ভুল চিকিৎসায় রোগীর ভোগান্তি

Shahiduzzaman

ড. মো. সহিদুজ্জামান

ভুল চিকিৎসা করার অভিযোগে সম্প্রতি ঢাকায় এক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের নিবন্ধন স্থগিত করা হয়েছে। তিনি এক বছর চিকিৎসাসেবা এবং নামের শেষে চিকিৎসক লিখতে পারবেন না বলে গণমাধ্যমে খবর এসেছে। ঢাকায় এক রোগীর বাম কানের বদলে ডান কানে অস্ত্রোপচারে ‘যথেষ্ট অবহেলা ও গাফিলতির’ প্রমাণ পাওয়ায় ওই ইএনটি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের নিবন্ধন এক বছরের জন্য স্থগিত করেছে বিএমডিসি। ওই রোগীর পরিবারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে বিএমঅ্যান্ডডিসিতে অভিযোগ করার পরিপ্রেক্ষিতে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

খবরটি একদিকে (ভুল চিকিৎসা) উদ্বেগের হলেও নিঃসন্দেহে জনমনে স্বস্তির বার্তা দিচ্ছে।

দেশে এ রকম ভুল চিকিৎসার খবর হরহামেশাই শোনা যায়। চিকিৎসা ভুল কি না তা চিকিৎসাশাস্ত্রের পণ্ডিতরাই নিশ্চিত করে বলতে পারবেন। যেমনটি প্রমাণ মিলেছে উল্লিখিত ঘটনায়। তবে কখনো কখনো ভুল রোগ নির্ণয়, ভুল ওষুধ সেবন, ক্ষতিকর ওষুধের মাত্রাতিরিক্ত ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহার, নিম্নমানের ওষুধ, ভুল অস্ত্রোপচার এবং প্রতারকের খপ্পরে পড়ার ঘটনাগুলো মাঝেমধ্যে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় প্রকাশিত হয়। এতে কেউ বা পঙ্গুত্ববরণ করছে, কেউ বা মারা যাচ্ছে। কেউ বা ভাগ্যক্রমে বেঁচে যাচ্ছে। আবার কোথাও কোথাও রোগীকে নানা ফন্দিফিকিরে আটকে রেখে চিকিৎসা বিলম্বিত করে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনাও ঘটছে।

কথায় আছে, ‘যার চলে যায় সে-ই বোঝে। ’ ভুল চিকিৎসার কারণে ভূমিষ্ঠ শিশুটি তার গর্ভধারিণী মাকে হারাচ্ছে, বাবার কাঁধে সন্তানের লাশ উঠছে, একমাত্র উপার্জনক্ষম অভিভাবককে হারিয়ে অনেক পরিবার পথে বসছে, পঙ্গুত্ববরণ করে পরিবার ও সমাজের বোঝা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

সঠিক রোগ নির্ণয় ও দক্ষতার অভাবেই সাধারণত ভুল চিকিৎসা হয়ে থাকে। নির্ভুল চিকিৎসা সবার কাম্য। রোগ থেকে আরোগ্যলাভের একমাত্র উপায় নির্ভুল চিকিৎসা। আর এই নির্ভুল চিকিৎসার পূর্বশর্ত হলো সঠিক রোগ নির্ণয়। সঠিক রোগ নির্ণয়ে একজন চিকিৎসকের সঠিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার চাহিদাপত্র (টেস্ট প্রদান) খুবই গুরুত্বপূর্ণ। একজন অদক্ষ ও অসাধু চিকিৎসক রোগীর জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারেন। দক্ষ ও অভিজ্ঞ চিকিৎসকের তদারকি ছাড়াই নতুন চিকিৎসক তাঁর বিশেষত্বের বাইরে চিকিৎসা বা অস্ত্রোপচার করলে এ রকম দুর্ঘটনা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ঘটার সম্ভাবনা থাকে। এ ছাড়া রোগীর ভুল জায়গায় অপারেশন, ভুল রোগীকে অপারেশন, ভুল পদ্ধতিতে অপারেশন করা হলেও দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

