বগুড়ায় নিজেদের অর্থায়নে হচ্ছে ফুটবল স্টেডিয়াম

বগুড়া সংবাদদাতা:

এক সময় দেশের ফুটবলে বিশাল জায়গাজুড়ে ছিল বগুড়ার নাম। মাহবুবুর রহমান বড়কালু, আলফাজ আহম্মেদ গ্যাদা’র মত তারকা ফুটবলাররা একসময় দেশের হয়ে বিদেশের মাটিতে সুনাম কুড়িয়েছেন। পাকিস্তান আমল এবং স্বাধীন বাংলাদেশেও অনেক বিষ্ময়কর ফুটবল প্রতিভার জন্ম দিয়েছে বগুড়া। কিন্তু একটি ফুটবল স্টেডিয়ামের অভাবে ক্রমেই ঐতিহ্য হারিয়ে ফেলেছে উত্তরবঙ্গের রাজধানী। স্থানীয় সংগঠকদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চললেও ফুটবলের হারানো গৌরব ফেরাতে পারছেনা বগুড়াবাসী। যুগ যুগ ধরে একটি ফুটবল স্টেডিয়ামের জন্য সরকারের নিকট ধর্না দিয়ে কান্ত, পরিশ্রান্ত হয়ে অবশেষে নিজেদের অর্থেই ফুটবল স্টেডিয়াম নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে জেলা ক্রীড়া সংস্থা।

শহীদ চাঁন্দু স্টেডিয়াম ছিল বগুড়ার একমাত্র বড় খেলার মাঠ। ২০০৪ সাথে অনুর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ ক্রিকেটের জন্য নতুন করে নির্মাণ করা হয় শহীদ চাঁন্দু স্টেডিয়াম। এরপর আইসিসি’র ওয়ানডে ও টেষ্ট ভেন্যুর স্বীকৃতি পেলে শহীদ চাঁন্দু স্টেডিয়াম পুরোপুরি ক্রিকেটের দখলে চলে যায়। বাস্তুহারা হয়ে পড়ে ফুটবল। ফুটবলারদের একমাত্র ঠিকানা হয়ে যায় ছোট্র আকারের আলতাফুন্নেছা খেলার মাঠ। পৌরসভার নিয়ন্ত্রণে থাকা এই মাঠে সারা বছর বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজনের ফলে এখানেও উপেতি থাকে ফুটবল। একটা আলাদা ফুটবল স্টেডিয়ামের জন্য বহু কাঠখড়ি পোড়ায় জেলা ক্রীড়া সংস্থা। বগুড়াবাসীর দাবীর প্রেেিত ২০১০ সালে বগুড়ায় একটি আন্তর্জাতিক মানের ফুটবল স্টেডিয়াম নির্মানের ঘোষনা দিয়েছিলেন তৎকালীন ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আহাদ আলী সরকার। এ ল্েয শহরের উপকন্ঠে মাটিডালি বন্দরের পাশে দ্বিতীয় বাইপাস সংলগ্ন জমিও পরিদর্শন করেন মন্ত্রী। বাছাই করা হয় প্রায় সাড়ে এগারো একর জমি। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের আবেদনে সাড়া দিয়ে স্থানীয় ভূমি অফিস জমির মূল্য নির্ধারন ও নক্সা তৈরি করে তা মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। অগ্রগতি বলতে এটুকুই। এরপর সেই স্টেডিয়ামের আর কোন খবর নেই। হত্যার পর লাশ গুমের মতই স্টেডিয়াম নির্মাণের সব তথ্য গুম হয়ে যায়।

