“আমি এলএসডি আবিষ্কার করিনি, এলএসডি আমাকে খুঁজে নিয়েছে”

hoff

হালিমা তুজ সাদিয়াঃ

‘মাদক’ বাংলাদেশের জাতীয় জীবনের সমস্যাগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি। মাদকাসক্ত সমাজ জাতির পঙ্গুত্ব বরণের অন্যতম কারণ। মাদকের মূল মাধ্যম মাদক দ্রব্য, মাদকদ্রব্য হলো একটি ভেষজ বা সংশ্লেষিত দ্রব্য যা ব্যবহারে বা প্রয়োগে মানবদেহে মস্তিস্কজাত সংজ্ঞাবহ সংবেদন হ্রাসপায়।

বর্তমান সময়ের সবচেয়ে আলোচিত মাদকদ্রব্য LSD (Lysergic Acid Diethylamide)। এলএসডি এগ্রোলাইন পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। এলএসডি অক্সিজেন, অতিবেগুনী রশ্মি, এবং ক্লোরিন সংবেদনশীল। যদিও আলো, আর্দ্রতা এবং স্বল্প তাপমাত্রা থেকে দূরবর্তী স্থানে এটি কয়েক বছর ধরে সংরক্ষিত থাকতে পারে। বিশুদ্ধ অবস্থায় এটি গন্ধহীন এবং পরিষ্কার বা সাদা রঙের হয়।

সাইক্যাডেলিক মাদকের নাম আসলে এলএসডির নাম আসবে সবার আগে। সাইক্যাডালিক মাদক হলো এমন এক ধরনের ড্রাগ যা ব্যবহারের ফলে মানুষ বাস্তব এবং অবাস্তবের পার্থক্য ভুলে যায়। এলএসডি মূলত এক ধরণের এসিড। সম্প্রতি এলএসডি মাদকের প্রভাবে এক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার ঘটনায়, ভয়াবহ এই মাদক ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।

রাই(Rye) জাতীয় শস্যের গায়ে জন্মানো এক বিশেষ ধরনের ছত্রাকের শরীরে লাইসার্জিক এসিড উৎপন্ন হয়। সেই এসিড রাসায়নিক সংশ্লেষণের মাধ্যমে এলএসডি তৈরী করা হয়। ১৯৩৮ সালে সুইজারল্যাণ্ডেের রসায়নবিদ আলবার্ট হফম্যান সর্বপ্রথম এলএসডি তৈরী করেছিলেন। কিন্তু তারও পাঁচ বছর পর ১৯৪৩ সালে তিনি এলএসডির সাইকয়াডেলিক বৈশিষ্ট্য জানতে পারেন। আলবার্ট হফম্যান নিম্ন রক্তচাপ ও শ্বাসপ্রশ্বাস উন্নত করার লক্ষ্যে গবেষণা করতে গিয়ে নিজের অজান্তেই শক্তিশালী এই মাদক তৈরী করে ফেলেছিলেন।

হফম্যান বলেন, “আমি এলএসডি আবিষ্কার করিনি, এলএসডি আমাকে খুঁজে নিয়েছে।” ১৯৫০ এবং ষাটের দশকে মানসিক রোগ, বিষন্নতা, দুঃশ্চিন্তা এবং অবসাদের চিকিৎসায় পরিক্ষামূলক ভাবে এলএসডির ব্যবহার শুরু হয়। পরবর্তীতে ১৯৭১ সালে জাতিসংঘ চিকিৎসার জন্য এলএসডির ব্যবহার নিষিদ্ধ করেন। এটি এতোটাই ভয়াবহ মাদক যে এই মাদকের পরিমান মাইক্রগ্রামে হিসেব করা হয়। এক মাইক্রোগ্রাম হলো এক গ্রামের দশ লক্ষ ভাগের এক ভাগ।

সাধারণত এলএসডির একটি ডোজ ৪০-৫০০ মাইক্রোগ্রাম পর্যন্ত হতে পারে যা একটি বালুকণার ভরের ১০ ভাগের একভাগ মাত্র অর্থ্যাৎ এত সামান্য পরিমান এলএসডি গ্রহণ করলেও যে কারো নেশা হতে পারে। মাদক হিসেবে এলএসডি বল্টার কাগজ, চিনির কিউব বা জিলাটিনে বিক্রি করা হয়। এটি ইনজেকশানের সাহায্যে নেয়া হতে পারে। ব্লোটার কাগজের ক্ষেত্রে এটি জিহ্বার উপরে বা নীচে রেখে সেবন করা হয়।

এলএসডি অনেক শক্তিশালী মাদকদ্রব্য। এটি গ্রহনের পর তা মানুষের মস্তিষ্কের সেরোটোনিন নামক রাসায়নিকের কার্যক্রমকে প্রভাবিত করে যার ফলে মানুষের শ্রবন এবং দর্শন ইন্দ্রিয় অতি সক্রিয় হয়ে যায় সে কারনেই এলএসডি সেবনের পর মানুষ অদ্ভুত রকমের আলো বা রং দেখতে পায়, কেউ আবার অস্বাভাবিক শব্দ শোনে বাস্তবে যার কোনো অস্তিত্বই নেই। এই অবস্থাকে বলে LSD Trip. এলএসডি ট্রিপে থাকা সময়কালে মানুষ অস্বাভাবিক আচরণ করে, অনেকের মধ্যে আত্মঘাতী প্রবণতাও লক্ষ্য করা যায়, এ ধরণের খারাপ অনুভূতিকে বলা হয় ব্যাড ট্রিপ।