দেশে মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন চিকিৎসক রয়েছেন। অনেক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক আছেন। মানবিক গুণসম্পন্ন এই চিকিৎসকদের ‘ক্লিনিক্যাল আই’ অত্যন্ত শার্প। কিন্তু কিছু অসাধু চিকিৎসক ও ব্যবসায়ীর কারণে মহান এই পেশা বিতর্কিত হচ্ছে।

রাস্তায় হোঁচট খেয়ে পায়ে আঘাতপ্রাপ্ত একজনকে নিয়ে সম্প্রতি এক ডাক্তারের শরণাপন্ন হলাম। রোগীর চিকিৎসাপত্রে তিন ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক লিখতে দেখে জিজ্ঞেস করলাম কোনটা কী কাজ করবে। ডাক্তার অনিচ্ছায় বললেন, প্রথমটি ‘গ্রাম নিগেটিভ ব্যাকটেরিয়া’, দ্বিতীয়টি ‘গ্রাম পজিটিভ ব্যাকটেরিয়া’ এবং তৃতীয়টি উভয় ধরনের ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে কাজ করবে। তৃতীয়টি যদি উভয়ের জন্য কাজ করে, তাহলে অন্য দুটির প্রয়োজন আছে কি না জিজ্ঞেস করায় তিনি (চিকিৎসক) দয়াপরবশ হয়ে অন্য দুটি অ্যান্টিবায়োটিক বাদ দিলেন।

কখনো কখনো একাধিক কম্পানির একই গ্রুপের অ্যান্টিবায়োটিক, প্যারাসিটামল, ভিটামিন, মিনারেলসহ বিভিন্ন ধরনের ওষুধে কমবেশি ভরে থাকে রোগীর চিকিৎসাপত্র। চিকিৎসাপত্রের উভয় পৃষ্ঠা ভরে এই ধরনের কেমিক্যালযুক্ত হরেক রকমের ওষুধ এসব রোগীকে প্রতিনিয়ত যে ভাতের মতো খেতে হচ্ছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। আবার ফলোআপ চিকিৎসা না হওয়ায় এক জায়গার চিকিৎসাধীন রোগী অন্য জায়গায় গিয়ে নতুন নতুন ওষুধ সেবনে বাধ্য হচ্ছে। এভাবে অপরিমিত ও অসম্পূর্ণ ডোজে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট তৈরি হওয়াসহ বিভিন্ন অঙ্গের ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা থাকায় স্বাস্থ্যঝুঁকি দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। হার্টের চার-পাঁচটি জায়গায় ৭০ থেকে ৯০ শতাংশের ব্লকের চিত্র রোগী বা রোগীর স্বজনকে ধরিয়ে দিয়ে অথবা ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়বে এমন আশঙ্কার কথা বলে দ্রুত অপারেশনের ভয় দেখিয়ে ভুলভাল চিকিৎসার অভিযোগ কখনো কখনো যে পত্রিকার পাতায় পাওয়া যায় না তা নয়। তৃতীয় পক্ষের প্রতারণায়ও এসব ঘটনা অনেক ক্ষেত্রে ঘটে থাকে। আবার এসব রোগীর কেউ কেউ প্রতারণার ফাঁদ থেকে বেরিয়ে এসে অন্য দেশে সামান্য চিকিৎসায় সম্পূর্ণ সুস্থ হওয়ার খবরও অসত্য নয়। অনেক ডাক্তারের চেম্বারের সামনে ওষুধ কম্পানির প্রতিনিধির ভিড় এবং চিকিৎসাপত্রের ছবি ওঠানোর দৃশ্যও মিথ্যা নয়।

সম্প্রতি ঘটে যাওয়া একটি দুর্ঘটনা আমার পরিবার ও বিশ্ববিদ্যালয় কমিউনিটিকে শুধু ভীষণভাবেই মর্মাহত করেনি, ভীতির সঞ্চারও করেছে। পেটে ব্যথা নিয়ে প্রথমে ময়মনসিংহে চিকিৎসা শুরু তাঁর। ভুলভাল রোগ নির্ণয়, একই টেস্টের ভিন্ন রেজাল্ট, ভিন্ন সময়ে ভিন্ন ওষুধপত্র রোগীকে জটিল অবস্থায় নিয়ে যায়। পরে ঢাকার কোনো একটি বেসরকারি হাসপাতালে সুচিকিৎসার আশায় ভর্তি হলে প্রাথমিক অস্ত্রোপচার প্রথমে রোগীর একটি অঙ্গের জায়গায় তিনটি অঙ্গ কেটে ফেলা হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে আরো একবার অস্ত্রোপচার করা হয়। পরিণতি মৃত্যু, অস্বাভাবিক মৃত্যু। যে মানুষটি সাধারণ অপারেশনের কথা শুনে এক সপ্তাহের জন্য প্রিয়জনদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ঢাকায় রওনা দেয়, সে এক মাসের মধ্যেই লাশ হয়ে ফিরল।

