ধানের সঠিক মুল্য হতে বঞ্চিত রংপুরের কৃষক
সনজিৎ কুমার মহন্ত, রংপুর প্রতিনিধি:
শস্যভান্ডার হিসাবে খ্যাত রংপুর ও দিনাজপুর কৃষি অঞ্চলের আট জেলায় এবার বোরো ধানের বা¤পার ফলন হয়েছে। ফলন বাম্পার হলেও হাট বাজারে ধানের চরম দরপতন ঘটিয়ে সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীরা ফায়দা লুটছে বলে বোরোচাষীরা অভিযোগ তুলেছে। তাদের দাবি সিন্ডিকেটদের না দমালে তারা ধানের সঠিক মুল্য হতে বঞ্চিত হবে।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, রংপুরের পাঁচ জেলা রংপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী ও গাইবান্ধায় এবার বোরো ধান চাষ হয়েছে ৫ লাখ ১ হাজার ৯৬৪ হেক্টর জমিতে। এরমধ্যে ১ লাখ ৪২ হাজার ১১০ হেক্টর জমিতে হাইব্রিড, ৩ লাখ ৫৭ হাজার ৬৩২ হেক্টর জমিতে উফশী জাতের ও ২ হাজার ২২২ হেক্টর জমিতে স্থানীয় জাতের বোরো ধানের চাষ করা হয়।
অপরদিকে দিনাজপুর কৃষি অঞ্চলের তিন জেলা দিনাজুপুর, ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড়ে এবার বোরো ধান চাষ হয়েছে দুই লাখ ৬৯ হাজার ৭২৫ হেক্টরে। এরমধ্যে ৪০ হাজার ৭২৫ হেক্টর জমিতে হাইব্রিড, ২ লাখ ২৯ হাজার হেক্টর জমিতে উফশী জাতের বোরো ধানের চাষ করা হয়। ফলনও হয় বাম্পার।
কৃষকরা বলছে- বোরো ধানের শুরতেই বাজারে দরপতন ঘটেছে। যখন হাট বাজার ধানে ধানে সয়লাব হয়ে যাবে তখন চারশত টাকা মন দরে ধান বিক্রি করা যাবে কিনা এ নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।
সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীরা বোরো ধানের শুরুতেই দরপতনের খেলায় মেতে উঠে ফায়দা লুটছে।
সংশ্লিষ্ট মূত্র মতে, গত ৫ মে থেকে সরকারীভাবে বোরোধান ক্রয় অভিযান শুরু হলেও রংপুর বিভাগের পাঁচ জেলায় এক ছটাক ধানও সংগ্রহ করেনি খাদ্য বিভাগ। গত রবিবার পর্যন্ত অপর তিন জেলায় সংগ্রহ হয়েছে মাত্র ৩৭ মেট্রিকটন। যা লক্ষ্যমাত্রার তিন দশমিক মেট্রিকটন। খাদ্য বিভাগরে এক শ্রেণির কর্মকর্তার উদাসিনতা ও ধান ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট চক্রের সাথে গোপন সমঝোতা করে কৃষকের কাছ থেকে ধান সংগ্রহ না করায় এ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। ফলে ন্যায্য ম্যূল্যে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান সংগ্রহ করে কৃষককে উৎসাহিত করা ও উৎপাদিত ফসল ক্রয়ের যে সরকারী উদ্যোগ তা ভেস্তে যেতে বসেছে।
অভিযোগে জানা গেছে, মাঠ পর্যায়ে কৃষকের কাছ থেকে ধান ক্রয়ে খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের উৎসাহ কম। কারণ এখন সরকারীভাবে ধান ক্রয় মূল্য কেজি প্রতি ২৩ টাকা। যা ৪০ কেজি মন দরে দাঁড়ায় ৯২০ টাকা। কিন্তু উত্তরের জেলাগুলোতে ধান ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট চক্র ধানের বাজার দর নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। তারা খাদ্য বিভাগের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সাথে গোপন সমঝোতা করে গুদামে কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ধান ক্রয় করতে দিচ্ছে না। ফলে এখন বাজারে ধানের প্রচুর সরবরাহ থাকায় ধানের দামও নি¤œমুখি। প্রতি মন ধানের দাম এলাকা ভেদে ৩৮০ টাকা থেকে ৫শ’ টাকা পর্যন্ত ওঠানামা করছে। সরকারীভাবে ধান ক্রয় না করার ফলে বাজারে ধানের সরবরাহ বেশি থাকায় ধানের দামও মারাত্মকভাবে কমে গেছে।