সরকারের সেই পরিকল্পনা ভেস্তে গেলেও একটি ফুটবল স্টেডিয়াম নির্মাণের দাবী থেকে সরে আসেনি বগুড়ার মানুষ। স্টেডিয়ামের জন্য অব্যাহত ভাবে দাবী জানিয়ে আসছে তারা। স্থানীয় বিভিন্ন ক্রীড়ানুষ্ঠানে সরকারের মন্ত্রী এবং আমলাদের নিকট বারবার স্টেডিয়ামের দাবী তুলে ধরা হয়। কিন্তু কিছুতেই কিছু না হলে বিকল্প উপায়ে স্টেডিয়াম নির্মাণের উদ্যোগ নেয় জেলা ক্রীড়া সংস্থা। তারই অংশ হিসেবে শহীদ চাঁন্দু স্টেডিয়াম সংলগ্ন ওয়ান্ডারল্যান্ড পার্কের পাশে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের বিশাল পরিত্যাক্ত জায়গায় ফুটবল স্টেডিয়ামের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। ইতোমধ্যেই ওয়ান্ডারল্যান্ড পার্কের সাথে চুক্তি বাতিল করে জেলা ক্রীড়া সংস্থার নিকট জায়গাটি হস্তান্তর করেছে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ।
জানাগেছে, চারদিকে প্রাচিরে ঘেরা জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের এই জায়গাটির বিশাল অংশজুড়ে রয়েছে জলাশয়। জলাশয়ের চারধারে রয়েছে বিশাল ফাঁকা জায়গা। এরই মধ্যে জলাশয় ভরাটের কাজ শুরু হয়েছে। ভরাট শেষে জলাশয়ের জায়গায় হবে খেলার মাঠ। জলাশয়ের চারধারের ফাঁকা জায়গায় হবে দর্শকদের জন্য গ্যালারি।

বগুড়া জেলা ফুটবল এসোসিয়েশনের সভাপতি ও জেলা ক্রীড়া সংস্থার সহসভাপতি খাজা আবু হায়াত হিরু জানান, একটি ফুটবল স্টেডিয়াম বগুড়াবাসীর দীর্ঘ দিনের দাবী। বছরের পর বছর চেষ্টা করেও ফুটবল স্টেডিয়াম নির্মাণ করা সম্ভব হয়নি। আলতাফুন্নেছা খেলার মাঠে খুব কষ্ট করে লিগসহ বিভিন্ন টুর্ণামেন্ট আয়োজন করতে হয়। মাঠের অভাবে ফুটবলারদের নিয়ে কোন ক্যাম্প করা সম্ভব হয় না। প্রায় ১০ বিঘা জমির ওপর নতুন স্টেডিয়াম নির্মিত হলে প্রায় ১৫ হাজার দর্শক একসাথে বসে খেলা উপভোগ করতে পারবেন যা আলতাফুন্নেছা খেলার মাঠের দ্বিগুনেরও বেশি। স্টেডিয়ামের পরিধিও হবে আলতাফুন্নেছা খেলার মাঠের চেয়ে অনেক বড়। এর ফলে বগুড়াবাসীর দীর্ঘ দিনের স্বপ্ন পূরণ হবে। স্টেডিয়াম নির্মিত হলে বগুড়ার ফুটবল আবারও জেগে উঠবে বলে তিনি আশাবাদী।

জেলা ক্রীড়া সংস্থার সিনিয়র সহসভাপতি ও আউটার স্টেডিয়াম নির্মাণ কমিটির অন্যতম সদস্য শুভাশীষ পোদ্দার লিটন জানান, প্রাথমিকভাবে নিজস্ব অর্থায়নে জলাশয় ভরাটের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ভরাট শেষে এখানেই ফুটবল খেলা শুরু হবে। পরবর্তীতে সরকারি অনুদান পেলে স্টেডিয়ামের গ্যালারিসহ অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদে এসংক্রান্ত একটি প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে। তিনি আরও জানান, মাটি ভরাটের জন্য আনুমানিক ৬০-৬৫ লাখ টাকার দরকার। এই টাকার পুরোটাই স্থানীয়ভাবে জোগাড় করার চেষ্টা চলছে। ইতোমধ্যেই পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বগুড়াবাসীর নিকট সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে।

উল্লেখ্য, সরকারের নিকট বারবার দাবী জানিয়ে ব্যর্থ হয়ে জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারন সম্পাদক ও বগুড়া চেম্বারের সভাপতি মাছুদুর রহমান মিলন নিজস্ব অর্থায়নে ফুটবল স্টেডিয়াম নির্মাণের ঘোষনা দিয়েছিলেন। মাঠ তৈরির প্রাথমিক খরচ তিনিই বহন করতে পারেন বলে শোনা যাচ্ছে। তবে, স্থানীয় একটি দৈনিকে বিজ্ঞাপন দিয়ে স্টেডিয়াম নির্মাণে স্থানীয়দের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। নির্মাণ খরচ বহন করলে কোন ব্যক্তির নামে স্টেডিয়ামের নামকরণ করা হবে বলেও জেলা ক্রীড়া সংস্থার প থেকে ঘোষনা দেয়া হয়েছে।

  •  
  •  
  •  
  •