জীবনযুদ্ধের সন্ধিক্ষণে বেঁচে থাকার আকুতি নিয়ে অসহায় একজন যখন শেষ ভরসা হিসেবে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়, তখন মহান এই চিকিৎসকে ও চিকিৎসাব্যবস্থার কাছ থেকে তার প্রত্যাশাটুকু শুধু আকুতি নয়, এক ধরনের মানবতার ধর্ম। কিন্তু এই মানবতার যখন মৃত্যু ঘটে তখন মানুষ আস্থার জায়গাটুকু হারিয়ে ফেলে।

এভাবে আস্থা ও আত্মতৃপ্তি হারিয়ে হাজারো রোগী সুচিকিৎসার জন্য প্রতিদিন যাচ্ছে ভারতে। অনেকে আবার সামর্থ্য ও সুযোগ অনুযায়ী মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ডসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চিকিৎসাসেবা নিতে যাচ্ছে। এতে বড় অঙ্কের টাকা যে দেশ থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে তা নিঃসন্দেহে বলা যায়। দেশের অর্থনৈতিক সংকটে এর লাগাম টেনে ধরতে দেশে চিকিৎসাব্যবস্থায় আস্থা ফিরিয়ে আনতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। দেশ-বিদেশে প্রশিক্ষণ, পর্যাপ্ত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা ছাড়া একজন চিকিৎসকের চিকিৎসা প্রদান রোগীর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। রোগী মেরে অভিজ্ঞতা অর্জন কখনোই কাম্য নয়। তাই অভিজ্ঞ সিনিয়র চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে রোগীর সঠিক চিকিৎসা নিশ্চিতের পাশাপাশি গড়ে তুলতে হবে দক্ষ তরুণ চিকিৎসক। মানবিক মূল্যবোধ ও নৈতিকতাসম্পন্ন চিকিৎসক হয়ে গড়ে উঠলে মহান এই পেশায় দেশ ও জাতি উপকৃত হবে।

দেশে যত্রতত্র ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠেছে ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। একইভাবে গড়ে উঠছে চিকিৎসা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। সেবা ও শিক্ষার নামে গড়ে তোলা এসব প্রতিষ্ঠানের ন্যূনতম মান আছে কি না তা যাছাই-বাছাই করা জরুরি। অন্যথায় ভুল চিকিৎসায় মানুষের ভোগান্তি কখনোই থামবে না।

আজকাল পানের দোকান ও মুদির দোকানেও অ্যান্টিবায়োটিক পাওয়া যায়। প্রেসক্রিপশন ছাড়াই সব ধরনের ওষুধ বিক্রি হয়। লাইসেন্স ছাড়া ওষুধ বিক্রি ও চিকিৎসা প্রদান বন্ধ করা জরুরি। এ ছাড়া ওষুধের মান নিয়ন্ত্রণ, টেস্টের মান নিয়ন্ত্রণ, আধুনিক প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতি ব্যবহারে দক্ষ চিকিৎসক ও টেকনিশিয়ান তৈরি এবং পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধাসহ তাঁদের নিয়োগ ও উন্নত প্রশিক্ষণ প্রদান অত্যাবশ্যকীয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সর্বোপরি ভুল চিকিৎসায় সম্প্রতি বিএমডিসির নেওয়া পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়ে দেশব্যাপী অভিযোগ গ্রহণের ব্যবস্থা এবং এর প্রতিরোধে সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি।

লেখক : অধ্যাপক ও গবেষক

সূত্রঃ কালের কন্ঠ

 

  •  
  •  
  •  
  •  
ad0.3