বাকৃবিতে গবেষণা সাফল্য: বাজারে ফের মিলবে দেশি কই

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি:
আবহমান কাল ধরে দেশি কৈ মাছ একটি অত্যন্ত অভিজাত ও জনপ্রিয় মাছ হিসেবে পরিচিত। মাছটি খেতে অত্যন্ত সুস্বাদু ও পুষ্টিকর। বর্তমানে দেশি কৈ পাওয়া তেমন একটি দেখায় যায় না। এই মাছটি বিভিন্ন কারণে বিশেষ করে পানিদূষণ, নদীর নাব্যতা না থাকায়, অতিরিক্ত মৎস্য আহরণের ফলে প্রকৃতি থেকে দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে। তা ছাড়া দেশে বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও সেচের জন্য বাঁধ নির্মাণ ও শিল্প কারখানায় বর্জ্য ও কৃষিজ আবর্জনার জন্য অভ্যন্তরীণ জলাশয়ে প্রাচুর্যতা কমে যাচ্ছে। জলাশয়ে প্রাকৃতিক বিচরণ ও প্রজননক্ষেত্র বিনষ্ট হওয়া ইতিমধ্যে মাছটি বিপন্ন প্রজাতির মাছ বলে চি‎হ্নিত হয়েছে।

দেশীয় প্রজাতির গুরুত্বপূর্ণ এই মাছটি বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করতে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) মাৎস্যবিজ্ঞান অনুষদের ফিশারিজ বায়োলজি অ্যান্ড জেনেটিক্স বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. এ কে শাকুর আহম্মদ কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি ইতিমধ্যে পুকুরে খাঁচায় নিবিড় গবেষণায় মা মাছ উৎপাদন ও কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে গুণগতমানের পোনা উৎপাদনে সফলতা লাভ করছেন। এর ফলে দেশি কৈ মাছের সহজে পোনা প্রাপ্তি যেমন সুগম হয়েছে ঠিক তেমনি বিপণনের মাধ্যমে এই মাছের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষিত হবে।

গবেষক শাকুর আহম্মদ বলেন, দেশি কৈ মাছ প্রজনন মৌসুমে এবং আকাশ মেঘাচ্ছন্ন ও যখন বৃষ্টি থাকে তখন পুকুর থেকে কানকোর সাহায্যে হামাগুড়ি দিয়ে অন্যত্র চলে যায়। এমনকি পুকুরে চারদিকে জাল দিয়ে বেড়া দিলেও সেখান থেকে চলে যায়। এই সমস্যা রোধকল্পে পুকুরে খাঁচা পদ্ধতির মাধ্যমে চাষ করে গুণগত মা মাছ উৎপাদনে সফলতা পেয়েছি। পরবর্তীতে সেখান থেকে কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে উন্নত প্রযুক্তির থামোস্ট্যাট এর সাহায্যে ভ্রুণীয় অবস্থায় বিভিন্ন তাপমাত্রায় তাপ প্রয়োগ করে পোনা তৈরি করা হয়। সেখান থেকে অধিক ডিম ফোটার হারের ওপর নির্ভর করে উন্নত গুণগতমানের পোনা বাছাই করা হয়।

koi6

বাছাইকৃত পোনা (লার্ভা) গুলোকে এক ধরণের ব্যাকটেরিয়া বিশেষ করে বেসিলাস ব্যাকটেরিয়া সাহায্যে নিবিড় পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে অ্যাকুরিয়াম, জগ এবং পুকুরে হাপা সিস্টেমে চাষ করা হয়। এ ক্ষেত্রে মৃত্যুর হার অনেক কম এবং উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি লক্ষ করা গেছে। কারণ হিসাবে বলা যায় এই ব্যাকটেরিয়াগুলো পানিতে ছেড়ে দিলে পানির গুণাগুণ বজায় রাখে, পোনা মাছের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বৃদ্ধি করে থাকে। এ ছাড়া মাছের অন্ত্রে গিয়ে তাদের খাবার পরিপাক ও শোষণ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে ফলে তারা বেশি পরিমান খেতে পারে এবং তাদের বৃদ্ধি বেশি হয়।

গবেষক আরও জানান, খাঁচার মাধ্যমে মা দেশি কৈ মাছ উৎপাদন কৌশল এটিই প্রথম। এই পদ্ধতির মাধ্যমে দেশি কৈ মাছকে সংরক্ষণ ও বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করা যাবে। যা বাংলাদেশ আমিষের চাহিদা পুরণ এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য দেশি কৈ মাছের পোনা উৎপাদনের কোনো বিকল্প নেই। তাই উচ্চগুণসম্পন্ন অধিক সংখ্যক দেশি কৈ মাছের পোনা উৎপাদন করে যদি বাংলাদেশের উন্মুক্ত জলাশয়ে বিশেষ করে হাওর এলাকায় চাষ করা যায় তাহলে সম্প্রতি হাওরে মাছের যে জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে তা অনেকটা লাঘব হবে এবং সেখানকার জেলেদের জীবিকার পথ সুগম হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

  •  
  •  
  •  
  •  

Tags: