কালীগঞ্জের ৫ হাজার তাতি জাঁতাকলে পিষ্ট

মোঃ ইকবাল হোসেন, লালমনিরহাট সংবাদদাতা:

লালমনিরহাটে শীত জেঁকে বসেছে, নভেম্বর মাসের শুরুতেই চলে মার্চ মাস পর্যন্ত এ শীত। বর্তমান মাঘ মাসের চলছে ভরা শীত মৌসুম। এ শীতে ছিন্নমূল থেকে মধ্য বিত্ত পরিবারের লোকজনের ভরসা এখন কাকিনা তাঁতের চাদর। শুধু চাদর নয়। এক সময় দেশীয় শিল্পীদের নিপুণ হাতে তৈরি মসলিন কাপড় দেশ বিদেশী রমণীদের নজর কেড়েছিল।

সময়ের বিবর্তনে পুরনো মসলিনের কথা আধুনিক নারীদের স্মৃতিতে ধারণ না থাকলেও বর্তমানে কাকিনার তৈরি তাঁতের শাড়ী সেই মসলিনের মতই দেশ বিদেশী রমণীদের মনে স্থান করে নিয়েছে। এ জন্যই প্রবাদ রয়েছে “তিস্তা নদী নালা খাল বিল কাকিনার শাড়ী তার গর্বের ধন” আর এই গর্বের ধন এমনভাবে হারাতে বসেছে যা দেখবার কেও নেই ।সুতার দাম বৃদ্ধি,কারিগর ও মহাজনদের মধ্যে লভ্যাংশের অসম বণ্টন আর কারিগরের অভাবে তাঁত শিল্পের আগাম দিনগুলো নিয়ে সংশয় রয়েছে ।বাব-দাদার এই তাঁত শিল্পকে ধরে বাল্যকাল থেকে এ পেশায় জড়িত হয়ে পড়েছেন আমজাদ হোসেন। আমজাদ হোসেন এ কাজের পাশাপাশি করতে চেয়েছিলেন লেখা পড়া ও উচ্চ পদে চাকুরীর ইচ্ছা ছিল। তবে সে পারেন নি সে এই পেশাটি। কাপড় বুননের ফাঁকে এইচএসসি পর্যন্ত লেখা পড়া করেছেন।অর্থাভাবে উচ্চ শিক্ষা অর্জন করা সম্ভব হয়নি তার।পারেননি উচ্চ কোনো পেশা, তাই তাঁত বুননে চলছে তার সংসার।

কাকিনা তাঁত শিল্প এলাকায় গিয়ে কথা হয় আমজাদের সাথে তিনি বলেন, দাদন ব্যবসায়ীদের জাঁতাকলে পিষ্ট হয়েছে তাঁতিদের তাঁত মেশিন।সরকারী কোন ঋণ না পেয়ে বেঁচে থাকার তাগিদে দাদন ব্যবসায়ীদের কাছে চরা সুদে ঋণ নিয়ে নিঃস্ব হয়ে অনেকেই এ পেশা ছেড়ে পালিয়েছেন। বাবা চোখে না দেখলেও কিছু করার উপায় থাকেনা কারণ প্রতি সোম ও বুধবার দিতে হয় দাদন ব্যবসায়ীদের ঋণের টাকা।সীমান্ত ঘেঁষা লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার কাকিনা ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামে রয়েছে তাঁতী পাড়া। শীতের চাহিদা মেটাতে মহা ব্যস্ত রয়েছেন তাঁতী পাড়ার তাঁত শ্রমিকরা। কথা বলার ফুসরতও যেন নেই তাদের। পরিবারের কনিষ্ঠ সদস্যরাও ব্যস্ত রয়েছেন চাঁদর বুনাতে।কালীগঞ্জ উপজেলার কাকিনা উত্তর বাংলা বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের পার্শ্বের একটি গ্রাম নাম তাঁতীপাড়া।তাঁত মেশিনের খট-খট শব্দ শুনে ভিতরে গিয়ে দেখা গেল পরিবারের সকল সদস্যদের নিয়ে মহা-ব্যস্ত প্রবীণ তাঁতী আরফান আলী(৮০)।

দেশ স্বাধীনের আগেই কয়েকজন মিলে টাঙ্গাইল থেকে চলে আসেন লালমনিরহাটের কাকিনায়। সেখানেই গড়ে তুলেন তাঁত পল্লী। কয়েক বছর আগেও সাড়ে তিন থেকে চার শত পরিবার তাঁত পেশার সাথে জড়িত ছিল। কিন্তু বিভিন্ন কারণে এখন অনেকেই এ পেশা ছেড়ে দিয়ে অন্য পেশায় জড়িয়ে পড়েন। কিন্তু অনেকটা নেশায় পড়ে কষ্ট হলেও বাপ-দাদার পেশাকে আঁকড়ে বেঁচে আছেন বলে জানান আরফান আলী।