এমতাবস্থায় আমন ধান উৎপাদনের জন্য জমি প্রস্তুত করতে এবং অন্যান্য ফসল উৎপাদনের জন্য এ অঞ্চলের প্রান্তিক চাষি ও ক্ষুদ্র চাষিদের ধান বিক্রি করে আর্থিক যোগান দেয়া ছাড়া উপায় নাই। কারণ এ অঞ্চলের কৃষি পরিবারগুলো কৃষি অর্থনীতির ওপর নির্ভরশীল। তারা এক ফসলের আয় থেকে আর একটি ফসল উৎপাদনের খরচ যোগান দেন। তাই এখন কৃষকরা সরসরি ধান সরকারের কাছে বিক্রি করতে না পারলে তা কম দামে কৃষকদের কাছ থেকে ক্রয় করবে ধান ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট চক্র। প্রতি বছরের মত তারা এবারও কম দামে ধান ক্রয় করে ধানের মজুদ গড়ে তা আবার সরকারের দেয়া উচ্চ মূল্যে সরকারী গুদামে তারাই সরবরাহ করে থাকে। ফলে প্রতি বছরের মত এবারও কৃষকরা সরকারীভাবে ধানের দেয়া দাম থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশংকা করছে। এ জন্য সরকারের এখনি উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। কেন মাঠ পর্যায়ে কৃষকের কাছ থেকে ধান ক্রয় করা হচ্ছে না তার কার্যকরি মনিটরিং করা প্রয়োজন বলে কৃষকরা মনে করেন।
এ অবস্থায় খাদ্য বিভাগের রংপুর আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক অফিস সূত্রে জানা গেছে, রংপুর বিভাগের ৮ জেলার মধ্যে রংপুর, লালমনিরহাট, নীলফামারী, পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁও জেলায় গত রবিবার পর্যন্ত ধান ক্রয় অভিযনের ১০ দিন পেরিয়ে গেলেও এক ছটাক ধান ক্রয় করেনি খাদ্য বিভাগ।
ওই পরিসংখ্যানে আরও জানা গেছে, রংপুর জেলায় এবারে ধান ক্রয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৯৮১৬ মেট্রিকটন, পর্যায়ক্রমে একইভাবে লালমনিরহাট-৮১৭৮, নীলফামারী -১২৬৩৮, পঞ্চগড়-৪৬৪৯ ও ঠাকুরগাও -৮২৪৮ মেট্রিকটন। এ সব জেলায় এই সংগ্রহ লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে এক ছটাক ধান ক্রয় করা হয়নি। গইবান্ধায় জেলায় লক্ষ্যমাত্রার ১৮৪৭৪ মেট্রিকটনের বিপরীতে ১০ মেট্রিকটন, কুড়িগ্রাম জেলায় লক্ষ্যমাত্রার ১৬১৩৫ সেট্রিকটনের বিপরীতে ৩ মেট্রিকটন এবং দিনাজপুর জেলায় ২৪৫৭৯ মেট্রিকটনের বিপরীতে মাত্র ২৪ মেট্রিকটন সংগ্রহ করা হয়েছে। ওই সংগ্রহ অভিযান শুরু হয়েছে ৫ মে থেকে চলবে ৫ জুন পর্যন্ত। এ অবস্থায় কৃষকদের কাছ থেকে ধান সংগ্রহ করতে মাঠ পর্যায়ের খাদ্য কর্মকর্তাদের উৎসাহ কম দেখা গেছে। কারন এখন দালাল ফড়িয়া ও ধান ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট চক্র যে ধান গ্রামের হাট বাজার থেকে প্রকার ভেদে ক্রয় করছে তা মাত্র ৩৮০ টাকা থেকে গড়ে ৫শ’ টাকা পর্যন্ত। অর্থাৎ সরকারী বাজার মূল্যের চেয়ে