২৭ বছর পর স্বজনদের ফিরে পেল মনোয়ারা
ইসাহাক আলী, নাটোর প্রতিনিধি:
অভাবের সংসারে পেটের দায় মেটাতে বাসায় কাজ করার জন্য আট বছরের মেয়ে মনোয়ারা খাতুন কালিকে বাবা বাসা বাড়ির কাজে পাঠান পুরান ঢাকার এক ব্যবসায়ীর হাতে। সেখানে গৃহকর্তার নির্যাতনের হাত থেকে বাঁচতে পালিয়ে যায় মনোয়ারা। আশ্রয় পান অন্য একটি বাড়িতে। কিন্তু সেখানে গিয়ে বলতে পারেননি বাড়ির ঠিকানা। এর বিয়ে সংসার এমনি দুই সন্তানের জননী হয়েছে সে। কিন্তু স্বজনদের অভাব বোধ তাড়া করে ফিরেছে মনোয়ারাকে। সোয়া দুইযুগ মানে দীর্ঘ ২৭ বছর পর সেই স্বজন হারানোর কষ্টের অবসান শেষে মনোয়ারা ফিরে এসেছেন স্বজনদের কাছে। তাকে পেয়ে আবেগ্লাপুত তার মা, ভাই, বোন, স্বজনসহ প্রতিবেশীরা। হৃদয়স্পর্শী এই ঘটনাটি ঘটেছে নাটোরের রায় আমহাটি গ্রামে।
সরেজমিনে নাটোর সদর উপজেলার রায় আমহাটি গ্রামে গিয়ে জানা যায়, ঐ গ্রামের আব্দুস সাত্তারের ছোট মেয়ে মনোয়ারা খাতুন আট বছর বয়সে ঢাকার এক বাসা থেকে হারিয়ে যায়। বর্তমানে তার বয়স পয়ত্রিশ। তিন বোন আর দুই ভাইয়ের সবচেয়ে ছোট আদরের মনোয়ারার গায়ের রং কালো হওয়ায় সবাই তাকে আদর করে কালি নামে ডাকতো। অভাবী সংসারে চার মেয়ে আর দুই ছেলেকে নিয়ে দ্বিধাগ্রস্থ আব্দুস সাত্তার ২৭ বছর আগে আদরের মেয়েটিকে বাসা বাড়ির কাজ করতে দেন পুরান ঢাকার এক ব্যবসায়ীর হাতে। সেখানে গৃহকর্তার অত্যাচার সইতে না পেরে পালিয়ে যায় মনোয়ারা। আশ্রয় পান পুরান ঢাকার অন্য এক পরিবারের মাঝে। সব ঠিক থাকলেও আট বছর বয়সী কালি ভুলে যায় তার বাড়ির ঠিকানা। শুধু মনোয়ারার মনে থাকে নাটোরের বড় এক মন্দিরের পাশে পরিবারের সাথে মেলা দেখতে গিয়েছিল। তার কথা মতো গৃহকর্তা দু’তিন বার নাটোরে এসেও কোন ঠিকানা পাননি।
এদিকে, পাগলপ্রায় হয়ে মেয়েকে খুঁজতে থাকেন বাবা। এক সময় শোকাহত বাবা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। এর মাঝে কেটে গেছে অনেকটা বছর। একসময় বিয়ে হয় মনোয়ারার। ঢাকার মগবাজারের ইলেক্টটিক মিস্ত্রি স্বামী হারুন অর রশিদ, দুই ছেলে আকাশ, আয়ানকে নিয়ে বেশ সুখের সংসার তার। তবুও মাঝে মাঝে মা-বাবা, ভাই, বোনদের কথা মনে হলে বুকটা হাহাকার করে উঠতো তার। কিছুদিন পূর্বে প্রতিবেশী গামেন্টস কর্মী নাটোরের এক ব্যক্তির সাথে হঠাৎ পরিচয় হয় মনোয়ারা কালির। সে সমস্ত ঘটনা তাকে খুলে বললে সেই ব্যাক্তি নাটোরের বিভিন্ন স্থানে তার পরিবারের সন্ধান করতে থাকে। কিছুটা তথ্য সংগ্রহ করে মনোয়াকে সাথে করে গত শুক্রবার নাটোরে আসেন। স্বজনদের সামনাসামনি করা হলে প্রথমে তাকে কেউ চিনতে না পারলেও পরে কালি নাম বললে নিশ্চিত হন স্বজনরা।
দীর্ঘ ২৭ বছর পর মা, ভাই, বোনসহ স্বজনদের ফিরে পেয়ে আবেগ্লাপুত কালি। তবে বাবার শোকে শোকাহত সে।
নিজের অভিব্যক্তি জানাতে গিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরে মনোয়ারা খাতুন কালি হাসতে হাসতে বললেন, ২৭ বছর পর মা, ভাই, বোনসহ স্বজনদের কাছে ফিরতে পেরে সে মহাখুশি। সৃষ্টিকর্তার কাছে অশেষ শুকরিয়া যে সবাইকে ফিরে পেয়েছি। তবে বাবার কথা মনে করে অশ্র“সিক্ত হয়ে পড়েন তিনি।
কালির মা চন্দ্র বানু জানান, বহুদিন পর বুকের মানিকরে ফিরে পাইছি। এ যে কী আনন্দের তা বলে বুঝাতে পারমু না।
কালির বড় ভাই খলিল গাজি ও বোন কুলছুম বেগম বলেন, কালি হারিয়ে যাওনের পর আমরা অনেক খোঁজাখুজি করেও তার সন্ধান পাইনি। আমরা ভাবছিলাম কলি আর বাঁইচা নাই। অনেকদিন পর বোনডারে ফিরে পাইছি। এখন আমরা মহাখুশি।
কালির ফিরে আসায় আনন্দে আনন্দিত স্বজন সহ পাড়াপ্রতিবেশীরাও। দুরদুরান্ত থেকে সবাই ছুটে আসছেন কালিকে একপলক দেখার প্রত্যাশায়। উৎসবের আমেজ বইছে পুরো এলাকায়। ২৭ বছর পর হারানো স্বজন ফিরে পাওয়ায় আশার প্রদীপটা অনেকটা যেন জ্বলে উঠেছে নাটোরের রায় আমহাটি গ্রামের মানুষের মাঝে। কালির পরিবারের সাথে সাথে নিরাশা জয়ের এক দুর্লভ আনন্দ উপভোগ করেছে এখানকার মানুষ।