ব্যাড ট্রিপের কারণে মানুষ অনেক ভয় পায় এবং মুহূর্তের মধ্যেই দুশ্চিন্তায় ভোগে, আতংকগ্রস্থ হয়ে পড়ে তখন অন্যের ক্ষতি করার প্রবণতা তৈরী হয়। এছাড়া এলএসডি সেবনের পর মানুষের হৃৎস্পন্দন, রক্তচাপ, শ্বাস-প্রশ্বাসের মাত্র এবং শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যায়। এলএসডি সেবনের আধ-ঘন্টার মধ্যে ট্রিপ শুরু হয়ে যায় যা ৬-১২ ঘন্টা পর্যন্ত ক্ষণস্থায়ী হয়। তবে সেবনের মাত্রার উপর ভিত্তি করে মানব শরীরে এর প্রভাব বিশ ঘন্টা পর্যন্ত থাকতে পারে।

অনেকের ক্ষেত্রে আবার চরম অনিদ্রা দেখা দেয়, কেউ কেউ আবার অতিরিক্ত ঘুমায়। বিষন্নতায় ভোগা ব্যক্তিরা এটি সেবনের পর আরো বেশি দুশ্চিন্তাগ্রস্থ হয়ে যেতে পারে। অনেকে ধারণা পোষণ করে এলএসডি সেবনে হয়তো তাদের শরীরে অতি-মানবীয় শক্তি চলে এসেছে, যা থেকে বহু দূর্ঘটনাও ঘটতে পারে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন অধিকাংশ ক্ষেত্রে মানুষ একক মাদক হিসেবে এটি গ্রহন করেনা অর্থাৎ যারা অন্যান্য মাদকে আসক্ত তাদের ক্ষেত্রেই এলএসডি সেবনের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠার প্রবনতা সবচেয়ে বেশি।

হেরোইন বা ইয়াবার তুলনায় এলএসডি তুলনামূলক কম আসক্তিকর তাই বলে এটি মোটেও নিরাপদ নয়। প্রচলিত যেকোনো মাদকের তুলনায় এটি হাজার গুন বেশি শক্তিশালী। এলএসডির সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো Flashback. এলএসডি সেবনের কয়েকদিন বা কয়েকমাস বা বছর খানের পরেও মাদক গ্রহণ ছাড়াই হুট করে এর প্রভাব তৈরী হতে পারে যা এলএসডির ফ্ল্যাশব্যাক বলে যার ফলে দীর্ঘমেয়াদী মানসিক সমস্যা তৈরি হতে পারে। অনেকে বাস্তব এবং অবাস্তবের পার্থক্য ভুলে যায়। জীবনে মাত্র একবার এলএসডি সেবন করলেও মানুষের মস্তিষ্কের মারাত্মক ক্ষতি হয়ে যেতে পারে।

এলএসডি নিয়ে বর্তমানে গবেষণা চলছে। এই গবেষণার প্রধান গবেষক ডেভিড নাট এই গবেষণাকে পার্টিক্যাল ফিজিক্সে হিগস বোসনের আবিষ্কারের সমতুল্য বলে আখ্যা দিয়েছেন। গবেষণা থেকে জানা যায় এলএসডি নেওয়া একটি মস্তিষ্ককে আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় স্বাভাবিক অবস্থার চেয়ে বেশি সমন্বিত একটি মস্তিষ্ক। কিন্তু একই সঙ্গে এলএসডির প্রভাবে মস্তিষ্কের অন্যান্য যোগাযোগ ব্যাবস্থা ভেঙ্গে পড়ে।

বিজ্ঞানীরা জানান, এলএসডি ব্যবহারকারীরা যে হ্যালুসিনেশন দেখেন সে সম্পর্কিত তথ্য মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশ থেকে আসে। সে সব তথ্য সবসময় মস্তিষ্কের পেছন দিকে অবস্থিত ভিজ্যুয়াল কর্টেক্স থেকে আসে না অর্থাৎ মানুষের দৃশ্যমান স্মৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত থাকে না। এই মাদকের প্রভাবে মস্তিষ্কের কাজ করার ভিন্ন ভিন্ন অংশ মিলেমিশে যায়, যার পরিনাম অত্যন্ত ভয়াবহ হয়।

এই ভয়াবহ মাদক থেকে মানবজাতিকে রক্ষার জন্য জনসচেনতা বৃদ্ধি করতে হবে। এক্ষেত্রে গণমাধ্যম ব্যাপক ভূমিকা রাখতে পারে। মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণে যুগপোযোগী আইন প্রয়োগ এবং বাস্তবায়নই পারে সমাজকে মাদকাসক্তি থেকে মুক্ত রাখতে। আর যারা মাদক দ্রব্যে আসক্ত হয়ে পড়েছে তাদের প্রতি মানবিক আচরণ প্রদর্শন করে উন্নত চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ জীবনে নিয়ে আসার সর্বাত্মক চেষ্টা করতে হবে।

  •  
  •  
  •  
  •  
ad0.3

Tags: ,