গড়ে তা প্রায় সাড়ে ৫শ’ টাকা কম। ওই কম মূল্যে ধান ক্রয় করে তা খাদ্যবিভাগের ধান ক্রয়ের সাথে যুক্ত কর্মকর্তাদের প্রতিমন ধানের বিপরীতে কমিশন দিয়ে খাদ্যগুদামে ওই ধান সরবরাহ করার উদ্যোগ নিয়েছে ওই ধান ব্যবসায়ী সিন্ডিকে চক্র। প্রতিবছরে একই ভাবে কৃষকদের বঞ্চিত করে খাদ্য বিভাগ ওই দালাল ফড়িয়া ও ধান ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট চক্রের কাছ থেকে ধান ক্রয় করে আসছে। ফলে কৃষকের যে সর্বনাশ হচ্ছে তা দেখার কেউ নেই।
কৃষি বিভাগের হিসাব মতে- চলতি মৌসুমে প্রতি কেজি বোরো ধান উৎপাদনে খরচ হয়েছে ২০ টাকা ৭০ পয়সা। আর চাল উৎপাদনে ব্যয় ধরা হয়েছে কেজি প্রতি ২৯ টাকা। ওই হিসাবে এক মণ ধান উৎপাদনে কৃষকের খরচ পড়েছে ৮২৮ টাকা। কিন্তু বিভিন্ন বাজারে ধান বিক্রি হচ্ছে প্রতি মণ ৩৮০ থেকে সাড়ে ৫শ’ টাকায়। ফলে মণপ্রতি কৃষকের লোকসান হচ্ছে ৩০০ টাকার ওপর। রংপুরের মাহিগঞ্জের চাল ব্যবসায়ী মোশারফ হোসেন জানান, ভারত থেকে বিপুল পরিমান চাল আসায় স্থানীয় বাজারে চালের দামের ওপর নেতীবাচক প্রভাব পড়েছে। বড় বড় ব্যবসায়ীদের কাছে ধান চালের মজুদ বেড়ে যাওয়ায় স্থানীয় বাজারগুলোতে ধান চালে চাহিদা কমে যাওয়ায় দামে ওপর প্রভাব পড়েছে। তাই বাজারে এখন ধান চালের দাম কম।
কাউনিয়ার বোরো চাষি আফজাল হোসেনসহ বেশ কজন জানান, বর্তমানে বাজারে হাইব্রিড ধান ৪৭০ টাকা বিআর-২৮ এবং ২৯ ধান ৫’শ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তারা আরো জানান, বাজারে ধানের দাম কম থাকায় তার সরকারের নিকট ধান বিক্রি করতে আগ্রহী হয়েছিলেন। কিন্তু সরকার এখন পর্যন্ত রংপুরে ধান ক্রয় শুরু না করায় তিনি হতাশ হয়ে পড়েছেন। সেই সাথে তারা এই আশংকাও করছেন সরকার যে তালিকা প্রণনয়ন করবেন তাতে প্রকৃত কতজন কৃষকের নাম থাকবে তা নিয়ে তাদের মাঝে সংশয় দেখা দিয়েছে।
কৃষি বিভাগের সূত্র মতে উত্তরাঞ্চলের ১৬ জেলায় এবার ১৬ লাখ হেক্টরের ওপর বোরোর আবাদ হয়েছে। প্রতি হেক্টরে ৪ মেট্রিক টন করে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। সেই হিসেবে এবার ৬৪ লাখ মেট্রিক টন ধান উৎপাদনের আশা করছে কৃষি বিভাগ।
রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্ভিদ বিষেশজ্ঞ মেজবাহুল ইসলাম জানান, গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত ৯০ শতাংশ জমির ধান কাটা হয়েছে। বাদবাকি ধান কাটতে আরো সপ্তাহ দ’ুয়েক লাগবে।
খাদ্য বিভাগের রংপুর সহকারী আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক আনিসুর রহমান জানান, তাদের তিন জেলায় এ পর্যন্ত ৩৭ মেট্রিকটন ধান সংগ্রহ হয়েছে। রংপুর বিভাগের বাকি ৫ জেলায় এ পর্যন্ত ধান ক্রয় করা যায়নি। কেন তা সম্ভব হয়নি? এ বিষয়ে নির্দিষ্ট করে কিছু বলতে পারেননি। তবে তিনি জানিয়েছেন- ধান সরসরি কৃষকদের কাছ থেকে ক্রয়ের জন্য তারা মাঠ পর্যায়ে তদারকি করছেন। কেন অন্য উপজেলায় খাদ্য কর্মকর্তারা ধান সংগ্রহ করতে পারেনি তাও খোঁজ খবর নেয়া হচ্ছে বলেও তিনি জানান।

