কৃষি ও কৃষক ভাবনা
অলিউল ইসলাম অলি:
আমার বুঝ হওয়া থেকেই একটা বিষয় খেয়াল করে আসছি, বড় হলে স্মৃতিরা স্পষ্ট থেকে স্পষ্ট হয় হয়তো সেজন্যই খেয়াল করার বিষয়টা এতোদিনেও মনে করতে পারছি।
বিষয়টা হলো প্রতিটা নির্বাচনে বাবা সকালবেলা গোসল করে বেশ পরিপাটি হয়ে ভোট কেন্দ্রে যায় ভোট দিতে। আগের দিন চুল দাঁড়ি ভালোভাবে কাটিয়ে পরিপাটি হয়ে ভোটের দিন নতুন পাঞ্জাবি, লুঙ্গি আর ছাতাটা নিয়ে ভোট কেন্দ্রে যাবে। ঠান্ডার সময় হলে সুয়েটার এর উপর একটা চাদর কাঁধে ঝুলাবে, সকালের নাস্তা শেষে একগোছা পান মুখে দিয়ে মাকে সাথে করে ভোট দিতে যাবে। সাথে আমাকেও নিতো,আমি যেতাম ভোট বাড়ির জেলাপি অথবা খাগড়াই খেতে।
আমাদের বাড়ি থেকে ভোট কেন্দ্র যদিও তেমন দূর ছিলোনা তারপরেও বাবা একটা ভ্যান ঠিক করে রাখতেন। বাবা, মা আর আমি সেই ভ্যানে করে রওনা দিতাম তখন ভোট মানেই বেশ আমেজ আমাজে একটা ভাব ছিলো।যাওয়ার পথে গ্রামের আর সবার সাথে দেখা হতো,দেখতাম পাশের বাড়ির মনিরা, জান্নাত, মজিবর, রুবেল ওরাই ওদের বাবা মার সাথে ভোট কেন্দ্রে যাচ্ছে।রাস্তায় পরিচিত অনেকের সাথেই বাবার দেখা হতো,ভালো মন্দ দুই এক বাক্য বিনিময় হতো। উৎসুক অনেকে হাক ডাকিয়ে বাবাকে বলত
-আনজু আরার বাপ ভোট কিসে দিবেন বাহে? আনজু আরা আমার বড় বোনের নাম গ্রামে সবাই একজনের নাম ধরে না ডেকে এই বিশেষ কায়দায় ডাকে।আবার মা বাবাকে ডাকে আনজু আরার বাপ বলে,বাবা মাকে ডাকে আনজু আরার মা বলে।
বাবা একগাল হেসে বলতো, ‘নৌকা ছাড়া আর কিসে দিবো’।
-হামরা কিন্তু ধানের শিষে দিবো।
বাবা আর কোন কথা না বলে পাশে বসা মাকে বলে আনজু আরার মা ভোট দিবা নৌকাতে, নৌকার মার্কা চিনোত নাকি?
মা নৌকার মার্কা চিনে, তারপরেও বাবার এহেন প্রশ্নে বিরক্ত হয়ে বলে, ‘আনজু আরার বাপ আপনি কি পাইছেন আমারে, সেই ভ্যানে উঠছি থাইকা এক কথাই কইতেছেন। ক্যান আমি নৌকা মার্কা চিনিনা নাকি, ভোট কি এই পয়লা দিতাছি নাকি কন?
বাবা কাচুমাচু হয়ে বলে, ‘যদি ভুল করো তাই বারবার খেয়াল কইরা দেই বুঝলা’।
মায়ের বিরক্ত হওয়াটা স্বাভাবিক। কারণ ইতোমধ্যে ভ্যানেই এই একই কথা বাবা কয়েকবার বলেছে। শুধু তাই না, আমাদের বাড়ির পিছনের দেয়ালে বিশাল বড় একখানা নৌকার ছবি আঁকানো ছিলো। সেই নৌকার ছবিখানার নিচে লিখা ছিলো ‘নৌকা মার্কায় ভোট দিন’। আসার সময় বাবা ছবিখানা মাকে দেখিয়ে বলেছিলো এই হলো নৌকা বুঝলা ভোট দেয়ার সময় এই নৌকার উপরেই ছিল মারবা,ভুল করে যেনো অন্য মার্কায় ছিল না মারো। বাবার এমন স্বাভাবে মা একটু রাগ করে বসে রইলো।
আমি ছোট মানুষ ছাতা ধরে আছি, সেদিন বেশ রোদ ছিলো। আমার মনে আছে বাবাকে এমন একটা প্রস্তাব করেছিলাম, যে বাবা আজকে মা ধানের শীষে ভোট দিক আর আপনি নৌকায় ভোট দেন, দুজনই এক মার্কায় দেয়ার কি দরকার। বাবা এমন কথায় কিছু একটা বলে ছেলেকে বোঝাতে চেয়েছিলো যে নৌকাই ভালো। আমি বলেছিলাম বাবা ধানের শীষওতো ভালো, আমরা ধান চাষ করি ধানের শীষইতো বাবার প্রিয় হওয়ার কথা। মার্কা নৌকা হলেও নৌকা মার্কাই যে কৃষকদের জন্য অনেক কিছু করেছে এবং এটাই যে কৃষকদের আস্থা বাবা হয়তো সেটাই বোঝাতে চেয়েছিলো। তখন এতোকিছু বুঝতাম না তাই বোকার মতো কথাগুলো বলেছিলাম। যখন বড় হলাম তখন বুঝলাম বাবা আওয়ামিলীগের একজন কট্টর সমর্থক এবং সমর্থন দলের প্রতি ভালোবাসার বিন্দুমাত্র খাঁদ ছিলোনা। বাবা আজও একই জায়গায় আছে, এখনও কৃষির সাথে যুক্ত আছে যুক্ত বললে ভুল হবে আমাদের পরিবারটাই কৃষির উপর নির্ভর, বাবার সমর্থনেরও পরিবর্তন হয়নি কিন্তু মাঝখান থেকে অনেক কিছুই পরিবর্তন হয়েছে।