আরফান আলী জানান, সুতার দাম বেশী, সব সময় চাদরের চাহিদা না থাকা, অর্থাভাবে এ পেশা থেকে অনেকেই ছিটকে পড়েছেন।সুদখোর দাদন ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চরা সুদে ঋণ নিয়ে সুতা কিনে কোন রকম টিকিয়ে রেখেছেন তাঁত শিল্পকে। সুদের টাকায় ব্যবসা করে তেমন মুনাফা হচ্ছে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, এক হাজার টাকা নিলে প্রতিমাসে ১শত থেকে ১শত ২০টাকা মহাজনকে সুদ দিতে হয়।তবে তিনি দাবি করেন সরকার বা কোন প্রতিষ্ঠান সুতা আর মজুরী দিলেই বার মাসই তারা চাদর, লুঙ্গি, শাড়িসহ বিভিন্ন কাপড় তৈরী করে সরবরাহ করতে পারতেন। তাঁত শিল্পকে বাঁচাতে সরকারের সার্বিক সহযোগিতা কামনা করেন প্রবীণ তাঁতী আরফান আলী। কাকিনা রুদ্বেশ্বর গ্রামের তাঁত শ্রমিক ছকিনা বেগম জানান, দৈনিক ভোর ৫টায় কাজ শুরু করে রাত ১০টায় শেষ করে ৪সদস্যের পরিবারে চাদর তৈরী হয় মোট ৬টা। এতে তাদের সুতা খরচ পড়ে প্রতিটিতে এক শত টাকা। পাইকারী প্রতিটি চাদর বিক্রি হয় একশত ত্রিশ থেকে দেড়শত টাকা।কাকিনার তাঁত পল্লীর তৈরী চাদর লালমনিরহাটের চাহিদা মিটিয়ে চলে যায় টাঙ্গাইল, বাবুরহাট , বরিশাল ও ঝিনাইদহসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে।শীতের সময় তাঁতের চাদরের বেজায় কদর সীমান্তবর্তী জেলা লালমনিরহাটে।অনেকেই শার্ট, থ্রীপিস, কোট-প্যান্টের পিস হিসেবে ব্যবহার করছেন কাকিনার এ চাদর।

কলেজ-পাড়ার তাঁত শ্রমিক তমিজ উদ্দিন জানান, প্রতি মন সুতা ৬/৭ হাজার টাকায় কিনতে হয় বগুড়া শহর থেকে। তিনি মহাজনের কাছে অগ্রিম টাকা নিয়ে সুতা কিনেছেন। বিনিময়ে মহাজনকে বাজার মূল্যের চেয়ে প্রতিটি চাদর ৫/৮টাকা কমিশনে বিক্রি করতে হয়। তাতে লাভ কম হলেও জীবন বাঁচানোর তাগিদেই তাঁত বুনছেন। তবে বছরের অন্য সময়ে চাদরের চাহিদা না থাকায় তাঁত বন্ধ রেখে অন্য কাজে শ্রম বিক্রি করেন জানিয়ে তিনি বলেন, সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা পেলে সারা বছর চাদর, লুঙ্গি, শাড়িসহ বিভিন্ন কাপড় তৈরী করে বাজারজাত করতে পারতেন।এমনটা দাবি এ অঞ্চলের তাঁতী ও সুধিজনের।

জাতীয়তাবাদী তাতি সমিতির জেলা সভাপতি অবু তালেব জানান, এ জেলায় সর্বমোট ৫,০০০ তাতি রয়েছে। এদের মধ্যে ভোটমারীতে আছে ১৩০, পাটগ্রাম ৮০, পারুলিয় ৫৫, দইখাওয়া ২০ এবং দোওয়ানি ৫০। এই তাতিরা ব্যবসায় টিকে থাকতে পারছেনা । বর্তমানে ভারতীয় বোম্বে থেকে এক কুইন্টাল সুতা ক্রয় করে আনতে ৬৭লাখ ৮৫হাজার টাকা লাগলেও বাংলাদেশে আনতে সরকরী কর দিয়ে কাকিনা পর্যন্ত আনতে প্রায় ডবল টাকা খরচ পরে যায়, যার লভ্যাংশ মহাজন দের ঘরেই চলে যায়। এ অবস্থায় তাতিদের বাঁচাতে ২,০০৮ সালে তৎকালীন উপমন্ত্রি আসাদুল হাবিব দুলু তাতি প্রতি ৫ থেকে ৮ হাজার টাকা সাহায্য দিয়েছিল। এর পরে তাতিদের কপালে আর সরকারী সাহায্য জোটে নি। বর্তমান তাতিদের যে দুুর্দিন তাতে এ সম্ভবনা ময় খাতটির বাঁচিয়ে রাখতে সরকারী সহযোগীতা একান্ত প্রয়োজন।

  •  
  •  
  •  
  •