে তিনি তার গবেষণার কাজ চালিয়ে যেতে থাকেন। তিনিই এই উভয়মুখী সমস্যা সমাধানের পথ খুজে বের করেছেন।
ড. মিউয়াওয়াকির উদ্দেশ্য ছিলো বনভূমি তৈরি হওয়ার যে স্বাভাবিক প্রক্রিয়া সেখানে তিনি কিছু পরিবর্তন আনবেন যাতে করে স্বল্প সময়ে ক্ষুদ্রাকৃতির বনভূমি তৈরি করা সম্ভব হয়।

তিনি বলেন ফাকা জায়গাতে প্রথমে ঘাস জাতীয় উদ্ভিদের দেখা পাওয়া যায় এরপরে আসে বীরুৎ আর গুল্ম আর সবার শেষে দেখা পাওয়া যায় বৃক্ষের। তিনি একটি পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন যেখানে বনভূমি তৈরির শুরুর দিকের কিছু ধাপকে বাদ দিয়ে কৃত্রিমভাবে প্রয়োজনীয় গাছের বীজ বোপন করে ক্ষুদ্রাকৃতির বনভূমি তৈরি করা সম্ভব।

এই পদ্ধতিকে “মিয়াওয়াকি পদ্ধতি” বলে আর এই পদ্ধতিতে তৈরি বনকে “মিয়াওয়াকি ফরেস্ট” বলা হয়।
তিনি বলেন, প্রথমে তারা একটি জায়গা নির্ধারণ করেন তারপর প্রথমেই তারা মাটি পরীক্ষা করে দেখেন যে কি ধরণের উদ্ভিদ সেখানে জন্মাতে পারে আর সার দরকার নাকি সেটি নির্ধারণ করেন। এরপর তারা সেই জায়গাতে বীজ বোপন করেন, এখানে শুধু এক প্রকারের বীজ তারা বোপন করেন না, নানা ধরণের উদ্ভিদের বীজ বপন করেন, তারা মোটামুটি ১০০ ধরনের স্থানীয় উদ্ভিদের প্রজাতি নির্ধারন করেন বোপনের জন্য, এখানে গুল্ম থেকে বড় বৃক্ষ সবধরনের গাছের বীজ তারা বোপন করেন।
সাধারণত বনায়ন কার্যক্রমে এক প্রকারের বা দুই প্রকারের গাছ লাগানো হয় কিন্তু মিয়াওয়াকি পদ্ধতির ক্ষেত্রে অনেক ধরনের গাছের বীজ বোপন করা হয় যাতে অনেক প্রজাতির গাছ একসাথে বেড়ে উঠতে পারে, যেমনটি প্রাকৃতিক বনের ক্ষেত্রে দেখা যায়। এরপর তারা তিনবছর পানি ও সার দিয়ে গাছগুলোর যত্ন করেন এরপরে আর যত্ন করা হয়না এর কারণ হিসেবে ড. মিয়াওয়াকি বলেন তারা চান সবচেয়ে শক্তপোক্ত উদ্ভিদগুলো এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বেড়ে ওঠে যা এই বনাঞ্চলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এই পদ্ধতিতে বেড়ে ওঠা উদ্ভিদ ১৪% বেশি গতিতে বেড়ে উঠতে পারে, প্রতিকূল পরিবেশে সহজেই টিকে থাকতে পারে এবং দূষণরোধ আর তাপমাত্রা কমাতে এই বনাঞ্চল বেশি কার্যকর।

ড. মিয়াওয়াকি ১৫০০ এর বেশি এমন বনাঞ্চল তৈরির তত্ত্বাবধানে ছিলেন, শুরুটা জাপানে হলেও এখন তা আস্তে আস্তে তা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে যাচ্ছে।

এই পদ্ধতির সবচাইতে বেশি ব্যবহার দেখা যাচ্ছে আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে, মুম্বাইয়ে ২ লক্ষের বেশি গাছ আর ব্যাংগালুরুতে ৫০ হাজারের বেশি গাছ শহরের আশেপাশে লাগানো হয়েছে ড. মিয়াওয়াকির তত্ত্বাবধানে। চেন্নাইয়ে ২৫ টি মিয়াওয়াকি ফরেস্ট গড়ে তোলা হচ্ছে বর্তমানে।
(ছবিতে দেখুন, আগের অবস্থার সাথে বর্তমান অবস্থার পার্থক্য মাত্র তিন মাস পরেই)

ইউরোপের অনেক দেশই এখন এই পদ্ধতির ব্যবহার শুরু করেছে, বিজ্ঞানীরা মনে করছেন এই পদ্ধতি বৈশ্বিক উষ্ণায়ন মোকাবেলার অন্যতম হাতিয়ার হতে পারে।

আমাদের দেশেও এই পদ্ধতি অনেক কাজে আসবে সন্দেহ নেই তাতে, ঢাকার অবস্থা আমরা সবাই জানি হয়তো ড. মিয়াওয়াকির দেখানো উপায়েই আবার আমরা বুক ভরে নিশ্বাস নিতে পারবো ঢাকা শহরে।

  •  
  •  
  •  
  •  

Tags: ,