ম্যালেরিয়া নিয়ে আর ভয় নয়, আবিস্কার হল অধিক কার্যকরী টিকা !
সাবরিন জাহানঃ
ম্যালেরিয়া নির্মূলে স্বয়ং ম্যালেরিয়া পরজীবী দিয়েই তৈরি একটি ভ্যাকসিন দেখা পেল সাফল্যের।
জীবন্ত ম্যালেরিয়া পরজীবী বহন করে, এমন একটি পরীক্ষামূলক ম্যালেরিয়া টিকা বা ভ্যাকসিনের প্রয়োগে দেখা যায় তা প্রায় গ্রহীতাকে সংক্রমণ থেকে রক্ষা করে।
সম্প্রতি একটি গবেষণায় প্রকাশিত হয়, অংশগ্রহণকারী স্বেচ্ছাসেবকদের শরীরে প্লাজমোডিয়াম ফ্যালসিপারাম পরজীবী প্রবেশ করানো হয়, সেই সাথে দেয়া হয় আরও একটি ড্রাগ ,যা আমাদের লিভার বা রক্ত প্রবাহে পৌঁছে ক্ষতি করে এমন যে কোনও পরজীবী মারতে সক্ষম। অংশগ্রহণকারীরা ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা পরীক্ষা করার জন্য তিন মাস পরে ইচ্ছাকৃতভাবে ম্যালেরিয়াতে আক্রান্ত হয়েছিলেন।
দেখা যায়, টিকাটি তিন মাস পর ৮৭.৫% গ্রহীতাকে সুরক্ষা দিয়েছে যারা একই ধরণের অর্থাৎ ম্যালেরিয়া পরজীবীর সংক্রমণে আক্রান্ত হয়েছিলেন এবং ৭৭.৮% সুরক্ষা দিয়েছে যারা আলাদা স্ট্রে্নই দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিলেন তাদের মধ্যে। জীবন্ত পরজীবী ব্যবহার করে ভ্যাক্সিন তৈরির পথে এটি একটি উল্লেখযোগ্য উন্নতি, যা ভিন্ন স্ট্রেনের বিরুদ্ধেও কার্যকর হচ্ছে।
সুইজারল্যান্ডের জেনেভাতে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গ্লোবাল ম্যালেরিয়া প্রোগ্রামের পরিচালক, পেড্রো অ্যালোনসো বলেছেন যে, ম্যালেরিয়ার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা কীভাবে অর্জন করা যায় সে সম্পর্কেও গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। তিনি বলেন,”এটি ভ্যাকসিন বিজ্ঞানে যথেষ্ট অবদান রাখবে। এটির গুরুত্ব আমি বাড়িয়ে বলবো না, কারণ ম্যালেরিয়ার ভ্যাকসিন দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত ছিল।”
উল্লেখ্য যে, বেশ কয়েকটি ম্যালেরিয়া ভ্যাকসিন তৈরির কাজ চলছে। এর মধ্যে সর্বাধিক উন্নত – RTS, S, যা আফ্রিকার তিনটি দেশে ৬,৫০,০০০র অধিক শিশুকে দেয়া হয়েছে। R21 নামক আর একটি ভ্যাকসিন সম্প্রতি ৪৫০জন শিশুকে দেয়া হয়েছিল তা ৭৭% পর্যন্ত কার্যকর। উভয় টিকাতেই ইমিউনিটি বাড়াতে একই ম্যালেরিয়া প্রোটিন ব্যবহার করা হয়, যার নাম সারকামস্পোরোজয়েট প্রোটিন। এই প্রোটিনটি পরজীবীর স্পোরোজয়েট (জীবনচক্রের একটি আক্রমানত্বক পর্যায়) এর বাইরের আবরণ।
প্রোটিন ভ্যাক্সিনের কার্যকারিতা কম হওয়ায় কয়েক দশক ধরে, গবেষকরা পুরো স্পোরোজয়েটগুলিকে ভ্যাকসিন হিসাবে ব্যবহার করার চেষ্টা করছেন। কিছু বিজ্ঞানী যুক্তি দেখিয়েছেন যে, একটি জীবন্ত পরজীবী শক্তিশালী প্রতিরোধ ব্যাবস্থা তৈরি করতে পারে কারণ এটি শরীরের ভিতরে প্রতিলিপি তৈরির মাধ্যমে আরও নতুন প্রোটিন তৈরি করে।
সর্বশেষ পরীক্ষায়, গবেষকরা ৪২ জনকে জীবন্ত স্পোরোজয়েটগুলি দিয়ে আক্রান্ত করেছিলেন। তবে তারা ভ্যাকসিন গ্রহণকারীদের ওষুধ দিয়েছিলেন যেন পরজীবীটি লিভার বা রক্তে পৌঁছে রোগের লক্ষণ না তৈরি করতে পারে। এই পদ্ধতিটি বেশ ভালভাবেই কাজ করেছিল। টিকা দেওয়ার ক্ষেত্রে পরজীবিটির একই স্ট্রেনের বিরুদ্ধে নয়, দক্ষিণ আমেরিকায় পাওয়া অন্য স্ট্রেনের বিরুদ্ধেও কাজ করেছিল।
যদিও পরীক্ষার ফলাফল আশাব্যঞ্জক, কিন্তু ম্যালেরিয়ার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য পুরো-স্পোরোজোয়েট সমৃদ্ধ ভ্যাকসিন তৈরি করা একটি চ্যালেঞ্জ। স্পোরোজয়েটগুলি মশার লালা গ্রন্থি থেকে সংগ্রহ করতে হয় এবং তারপরে অত্যন্ত কম তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করতে হয়। মশার ব্যবহার করে কোনও ভ্যাকসিন এখনও বেশি পরিমাণে উত্পাদিত হয়নি।
তবে মেরিল্যান্ডের রকভিলের ‘সানারিয়া’ নামের একটি বায়োটেকনোলজি সংস্থা স্পোরোজয়েট সমৃদ্ধ ভ্যাকসিনগুলি আরও ব্যবহারিক করার জন্য কাজ করে যাচ্ছে। এই সংস্থাটি এখন প্রচুর পরিমাণে স্পোরোজয়েট তৈরি করতে পারে এবং মশা ছাড়াই এটি করার উপায় নিয়ে কাজ করছে।
সানারিয়া, পরজীবীটিকে জিনগতভাবে দুর্বল করার জন্য কৌশলগুলি ব্যবহার করে গবেষকদের সাথেও কাজ করছে। যাতে এটি অতিরিক্ত ওষুধ ছাড়াই সরাসরি শরীরে প্রবেশ করানো যায়। এরকম স্পোরোজয়েট কয়েকবার প্রতিলিপি তৈরি করতে পারে এবং তারপর তা রোগ সৃষ্টি করার আগেই মারা যায়। আক্রান্ত গ্রহীতার লক্ষণগুলি এড়ানোর সময় প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করতে পরজীবী এবং ওষুধের সংমিশ্রণ ব্যবহার করা হয়।
প্রতি বছর, ৪,০০,০০০ মানুষ ম্যালেরিয়া থেকে মারা যায় – তাদের বেশিরভাগই শিশু। মশারি এবং প্রতিরোধক ওষুধ সহ ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গত দশকে ৭ মিলিয়নেরও বেশি লোকের জীবন বাঁচিয়েছে এবং দেড় বিলিয়ন ম্যালেরিয়া আক্রান্তকে প্রতিরোধ করেছে। কিন্তু কীটনাশক ও ড্রাগ রেসিসটেন্স এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে এটি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়েছে।