কৃষকরা ধানের ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এজন্য গেল মঙ্গলবারে রংপুরে কৃষকরা মহাসরকে ধান ঢেলে প্রতিবাদ জানায়। কৃষকরা প্রতিটি ধান গাছকে নিজের সন্তানের মতো লালন করে। কতোটা কষ্ট আর আক্ষেপে তাঁরা সেই সন্তানের ফলটা রাস্তায় ঢেলে দেয় এটা হয়তো কর্তৃপক্ষের কাছে বোধগম্য নয়। যদি তাঁরা এতোটুকু বুঝতো তবে অবশ্যই কৃষকদের এই সমস্যার সমাধান করতো। এবং অকারণে বিদেশ থেকে চাল আমদানি করে গোডাউন টইটম্বর করে রাখতোনা। একমণ ধান উৎপাদনে খরচ হয়েছে ৮০০-৮৫০ টাকা সেখানে বিক্রি করতে হচ্ছে ৪৫০-৫৫০ টাকায়। অথচ সরকারি দাম বেঁধে দেয়া হয়েছে মণ প্রতি ৯২০ টাকা। এবং সরকারি ভাবে ধান কেনার বিষয়টা কৃষক পর্যন্ত গড়াচ্ছেনা। সেক্ষেত্রে কৃষককে প্রতিমণে একটা বিশাল অঙ্কের টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে।
প্রতিবস্তা সার কিনতে হয়েছে দুমণ ধান বিক্রি করে। কৃষক এবং কৃষির বর্তমান যে বেহাল দশা সৃষ্টি হয়েছে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে একবস্তা সারের দাম ১০০০টাকা দিয়ে কিনলেও এমন বেহাল দশার মুখোমুখি কৃষককে হতে হয়নি। তখন একমণ ধান কৃষক ৮০০-১০০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করেছে এবং খুব স্বাচ্ছন্দ্যেই জীবন যাপন করেছিলো। কিন্তু আজ যেখানে দেশ উন্নতির ধারায় বহমান ঠিক তখনই দেশের ৮০ ভাগ মানুষকে পিছনে ঠেলে দেয়া হচ্ছে যার সবাই কৃষির সাথে জড়িত এবং এই ৮০ ভাগ মানুষকে বাদ দিয়ে দেশ কিংবা সমাজ কতোটুকু এগিয়ে যেতে পারবে সেটাতে আমার যথেষ্ট সংশয় রয়েছে।
আমার বাবাকে এখনও সরকারের প্রতি কোনরুপ আক্ষেপ করতে দেখিনা বা শুনিনি, কিন্তু আমার ধৈর্য্য শক্তি হয়তো বাবার মতো নয়। বাবা হয়তো আগের মতোই পছন্দের দলকে শ্রদ্ধা ও সমর্থন করেই যাবেন কিন্তু আমার বাবা একাই কৃষক নয় আরো লক্ষ লক্ষ কৃষক দেশে আছে বিষয়টা মানতে হচ্ছে।
বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা দেশে ঘটেই চলেছে সেসবের উপযুক্ত করণীয় কিংবা সমাধান কোনটাই তেমন লক্ষ্য করছিনা। এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনার সাথে যদি কৃষকদের ধানের ন্যায্য মূল্য না পাওয়ার বিষয়টাও সমাধানে না আসে তবে সরকারের জনপ্রিয়তা কতটুকু নীচে নামবে কিংবা উপরে উঠবে সেটা আঁচ করে শিহরিত হতে চাচ্ছিনা। আমরা চাইবো বঙ্গবন্ধু যেভাবে কৃষকের সাথে সবসময় ছিলেন বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনাও সবসময় কৃষকদের পাশে থাকবে এবং কৃষকদের এই সমস্যার সমাধান অনতিবিলম্বেই করা হবে। আশা করছি অতি শীঘ্রই কৃষকদের মুখে হাঁসি ফুটবে।
_______________________________
অলিউল ইসলাম অলি
শিক্ষার্থী, পশু পালন অনুষদ,
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ-২২০২।

